শয়তান পুজো, ৬৫ তম গ্র্যামি, বিটিএস, হ্যারি স্টাইলাস ও অন্যান্য

পশ্চিমা সংগীত দুনিয়া আর শয়তানের প্রতি আগ্রহ, আরো সরাসরিভাবে বললে তাদের অনেকের শয়তান উপাসনার সম্পর্ক অনেক পুরনো ও খুল্লোম খুল্লো বিষয়। এখানে দ্রুত সাফল্য-খ্যাতি-অর্থ পেতে শয়তান উপাসনা খুব স্বাভাবিক বিষয়। তবে এবার তার যেন এক প্রকার দাপ্তরিক স্বীকৃতি দেবার চেষ্টা করলো সংগীতের অস্কার খ্যাত, ৬৫ তম গ্রামি আসর।এইবারের গানের যোগ্যতা নয় বরং গান বা গায়কদের বিভিন্ন এজেন্ডার উপর ভিত্তি করে বড় কয়েকটি পুরষ্কার দেয়া হয়েছে।

আসরের শ্রেষ্ঠ দ্বৈত পপ পুরস্কার গেছে নিজেকে ‘বাইনারি’ বলে দাবী করা ব্রিটিশ গায়ক স্যাম স্মিথ ও রুপান্তরিত নারী কিম পেট্রাস।নিজেদের লিঙ্গ অস্বীকারকারী বা বিপরীত আকর্ষণ অস্বীকারকারী ও সম লিঙ্গ আকর্ষন সম্প্ররথনকারীরা সরাসরি গডের স্বিদ্বান্তের বিরুদ্ধচারণকারী, এবং শয়তানের পক্ষালম্বনকারী। এই দুই ব্যক্তি নিজেদের ব্যক্তিজীবনে চলতে ফিরতে তো সাক্ষাৎ শয়তানই। আর বাকী ছিলো সরাসরি প্রদর্শণ। এই দুইজনের গান ‘আনহোলি’ বা ‘অপবিত্র’ গত বছর বিলবোর্ড টপ চার্টের ৬ষ্ঠ স্থানে ছিলো। গানটির মিউজিক ভিডিও বা বিভিন্ন মঞ্চ উপস্থাপনায় কখনোই শয়তানের থিম ব্যবহার না করলেও, গ্রামিতে তাদের গানের থিম ছিলো দোযখ, আগুন, খাঁচা, শয়তানের শিং সম্পর্কিত।

অতি শুদ্ধবাদীরা বলতে চাচ্ছেন যে, এই গান পরকীয়া সম্পর্কিত,এখানে শয়তান বা ভিন্ন কিছু দেখা স্রেফ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।  কিন্ত প্রশ্ন হলো, পরকীয়ার সাথে শয়তানের প্রতীক দেখানোর কী সম্পর্ক, মানুষের ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় সংগঠিত বিভিন্ন পাপ আর শয়তান এক নয়। পরকীয়ার বিষয়টি যেমন, তেমনভাবেই উপস্থান করা যেতো। কিন্তু করা হয়নি, উদ্দ্যেশ্য বিতর্ক সৃষ্টি করা।

যারা এই পর্যন্ত পড়ে ভাবছেন, আমি একজন ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিক, তাদের আমি পরপর দুটো বক্তব্য পড়ে নিতে অনুরোধ কপ্রছি।

মঞ্চে স্যাম ও কিম দ্বৈতকে ডেকে নেবার দায়িত্ব ছিলো পপ সম্রাজ্ঞী বলে খ্যাত ম্যাডোনার। তার বক্তব্য শুরুই হয় এভাবে, ‘ আপনারা কী একটু বিতর্কের জন্য তৈরী আছেন?’ অর্থাৎ, এরপর যা হতে যাচ্ছে, তা অবশ্যই বিতর্কের সৃষতি করবে। আর তার পুরো বক্তব্য জুড়ে ছিলো তথাকথিত Troublemakers and Rebelsদের জন্য প্রশস্তি গাঁথা।

“Are you ready for a little controversy? Here’s what I’ve learned after four decades in music,” she began.
“If they call you shocking, scandalous, troublesome, problematic, provocative or dangerous, you are definitely onto something.
“I’m here to give thanks to all the rebels out there, forging a new path and taking the heat for all of it.
“All you troublemakers out there need to know that your fearlessness does not go unnoticed. You are seen, you are heard and, most of all, you are appreciated.”
“I’m here to give thanks to all the rebels out there, forging a new path and taking the heat for all of it.
“All you troublemakers out there need to know that your fearlessness does not go unnoticed. You are seen, you are heard and, most of all, you are appreciated.”
She concluded: “So now, speaking of controversy, it gives me great pleasure to introduce two incredibly talented artists She concluded: “So now, speaking of controversy, it gives me great pleasure to introduce two incredibly talented artists who have risen above the noise, the doubt, the critics into something beautifully unholy. Here are two Grammy award winners, Sam Smith and Kim Petras.” into something beautifully unholy. Here are two Grammy award winners, Sam Smith and Kim Petras.”

চার দশক পরে সঙ্গীতে যা শিখলাম তা এখানে; যদি তারা আপনাকে হতবাক, কলঙ্কজনক, ঝামেলাপূর্ণ, সমস্যাযুক্ত, উত্তেজক বা বিপজ্জনক বলে, আপনি অবশ্যই কিছুতে আছেন (ম্যাডোনার মতে ভালো কিছু) “

এখন কেউ আমাকে বুঝিয়ে বলুন, ম্যাডোনার এই পুরো বক্তব্যের সাথে সংগীতের সম্পর্ক ঠিক কতটা! আর এই যে ‘on to something’, এর অর্থই বা কী দাঁড়ায়, তারা সঙ্গীতের জন্য অর্থবহ কিছু তৈরী করছে না, সমাজের প্রথা ভাঙ্গায় , ম্যাডোনার অর্থে অর্থবহ কিছু করছে?

ম্যাডোনা নিজেও দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃতি ও সমাজের স্বাভাবিক নিয়মের বিরুদ্ধচারী যেমন, সে তার নিজের স্বাভাবি্‌ প্রাকৃতিক বয়স হওয়াকে ঘৃণা করে এবং বিবিধ উপায়ে নিজের বয়সকে আশ্চর্যজনক ভাবে কমিয়ে রেখেছে।। আমেরিকার অনেক মানুষ বিশ্বাস করে, ম্যডোনা অমরত্ব, খ্যাতি, অর্থের জন্য অনেক আগেই নিজের আত্না বিক্রি করেছে।

ষাটোর্ধ্ব ম্যাডোনা
গ্র্যামি হাতে রূপান্তরিত নারী কিম ও বাইনারি স্যাম স্মিথ

এবার পড়ুন পুরস্কার সংগ্রহের জন্য মঞ্চে গিয়ে, জার্মান গায়ক/গায়িকা এবং গীতিকার কি্মের বক্তব্য। যথারীতি সঙ্গীতের সাথে সম্পর্কহীন এক LGBTQ গাথা।

‘স্যাম সদয়ভাবে চেয়েছিলেন যে আমি এই পুরষ্কারটি গ্রহণ করি কারণ আমি এই পুরস্কার জিতে প্রথম ট্রান্সজেন্ডার মহিলা”। “আমি কেবল আমার আগে সমস্ত অবিশ্বাস্য ট্রান্সজেন্ডার কিংবদন্তিদের ধন্যবাদ জানাতে চাই, যারা আমার জন্য এই দরজাগুলিকে লাথি দিয়েছিল যাতে আমি আজ রাতে এখানে থাকতে পারি,” কিম বলেছিলেন। কিম ম্যাডোনাকে তার “LGBTQ অধিকারের জন্য লড়াই” এর জন্য একটি বিশেষ উল্লেখ করতে গিয়েছিলেন এবং দাবি করেছিলেন যে তিনি পপ রানী বা তার নিজের মা ছাড়া “এখানে” আসতে পারতাম না।

খেয়াল করে দেখবেন, পশ্চিমে বা পশ্চিম নিয়ন্ত্রিত আধুনিক দুনিয়ায় সার্জারির মাধ্যমে নিজের কিছু অঙ্গে পরিবর্তন এনে কিছু করতে চাইলে রাতারাতি আপনি যে লাইমলাইট পেয়ে যাবেন, তা সাধারণ নারী পুরুষদের জন্য অনেক কঠিন। একজন ট্রান্স সংবাদপাঠিকা, অভিনেত্রী বা মডেল ট্রান্স হবার কারনেই সংবাদ হয়ে উঠেন যেখানে একজন সাধারণ নারী বা পুরুষকে লাইমলাইট পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়।

বছরের সেরা এলবামের পুরষ্কার গেছে আমেরিকান গায়ক হ্যারি স্টাইলাসের কাছে। এইলোককে যখনই দেখি, স্রেফ একটা শয়তান মনে হয়। গায়ক হয়ে উঠে আসার সময় স্বাভাবিক পোষাকই পরতো, কিন্তু খ্যাতি পেতেই শুরু হয় লিঙ্গ সমতা আনয়নকারী পোষাক পরা (Cross Dress) । স্বাভাবিক ভদ্র, আনুষ্ঠানিক পোষাকে তার দারুন বিতৃষ্ণা এবং সে তার পোষাকের মাধ্যমে সমস্ত ফর্মালিটি ভাঙতে চায়। প্রথমদিকে মেয়েদের মতই পোষাক পরতো, এরপরতো যত অদ্ভত পোষাক পরা যায়। অদ্ভত পোষাক দিয়ে সে নিজেদের ‘অদ্ভত’ বা কুইয়ার বলে পরিচিত করাসের প্রমোট করে। এইবারের গ্রামিতে তার লাল গালিচার পোষাকও অদ্ভুত রংধনু রঙ্গের।তার কনসার্টে রঙধনু পতাকা একটি স্বাভাবিক বিষয়।

নিজের কন্সার্টে হ্যারি স্টাইলাস
৬৫তম গ্র্যামিতে রেড কার্পেটে স্টাইলস

দক্ষিণ কোরিয়ার পুরুষ গায়ক দল বিটিএস যার কনসার্টে সরব উপস্থিতি থাকে, তা এই স্টাইলাসের, হোক তা লস এঞ্জেলেসে বা সিউল।

কিন্তু এই দলের সদ্যসরা ভীষণরকম গে বা গে ঘেঁষা। তারা জন্মগতভাবে এমন তা নয়, কেউই এভাবে জন্ম নেয়না, মূলত পরিবেশ এবং বিকৃত চিন্তা থেকেই এসবের উৎপত্তি হয় আর এই দলের ক্ষেত্রে মূল ক্রীড়ানক তাদের কোম্পানি হাইব। প্রথমদিন থেকে ছেলেগুলোকে স্টাইলের নামে আধপুরুষ বানানো হয়েছে যা সরাসরি গডের লিঙ্গ বৈপরত্যের বিরুদ্ধচারণ। একটা দলের প্রতিটি সদস্যই প্রথম থেকে সিংগেল, সোজা ভাষায় এটা অস্বাভাবিক। সম্ভবত রক্ষণশীল এশিয়ান বলেই হ্যারির মত জানান দিচ্ছে না। বিটিএস সদস্য জিওন জাংকুক ২০২২ এর শুরুতে চার্লি পুথের সাথে Left & Right নামে একটি গে গানে অংশ নিয়েছে।

চার্লি পুথ ও জাংকুক তাদের গে সংগীত Left & Right এর মিউজিক ভিডিওতে

যাইহোক, এজেন্ডার ষোলকলা পূর্ণ করে তাদেরকে এইবারের গ্র্যামিতে অন্তত কোন পুরস্কার তুলে দেয়া হয়নি।

যেমন এবারের গ্র্যামিতে বছরের সেরা এলবাম হিসেবে দৌড়ে এগিয়ে ছিলো বিয়ন্সের এলব্যাম। কিন্তু, তাকে না দিয়ে তুলে দেয়া হয়েছে হ্যারির হাতে। পুরস্কার নেবার সময়ই সে দুয়ো শুনেছে এজন্য। দুয়োর সময় আবার তাকে দাঁড়িয়ে সমর্থন জানিয়েছে তার সাবেক প্রেমিকা আমেরিকান গায়িকা টেইলর সুইফট। টেইলর নিজেও নিজের সাম্প্রতিক মিউজিক ভিডিওতে একজন রুপান্তরিত পুরুষকে মূল মডেল হিসেবে নিয়ে নিজেকে এই কুইয়ার সমর্থক গোষ্ঠীর একজন হিসেবে জানান দিয়েছে।

ফাইজারের উচিত হয়নি, একাডেমি ঘরনার প্রতিষ্ঠান হয়ে, এইধরনের সার্কাসের প্রযোজক হওয়া।

আমেরিকায় ইতিমধ্যে এবারের গ্র্যামি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে, শয়তান বসে নেই, সে গডকে দেয়া তার প্রতিশ্রুত কথা রাখবেই, নিজেকে জানান দিবেই। আমাদেরও বসে থাকলে চলবে না।

নারীদের ইতিকাফ

ইতিকাফ একটি সুন্নাত ইবাদত যা সরাসরি মসজিদের সাথে সম্পর্কিত।

কোরানে আল্লাহ বলেন,

‘…আর তোমরা মসজিদে ‘ইতিকাফ’ রত অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করো না।…’

(সুরা বাকারাহঃ ১৮৭)।

এই আয়াত নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই খাস এবং এই উপমহাদেশে প্রচলিত হানাফি মাযহাব মতানুসারে ঘরে নারীদের ইতিকাফের যে কথা প্রচলিত আছে তা কোরানের সাথে অসমাঞ্জস্যপূর্ণ।ইতিকাফ শুধুমাত্র মসজিদেই আদায় করতে হয় যেমন ঈদের নামায জামাতে ও হজ্জ হারাম শরীফে।

রাসুলের (সাঃ)স্ত্রীগণ ও উম্মতের মায়েরাও সকলে মসজিদেই ইতিলাফ আদায় করতেন। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে রাসুলের স্ত্রীগণ মসজিদে ইতিকাফের অনুমতি চাইলে তিনি তাঁদেরকে অনুমতি দেন এবং তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁরা এই মসজিদে ইতিকাফ চালু রাখেন। ( বুখারী-২০২৬, মুসলিম ১১৭২)।

ইসলাম আরবে যখন নতুন করে আবার চালু হতে শুরু করে, তখন তা সেই সমাজের তুলনায় যথেষ্ট অগ্রসরমান ধর্ম হিসেবেই নাযিল হয়। তাই দেখা যায়, রাসুলের মৃত্যুর পর, কোরান-হাদিসের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকার পরও লোকেরা ইসলাম পূর্ববর্তী নারীদের অবস্থানেই ফিরে যেতে থাকে এবং মসজিদ ছেড়ে মেয়েদের ঘরে ইতিকাফের চল শুরু হতে থাকে। এ ব্যপারে ইবনে আব্বাস (রাঃ) জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,

‘ এটি একটি বিদাত (innovation), আর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় কাজের একটি হলো বিদাত। অতএব, কোন ইতিকাফ নেই বা হবেনা মসজিদ ছাড়া, যেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া হয়’।

কোরান-হাদিসের সাথে সংগতি রেখে শাফেয়ী, মালেকি, হানবালি মাজহাবও নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই ইতিকাফের জন্য মসজিদকেই একমাত্র স্থান বলে মনে করে। এর মধ্যে অবস্থানুযায়ী মালেকি মাজহাব মেয়েদের ঘরে ইতিকাফফেও সায় দেয়।

হানাফি মাযহাব মতে নারীদের ইতিকাফের যে বয়ান দেয়া হয়, যে একটি ছোট কক্ষে, কক্ষ ছোটই হয়, বাড়ির ভেতরে নারীদের বিরাট প্রার্থনা ঘর কখনো বড় থাকে না, হয় না, রাজকীয় কাজকারবার ব্যতিরেকে সাধারণ লোকের জন্য এটি একটি অসম্ভব বিষয়। আর বারবার নামাজের মুসাল্লা না জায়নামাজকে নির্দেশ করা মানেই এটি একটি সংকীর্ণ স্থান। বিপরীতদিকে মসজিদ আকারে বৃহৎ, খোলামেলা এবং পাঁচ ওয়াক্ত মানুষে পরিপূর্ণ থাকে। সংসার ছেড়ে আল্লাহর সাথে আত্নিক সম্পর্কের নিয়ত থাকা অবস্থায়ও বান্দার পক্ষে স্বাভাবিক মেলামেশা, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব হয়। স্রষ্টা বান্দার ধারণার বাহিরে বৃহৎ শক্তির আধাঁর, তুলনায় বান্দা সামান্য, দূর্বল ও অকিঞ্চিৎকর। সাধারণ মানুষের পক্ষে, একটানা দশদিন, ২৪ ঘন্টা একাকী স্রষ্টার সাথে সম্পর্কযুক্ত থাকতে গেলে বান্দার মানসিক, শারিরীক প্রচন্ড চাপ পরার কথা। যেকারনে মসজিদই ইতিকাফের জন্য উপযুক্ত স্থান এবং আল্লাহর ইচ্ছাও তাই। আপনি সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন বটে, আল্লাহর সান্নিধ্যেও সময় কাটালেন বটে তবে সংসার ও সংসার বিচ্ছিন্নতা উভয়ের মাঝখানে সমতা বজায় রেখে, যতটুকু আপনার শারিরীক, মানসিক, আত্নিক সুস্থতা ও উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট ততটুকু।

মসজিদের বিপরীতে যেয়ে ঘরের এক কোনে, পরিপূর্ণ সংসারের মাঝখানে, এক জায়নামাজের উপরে দিনের বেশীরভাগ সময় কাটালে মানসিক-আত্নিক উন্নতিতো দুরস্ত, যে কোন মহিলার বিষন্নতা অথবা মতিভ্রম দেখা দিতে পারে, বিশ্বাস না হলে কেউ চেষ্টা করে দেখতে পারেন। নারীরা অতিমানবী বা সুপারহিউম্যান নয়। এটি ইবাদতের বদলে শাস্তিস্বরুপ যেভাবে অন্যান্য ধর্মে নিজেকে শাস্তি দিয়ে শুদ্ধতা (purgation) অর্জনের বিধি আছে অনেকটা সেরকমই হলো, ইসলামের ইবাদতের যে ধারণা, তার সাথে একেবারেই সংগতিপূর্ণ হলো না।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উম্মে হুমাইদকে (রাঃ) উদ্দ্যেশ্য করে বলা, সমাজে বহুল প্রচলিত, নারীদের ঘরের নামাজ মসজিদ থেকে উত্তম সংক্রান্ত হাদিসটি সাহাবী উম্মে হুমাইদ ও এইরকম পরিস্থিতিতে পতিত নারীদের জন্য বয়ানকৃত হাদিস, এটি কিছুতেই সকল নারীদের উপর খাস নয়, এবং এই হাদিস দ্বারা কিছুতেই নারীদের ঘরের গৃহকোনই তাদের ‘মসজিদ’ বলে প্রতীয়মান বা সংজ্ঞায়িত হয় না যেখানে ইতিকাফ করলে বা করার চেষ্টা করলে তা ‘শুদ্ধ’ হবে।

আরো পড়ুনঃ

নারীদের জন্য কোথায় নামাজ পড়া উত্তম। ঘরে না মসজিদে। https://wordpress.com/block-editor/post/kaniz.home.blog/508: নারীদের ইতিকাফ

ওমর ও তিন তালাকের প্রচলন

একটি নির্দিষ্ট সময়ে একসাথে তিনবার তালাক উচ্চারণের সাথে তাৎক্ষণিক এবং স্থায়ী তালাক হিসেবে গণ্য করাকে শরীয়তের পরিভাষায় বলে তালাক এ বেইন বা অপরিবর্তনীয় বিচ্ছেদ (The Irrevocable Divorce) । উমর (রা) এটি দ্বীনে  সংযুক্ত  করেন যার জন্য এর আরেক নাম তালাক এ বিদাত

তিন তালাক আসলে কী?

আরবী তালাক শব্দের অর্থ বিচ্ছেদ,Divorce। কোরানে আক্ষরিকভাবে এই বিচ্ছেদ বা তালাকের প্রক্রিয়াটি দু স্তরে বা দুটি তালাকের মাধ্যমে শুরু করার কথা বলা হয়েছে।

‘তালাক দু’বার…

( বাকারাহঃ আয়াত ২২৯)

তালাকের আইন কোরানের অনন্য বৈশিষ্ট্য। তালাক বিষয়টি পৃথিবীতে ইসলামই প্রথম পদ্ধতি হিসেবে প্রবর্তন করে, এর আগে এমনকি এখনো দুনিয়ার অনেক স্থানে, অনেক ধর্মে যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, তালাক বলে কিছু নেই। পরবর্তীতে পশ্চিমা সমাজ কলোনিয়ালিজমের মাধ্যমে মুসলনমানদের সংস্পর্শে এসে, ইসলাম থেকে শিখে সেকুলার আইনের অধীনে তালাককে তাদের সমাজে আইন হিসেবে চালু করেছে, তাও এইসব আইনের বয়স দুইশও পেরোবে না। ইসলামে তালাকের আইন আধুনিক দুনিয়ার সবচেয়ে পুরনো,  ইসলাম থেকে শিখেছে বটে কিন্তু সাদা বলে তাদের নিজেদের উচ্চস্তরের ভাবার যে চল বা Superiority Complex তাতে তারা নিজেদের মত করে যে আইণ গুলো তৈরী করেছে তাতে তাদের আইন গুলো এখনো যথেষ্ট অদ্ভূত (clumsy)। পশ্চিমে তালাক প্রচন্ড ব্যয়বহুল, আইনজীবীদের জন্য লাভজনক ব্যবসায় এবং অনেক ক্ষত্রেই সুবিচারের বিপরীত।  ইসলাম পূর্ব সময়ের আরবরা আবার পশ্চিমাদের চেয়ে বরাবরই বহু এগিয়ে ,তাই তাদের সমাজে তালাক ছিলো বটে তবে তা অনেকটা যখন খুশি যেমন খুশি ,যতবার খুশি তালাক। চাইলে কেউ পঞ্চাশ বারও তালাক দিয়ে আবার স্ত্রী ফেরত আনতে পারতো। মানে স্ত্রীকে শাস্তি বা মানসিক অত্যাচারের সুযোগ ছিলো আনলিমিটেড।

আল্লাহ আরবের এই যেমন খুশি তেমন তালাক দেবার সংখ্যাটিকে দুইয়ে নামিয়ে আনেন। এটি ছিলো অনন্য, অসাধারণ একটি পদক্ষেপ, অসীম থেকে দুই। আরব সমাজে এর আকস্মিকতা ও প্রতিক্রিয়া নিশ্চয়ই ছিলো ব্যপক।  

কোরান এই দুই তালাককেও আকস্মিক তালাকের বদলে মাস ব্যাপী দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসে যাকে ইদ্দত বলে।অর্থাৎ, পুরোপুরি তালাক বা বিচ্ছেদ করতে চাইলে দুবার দুই ভিন্ন সময়ে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে  তাকে আলাদা রেখে ইদ্দত সময় গণনা করতে হয়। ইদ্দত গণণা তথা স্বামী স্ত্রীকে বিচ্ছেদ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা  বা বিচ্ছেদ পরবর্তী জীবনের সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্য তাদের দুজনকে সময় করে দেয়া ইসলামী বিচ্ছেদ আইনের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সময় ছাড়া তালাক হবেনা। এই সময়ে স্ত্রীর পূর্ণ খোরপোষের ব্যবস্থাও স্বামীকেই করতে হয়।

হে নবী! তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে চাও তখন তাদেরকে তালাক দাও তাদের ইদ্দাতের প্রতি লক্ষ্য রেখে, আর ইদ্দাতের হিসাব সঠিকভাবে গণনা করবে, (তালাক দেয়া ইদ্দাত পালন সংক্রান্ত শারীআতের বিধিবিধান পালনে) তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় কর। তাদেরকে তাদের বাসগৃহ থেকে বের করে দিও না, আর তারা নিজেরাও যেন বের হয়ে না যায়, যদি না তারা স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। যে কেউ আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করে, সে নিজের উপরই যুলম করে। তোমরা জান না, আল্লাহ হয়তো এরপরও (স্বামীস্ত্রীর মধ্যে সমঝোতার) কোন উপায় বের করে দিবেন। (সূরা আত তালাক, আয়াত ১)

তো এই দুই তালাকের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে,

অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে। (সূরা বাকারাহঃ আয়াত ২২৯)

দুই তালাক এবং ইদ্দত শেষ হবার পর স্ত্রীকে আবার ফিরিয়ে নেয়া যায় (The Revocable Divorce)  অথবা ছেড়ে দেয়া যায় এবং এই সর্বশেষ ছেড়ে দেয়ার নামই মূলত তৃতীয় তালাক এবং এর মাধ্যমে বিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়। কিন্তু, কেউ যদি একসাথে তিন তালাক বলেও , সেটি এক তালাক হিসেবেই গণ্য হবে, তিন নয়।

তাহলে কীভাবে তিন তালাকের একসাথে উচ্চারণ এক তালাকের বদলে পূর্ণ ও স্থায়ী তালাকে বদলে গেলো?

কারণ, তালাকের ব্যপারে লোকেদের তাড়াহুড়ো। রাসুল (সা) বেঁচে থাকতেই তালাক নিয়ে কোরানের বিপরীতে যেয়ে তাড়াহুড়ো করা হয়েছে এমন তথ্য হাদীসে পাওয়া যায়। যেমন,

‘একবার নবীকে এমন এক ব্যক্তির কথা জানানো হয়েছিল যে একবারে তিন তালাক দিয়েছিল। তিনি রাগান্বিত হয়ে উঠে বললেনঃ

أَيُلْعَبُ بِكِتَابِ اللهِ وَأَنَا بَيْنَ أَظْهُرِكُم

 “আল্লাহর কিতাব নিয়ে খেলা করা হচ্ছে যখন আমি এখনো তোমাদের মাঝে (বেঁচে) আছি?”’ (আন-নাসায়ী)

এই তাড়াহুড়োর তালাকের সিলসিলা জারি ছিলো সাহাবী ,তাবে-তাবেঈনদের সময়েও এবং তা জারি আছে এখনো।

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, যখন কোন লোককে ওমরের কাছে আনা হতো, যে তার স্ত্রীকে এক বসায় তিন তালাক বলে তালাক দিয়েছে, উমর (রাঃ) তাকে চাবুক দিয়ে পেটাতেন। (মান-সহীহ, ইবনে আযাহারের মতে, শারাহ মা’আনী আল আযহার, ৪৪৮৮)

তবে এই উদাহারণ ওমরের খেলাফতের প্রথম দুই বছরের। কারণ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ও আবু বকরের (রাঃ) জীবদ্দশায়,  এবং উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)এর খিলাফত কালের প্রথম দুই বছর তিন তালাকের (উচ্চারণ) এক তালাক হিসেবে ধার্য্য হত।

যে ওমর যে বিষয়টিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত করতেন পরবর্তীতে সেটিকেই আইন হিসেবে ঘোষণা করে। বিষয়টি আগ্রহোদ্দীপক!   

দরবেশ খলিফা উমর! অবস্থাসম্পন্ন ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য হয়েও আহার, পোষাক-আশাক, দৈনন্দিন জীবন যাপন এমনকি দাম্পত্য জীবনেও তিনি অত্যন্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেন। পরবর্তীতে বিশাল সাম্রাজ্যের খলিফা হয়েও তাঁর মধ্যে এইসব ব্যাপারে বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি পাওয়া যায়না।তিনি নিজে কঠোর নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করতেন, সাম্রাজ্য জুড়ে তাঁর অধীনস্তদের বিশেষত দায়িত্বপ্রাপ্ত  সাহাবীদের জাগতিক সমস্ত সম্ভাব্য বিলাসিতা যেমন, বাড়ি-জমি-ঘোড়া ক্রয়, বিলাসী দ্রব্যের ব্যবহার, অধিক বিয়ে ইত্যাদি বিষয়ে কঠোর নজরদারীতে রাখতেন এবং সাম্রাজ্য জুড়ে প্রয়োজনীয় নতুন নতুন আইন জারি করে তা নিয়ন্ত্রন করতেন।

উমরকে (রাঃ)এমন অনেক বিষয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে যা তার আগের বা পরের কোন খলিফাকে যেতে  হয়নি। উমরের শাসনামলে প্রথমবারের মত সিরিয়া, পারস্য, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মত এলাকা মুসলনমানদের শাসনাধীনে আসে আর এইসব এলাকার মেয়েরা সুন্দরী। অনেকেই আরবের স্ত্রীদের তালাক দিয়ে বিদেশী নারী বিয়ে করতে শুরু করে,  বেড়ে গেলো মু’তাহ বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিয়ের প্রচলনও।

তিনি মুতাহ বিয়েকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে প্রশাসনিক আদেশ জারি করেন। তাঁর একটি বিখ্যাত খুতবায় খলিফা ওমর বলেন: নবী (সা)এর সময়ে দুটি মুত প্রচলিত ছিল। অস্থায়ী বিবাহ এবং মুতাউতুল হজ,তবে আমি দুটিকেই নিষেধ করি এবং যে কেউ এই দুটির অভ্যাস করবে তাকে শাস্তি দেব।

‘…এবং এমন কোন পুরুষকে আমার সামনে আনবে না, যে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোন মহিলাকে বিয়ে করেছে, না হলে আমি তাকে পাথর মারব। (সহিহ মুসলিম,কায়রো, ১৩৩৪/১৯১৬ অধ্যায়ঃ আল মুতা বিল হাজ্জ ওয়াল উমরা)

একের পর এক যুদ্ধ বিজয়ে সমাজে দাসীর সংখ্যা বেড়ে গেল ওমর তাও নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেন। তিনি কোন দাসীর সন্তান হলে তাকে তিনি মুক্ত স্বাধীন ঘোষনা করে আদেশ জারি করেন। এতে করে, দাসীরা মা হবার সাথে সাথে মুক্ত হয়ে যেতো এবং চাইলে ভিন্ন কোন পুরুষকে বিয়ে করে নিতে পারতো। এতে করে, পুরুষদের দাসীর প্রতি আগ্রহ অনেকটা কমে আসে। পরবর্তীতে তিনি মদীনায় প্রাপ্তবয়স্ক দাস ঢোকানোও নিষিদ্ধ করে দেন।

তিনি প্রাশাসনিক দায়িত্ব ছাড়া সাহাবীদের ভিন্ন দেশে গমন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দেন। কেউ কোথাও যেতে চাইলে, যেমন হজ্জ্বে আগমনে খলীফার অনুমতি ছিলো আবশ্যকীয়। খেয়াল করে দেখবেন, এখনের সরকারি কর্মচারীদেরও বিদেশ গমনে সরকারি অনুমতি আবশ্যক। এই আইন প্রথম চালু করেন ওমর।  পরবর্তীতে উসমান (রাঃ) তাঁর শাসনামলে এই আইন রদ করেন।  (আলফিতনাতুলকুবরা The Great Upheaval, ডঃ তাহা হোসেন,দার-উল-মাআরিফ, কায়রো, ১৯৫৯ থেকে প্রকাশিত, পৃ:৪৭)

কিতাবী নারীদের বিয়ে কোরান হাদিস মতে বৈধ হলেও উমর তার প্রশাসনের লোকদের জন্য আইন করে সৈই বৈধতা রদ করেন।(আল মুঘনী, ইবনে কুদাইমাহ, ভলিউম-৬, পৃঃ৫৮৯)।

যেসব সাহাবীরা ইতিমধ্যে কিতাবী নারীদের বিয়ে করেছিলো,উমর এক আদেশে তাদের সকলকে তালাক দিতে আদেশ দেন। সাহাবীরা তা বিনা বাক্যব্যয়ে পালন করেন, ব্যতিক্রম হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান (রাঃ)।মদিনার প্রশাসক হযাইফা ইরাকের একজন খ্রিস্টান (কিছু মতে ইহুদী) সুন্দরীকে বিয়ে করেছিলেন।  যখন এটি উমরের নজরে আনা হয় তখন তিনি হুজাইফাকে সেই খ্রিস্টান সুন্দরীকে তালাক দিতে বলেন। হুজাইফা উমরকে পত্র পাঠিয়ে জানিয়ে দিলেন যে, তিনি আদেশটি ততক্ষণ পালন করবেন না যতক্ষণ না তাকে বলা হয় যে তার এই বিয়ে অবৈধ নাকি অন্যায়; উমর ফিরতি পত্রে লেখেন, তিনি যে বিবাহের চুক্তি করেছেন তা অবৈধ নয়, কিন্তু খালিফা তাঁকে হুজাইফার উপর তাঁর কতৃত্বের জোরে তাঁকে এই আদেশ করছেন এবং তঁকে এই আদেশ দেওয়া হয়েছে কারণ এটি আরব মহিলাদের স্বার্থের প্রতি বিরূপ প্রভাব ফেলতে বাধ্য। তাছাড়া মুসলিমরা অমুসলিম নারীদেরকে বিয়ে করলে শুধুমাত্র তাদের দৈহিক সৌন্দর্যের জন্য করবে যা যৌন শিথিলতাকে উৎসাহিত করবে। সেই পত্রের পর হুযাইফা তার খ্রিস্টান স্ত্রীকে তালাক দেন।

এর অর্থ এই নয়, ওমর বিয়ে বিরোধী। তিনি বলতেন,‘আমি অবাক হই সেই ব্যক্তির উপর যে বিয়ের মাধ্যমে রিযিকের সন্ধান করেনা, অথচ আল্লাহতায়ালা বলেছেন “যদি তারা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের স্বাধীন করবেন” , (মুসান্নাফআবদুররাজ্জাক: ১০৩৯৩)

কিন্তু, তিনি বিয়ের সুযোগে কামনার বিলাসিতা অপছন্দ করতেন, যদি তা শরীয়ত অনুমোদন করে তবেও। খেলাফত শাসন পদ্ধতিতে একজন ন্যায়পরায়ন খলীফা রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও ঐক্য বজায় রাখতে এমন যেকোন আইন প্রণয়নের অধিকার রাখেন এবং কামনা নিয়ণত্রনে তাঁর এই ধারাবাহিক আইন জারির একটি হলো তালাক এ বেইন।

বিশাল ও বর্ধিষনু সাম্রাজ্যের সবাই সাহবীগণদের মত নয়, যে ওমরের এক আদেশেই সবাই সংযম অনুশীলন করবে। সাম্রাজ্য জুড়ে তালাক সংক্রান্ত অস্থিরতা চলতেই থাকে, কাজীর দপ্তর জুড়ে অভিযোগের স্তুপ।আজকালের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় স্বঘোষিত দ্বীনি কমিউনিটি বা দ্বীনে ফেরত কমিউনিটিবলে পরিচিত প্রোফাইলগুলোতে অধিক বিয়ে, নারী, তালাক, কম দেনমোহর ইত্যাদি নিয়ে যে তুমুল আলোচনা, উত্তেজনা ও আগ্রহ দেখেন উমর (রা)কেও ঠিক একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। বিয়ে ও তালাকের বিষয়ে এক শ্রেনীর লোকেদের যেন কোন ধৈর্য্য নেই। কোরানের আদেশ, রাসুলের (সাঃ) নিষেধ, সময় নিয়ে তালাক কার্যকর হবার যে প্রজ্ঞা,সুবিচার ও রহমত অন্তর্নিহিত, , কিছুতেই এই তালাক প্রয়োগকারীদের নিয়িন্ত্রণ করা যাচ্ছিলো না। ভেবে শান্তি পেতে পারেন যে, এক জায়গায় এসে উমর আর আমরা যারা বহু বিবাহের বিষয়ে সংবেদনশীল ও বিবেকবান তারা একই কাতারে এসে দাঁড়িয়েছি। আর যৌনকাতর আর নারী কেন্দ্রিক চিন্তা ভাবনার লোকেরা সেই চৌদ্দশ বছর আগের মতই একই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এবং সমাজে চিরকাল এমণ কিছু লোক থাকবেই।

ওমর বলেন: “নিশ্চয়ই লোকেরা যে বিষয়ে অবকাশ পালন করতে হয় সে বিষয়ে তাড়াহুড়ো করতে শুরু করেছে। সুতরাং, আমরা যদি এটি তাদের উপর চাপিয়ে দিই (অর্থাৎ পরপর তিনবার উচ্চারিত তালাককে অপরিবর্তনীয় তালাক হিসেবে গণ্য করা শুরু করি), তবে এটি তাদের তা (একসাথে তিন তালাক উচ্চারণ )করা থেকে বিরত রাখত!” এবং তিনি তা করলেন’। (সহিহ মুসলিম, মান-সহিহ, বই-৯, হাদিস নং৩৪৯৩)।

আবু আশাবা ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞেস করেন, “আপনার জ্ঞান থেকে আমাদের বলুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় এবং আবু বকর (রাঃ) এর সময় ‘একবারে তিনবার তালাক দেওয়া’ কথাটি কি একবার তালাক বলে গণ্য হয়েছিল? তিনি বললেনঃ তাই হয়েছে, কিন্তু লোকেরা যখন এরূপ বলতে অভ্যস্ত হয়ে গেল, তখন উমর (রাঃ) এটাকে অপরিবর্তনীয় তালাক বলে গণ্য করলেন। (মুসলিম)

অর্থাৎ, তিনি তিন তালাককে অপরিবর্তনীয় তালাক বা তালাক এ বেইন  হিসেবে গ্রহন করার প্রশাসনিক আদেশ জারি করেন এবং ওমরের এই ইজতিহাদ জীবিত সাহাবীদের সম্মতিক্রমে ইজমায় পরিবর্তিত হয় যা শরীয়তের তৃতীয় আইনী উৎস। শরীয়তের যেকোনো বিষয়ে একই যুগের মুসলিম উম্মতের গুণবান মুজতাহাদিগণদের ঐক্যমত পোষণ করার নামই হচ্ছে ইজমা এবং ইজমার মাধ্যমে ধার্যকৃত বিষয়ের বিরোধীতা করা শরীয়ত লঙ্ঘনের সমতুল্য যেকারণে এই ঐক্যমত বা ইজমার প্রতি সম্মান রেখে চার মাযহাবেই এই তালাককে বৈধ তালাক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

হাদীসে আছে, ‘আমার মৃত্যুর পর, তুমি বড় বড় সংঘর্ষ( বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক) দেখতে পাবে। আমি আহবান করছি, সে সময়, আমার সুন্নাহ এবং সৎপথ প্রাপ্ত খলিফাদের সাথে লেগে থাকবে এবং  দৃঢ়তার সাথে আঁকড়ে থাকবে…’(সুনান ইবনে মাজাহ ৪২)

তবে অনেকেই এখানে একটি বড় ভুল করেন, তা হলো অনেকেই মনে করেন, ওমর এই আইনের মাধ্যমে কোরানের দু তালাকের আইনকে রদ করে তিন তালাক দিয়ে প্রতিস্থাপিত করেছেন যা একটি ভুল ও মিথ্যাচার। কোরানের তালাকের আইন তাঁর মতই আছে, যারা ধীর-স্থির এবং পদ্ধতিগত ও সুচিন্তিতভাবে তালাক কার্যকর করতে চান তারা তা করতে পারবেন, শুধুমাত্র যারা কোরান অগ্রাহ্য করে তিন তালাক একবারে উচ্চারণ করেই যাচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে এই তালাক অপরিবর্তনীয় হিসেবে গ্রহণ করাকে ওমর আইন হিসেবে জারি করেছেন এবং এই বিষয়টি নতুন। তবে কোন কোন আলেমদের মতে, এই বিষয়টি দ্বীনে একবারে নতুনও নয় বরং, রাসুলের (সা) সময় এমন কয়েকটি ঘটনায় রাসুল তাতে সায় দিয়েছিলেন এমন কিছু তথ্যও রয়েছে যা হাদিসের বড় গ্রন্থসমূহে আসেনি।

এবং এই ইজমা থাকা অবস্থায় আবার কোরানের আইন দিয়ে সমাধান খোঁজা যাবেনা। অর্থাৎ, কেউ যদি তালাক দেবার সময় কোরান অনুসরণ না করে তবে তালাক দেবার পর, স্ত্রীকে আবার ফিরে পেতে কোরান অনুসরণ করতে চাইলে তা অনুমোদিত হবে না, তার তালাক অবশ্যই বলবৎ হয়ে যাবে। কেউ যদি তা করতে চায় তবে তা হবে দ্বিচারিতা, সুযোগের অপব্যবহার।

তালাক এ বেইনের মাধ্যমে ওমর চেয়েছিলেন, নারীদের সম্মান ও মুক্তি দিতে। খলিফা ওমর ছিলেন তাঁর সাম্রাজ্যের নারীদের পিতৃতুল্য অভিভাবক। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্যের নারীদের কথা আলাদাভাবে বলে গেছেন, ভেবে গেছেন। অস্থিরমতি, দায়িত্বহীন ,জালিম পুরুষ , যারা সময় দিলে  রিকনসিলিয়েশনের ভয় করে,, তোমরা জান না, আল্লাহ হয়তো এরপরও (স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতার) কোন উপায় বের করে দিবেন (আত তালাকঃ১)’ এহেন পুরুষদের সাথে একই ছাদের নীচে জবরদস্তি সময়ক্ষেপণ আত্নমর্যাদা সম্পন্ন নারীদের জন্য অনর্থক ও অসম্মানজনক। বিয়ে যেমন উত্তম, কিছু কিছু তালাকও উত্তম, এসবক্ষেত্রে যত তাড়াতাড়ি তালাক হবে তাদের নতুন জীবন বা সম্পর্কে প্রবেশ তত সহজ হবে। এটি কোরানের সাথেও অধিক সামাঞ্জস্যপূর্ণ, আল্লাহ তালাকের পর ভবিষ্যৎ নিয়ে নারীদের চিন্তিত হতে মানা করেন, তিনি বলেন,

‘এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ করবেন। আল্লাহ সবকিছুর জন্যে একটি পরিমাণ স্থির করে রেখেছেন।’ (সূরা তালাক)

ওমর আরো চেয়েছিলেন, পুরুষেরা যখন বুঝবে এই তালাক পরিবর্তনের আর কোন সুযোগ নেই, হিলা বিয়ে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তখন হয়ত তারা তাদের ভুল বুঝতে পারবে, এবং এই তালাকের ব্যবহার কমে আসবে।  অর্থাৎ, ভাবিয়া করিয়ো কাজ ,করিয়া ভাবিয়ো না।

ওমরের এই ইজতিহাদ সেই সময়ের প্রয়োজনে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে, আরবের মেয়েদের ইনসাফ রক্ষা করতে হয়েছিলো। তবে এই আইনের পেছনে ওমরের উদ্দ্যেশ্য কখনোই সর্বাংগীন পূর্ণতা পায়নি, কারণ জঘন্য হিলাহ বিয়ের ফাঁকটি। হিলাহ বিয়ের নোংরা প্রথা এখনের মত ওমরের জীবদ্দশায়ও ছিলো।

ইবনে আবী শায়বা থেকে বর্নিত, ওমর জনগণকে সম্বোধন করে বলেছিলেন: আল্লাহর শপথ, এমন কোন মুহাল্লিল অথবা মুহাল্লাল আমার কাছে আনা হবে না, যাকে আমি পাথর না মেরে থাকবো’’  (মুসান্নাফ ৭/২৯৩, আবদ আল-রাজ্জাক তার আল-মুসান্নাফ ৬/২৬৫০, সুনান সাঈদ বিন মানসুর ২/৭৫)

ওমর তাঁর মৃত্যু পূর্ববর্তী তিনদিন আহত অবস্থায় যে আত্নবিশ্লেষণ ও আত্নসমালোচনার মধ্য দিয়ে গেছেন এবং যেসব বিষয়ে দুঃখ করেছিলেন, তার মধ্যে এই তালাকের ইজতিহাদও ছিলো। (ইগাছাতুল লাহফান, ইবনুল ক্বাইয়ুম,১/২৭৬)। এর অর্থ এই নয় তিনি ভুল ছিলেন, তিনি চিরকালই নিজের কঠোর সমালোচনাকারী তবে প্রজ্ঞাবান খলীফা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর এই আইনের আশু অপপ্রয়োগকারীদের দৌরাত্ব এবং হয়েছিলোও তাই।  

পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে, যেমন এই ভারতীয় উপমহাদেশের অসহায় মেয়ের্‌ যাদের বিয়ে ছাড়া অন্য আশ্রয় নেই, তাদের, তালাক রদের নামে স্থানীয় সমাজপতি ও ধর্মপতিদের দ্বারা ওমরের এই ইজতিহাদের অপপ্রোয়গের মাধ্যমে হিলাহ বিয়ের শিকার হয়েছেন। এর দায় ওমরের নয়। ওমরের খেলাফত উম্মাহর জন্য রহমত, তাঁর আদেশ নিষেধ রহমত। তিনি নারীদের মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু, তা হয়ে উঠলো নারী নির্যাতনের নতুন পদ্ধতি। নারীদের প্রতি নির্যাতন বৃদ্ধিতে বিভিন্ন দেশের সরকার ওমরের আইনকে সরকারিভাবে রদ করা করেছে। উদাহারণ, পাকিস্তান আমলে প্রনীত বাংলাদেশ মুসলিম বিয়ে অধ্যাদেশ ১৯৬১, যেখানে তালাক এ বেইনকে বেআইনী সাব্যাস্ত করে এক তালাক হিসেবে ধার্য করা হয়।

এর সম্পূর্ণ দায় আলেমদের,একদিকে তারা জনগণকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন,অন্যদিকে সমাজে হিলাহ বিয়ের প্রচলন বন্ধ ও এদের প্রয়োগকারীদের জন্য শাস্তি প্রয়োগে সীমাহীন ব্যর্থতা দেখিয়েছেন। শাস্তি কী দিবে , এসব হুজুরদের অনেকে এইসব হিলাহ বিয়ের অংশ হয়েছিলেন। যে রাসুল (সাঃ) হিলাহ বিবাহকারীদের অভিশাপ দিয়েছিলেন, ‘আল্লাহর অভিশাপ মুহাল্লিল মুহাল্লালের উপর (আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, মান-সহীহ, ইবনে মাজাহ), সেই বিয়ের নামে এই একরাতের যৌনাচারকে শরীয়তের অংশ বানানো হয়েছিলো। তাদের ব্যর্থতা অমার্জনীয় । তাদের পাপ বিশাল।

টীকা।

১। ইজতিহাদ একটি ইসলামী আইনী শব্দ।  কোন উদ্ভূত আইনী সমস্যার ইসলামী সমাধান সন্ধানে একজন আইনজ্ঞের স্বাধীন যুক্তি  ও বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যালোচনার  প্রচেষ্টাকে ইজতিহাদ বলে।  সুন্নি শাস্ত্র মতে, একজন মুজতাহিদকে আরবি ভাষা, ধর্মতত্ত্ব, নাযিলকৃত কিতাব (তাওরাত, ইঞ্জিল ও কোরান এবং আইনশাস্ত্রের নীতিগুলিতে দক্ষ হতে হয় হয় এবং ওমর ছিলেন এর প্রতিটি শাখার উৎকর্ষতার উদাহারণ তথা আরবী ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পন্ডিত, বিচারকার্যে কিংবদন্তী বিচারক এবং কোরান বিষয়ে রাসুল ও আবু বকরের পর শ্রেষ্ঠ তাফসীরকার । তবে কোরান ও হাদীস মতে বিশুদ্ধ এবং নিশ্চিত  বা যে বিষয়ে বিদ্যমান পণ্ডিতদের ঐকমত্য রয়েছে সেখানে ইজমা ব্যবহার করা হয় না।

২।আলী (রা) থেকে বর্ণিতঃ খায়বার যুদ্ধের সময়, নবী নারীদের অস্থায়ী বিয়ে (অর্থাৎ মুতাহ) এবং গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছিলেন। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, আহমাদ, আন-নাসায়ী, আত-তিরমিযী এবং ইবনে মাজাহ সকলেই এটি সংগ্রহ করেছেন)।

৩। মুতাউল হজ্জ-হাজীগণ যারা দূর থেকে হজের জন্য মক্কায় আসতেন এবং হজের আগে ওমরা করতে চান তাদের ওমরার জন্য পবিত্র অবস্থায় (ইহরাম) প্রবেশ করার অনুমতি দেয়া হতো এবং তারপরে তারা পুনরায় প্রবেশ না করা পর্যন্ত তা ছেড়ে যেতে পারতেন। এই মধ্যবর্তী সময়ে তারা তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মের পাশাপাশি ‘নিজেদের উপভোগ’  করতে পারতেন যা ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ থাকে।

৪।মুতাওয়াত্তির, অর্থাৎ এগুলো এতবার এবং এত বেশি লোকের দ্বারা প্রেরণ করা হয়েছে যে তাদের সত্যতা সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই।

কেন ইসলাম দাসপ্রথা বন্ধ করেনি? উমরনামা-১৫

কেন ইসলাম দাসপ্রথা বন্ধ করেনি, এমন একটা অভিযোগ আছে। এই প্রশ্ন সবসময় ইসলামের প্রতি ভিযোগ বা আক্রমণ হিসেবে নয় , বরং ইনসাফ প্রিয় মানুষের ইসলামের প্রতি আশা আকাংখা থেকেও এমন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।

সইসলামের যখন আগমন ঘটেছিলো,দুনিয়ার অর্থনীতি ও সামাজিক বিন্যাস ছিলো তখন পুরোপুরি দাস নির্ভর, এখনে দুনিয়া যেমন একেবারে কিনে ফেলার বদলে অর্থের বদলে নিয়োগ, সোজা বাংলায় চাকরি ও মজুরি নির্ভর। দাস নির্ভর অর্থনীতি বুঝতে আমেরিকার গৃহযুদ্ধকে উদাহারন হিসেবে নেয়া যেতে পারে। শুধুমাত্র দাসপ্রথার অবলুপ্তি নিয়ে আমেরিকার দক্ষিন ও উত্তর অংশের মধ্যকার ১৮৬১-১৮৬৪ থেকে চারবছরব্যাপী চলা যুদ্ধে প্রাণ হারায় সাড়ে সাত লক্ষ আমেরিকান, আহত হয় প্রায় পাঁচ লক্ষ, অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রা ছিলো সেই আমলের অংকের হিসেবে ৩.৩ বিলিয়ন ডলার। আমেরিকার উত্তর অংশ ছিলো দাসপ্রথা উচ্ছেদের সমর্থক এবং দক্ষিন অংশ ছিলো এর সরাসরি বিপক্ষে। তাদের বিরোধীতার অর্থনৈতিক, সামাজিক কারন ছিলো।

আমেরিকার উত্তর অংশ দাসপ্রথা উচ্ছেদের সমর্থক হবার প্রধান কারণ ছিলো উত্তরের শিল্পায়ন, শিল্পায়নে তাদের বিনিয়োগ যা দাসদের উপর তাদের অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমিয়ে দেয় অন্যদিকে দক্ষিন অংশের অর্থনীতি, বিশেষত তাদের তুলার ব্যবসায় তখনো ছিলো দাসদের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। আবার অন্যদিকে দাসপ্রথা তুলে দিলে, মালিক এবং দাস একই মানে নেমে আসবে, কালো দাসেরা সম্পত্তি কিনে তাঁদের সমতুল্য হয়ে যাবে,ভোটাধিকার পাবে,এমনকি সিনেটের সদস্য বা আইনপ্রনেতা হিসেবে আইন প্রণয়ণ করবে যা দক্ষিনের সাদা চামড়ার অহমে বাঁধছিলো।

 কিন্তু, দৃঢ় প্রতিজ্ঞ প্রসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের আব্রাহাম লিংকনের অসাধারণ প্রচেষ্টায় ১৮ ই ডিসেম্বর ১৮৬৫ সালে তেরোতম সংশোধনীর মাধ্যমে আমেরিকায় এই প্রথা বিলুপ্ত হলেও এক সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী আততায়ীর হাতে পাশ্চাত্যের এই উমরকে ১৮ই এপ্রিল প্রাণ দিতে হয়।

মহামতি লিংকন

লিংকন অমর হয়ে থাকবেন তাঁর গেটিসবার্গ বকৃতায়, ‘…that all are men are equal’। কেন আমি লিংকনকে পাশ্চাত্যের উমর বলি, সে বিষয়ে পরে আসছি।

প্রায় ১৩০০ বছর পিছিয়ে , হেযাযের আরব কোন শিল্পায়িত অঞ্চল ছিলোনা।

ইসলাম এসেই সেই সমাজে সুদ প্রথা, পতিতা ব্যবসায়, মদ ব্যবসায় বন্ধ করতে পারলে দাস ব্যবসায় নয় কেন, বাকীগুলোওতো তৎকালীন পৃথিবীর অর্থনীতির অন্যতম বড় বড় স্তম্ভ ছিলো?

হ্যাঁ, ইসলাম চাইলেই পারতো। কিন্তু চায়নি এর সোজাসাপ্টা কারন,ইসলাম দাসপ্রথায় কল্যান দেখেছিলো এবং এর পুরোপুরি বিলোপ সাধণ অপ্রোয়জনীয় মনে করেছিলো

সুদ প্রথায় সম্পদের অসম বন্টন হওয়ায়, সমাজে অসমতা জারি থাকতো, সুদ উচ্ছেদ ও পাশাপাশি যাকাত প্রণয়নে বরং অর্থনীতিতে বিরুপ প্রভাবের বদলে সমতা নির্ধারিত হয়। মদ্যপানে মানুষের স্বাভাবিক চিন্তা ক্ষমতা নষ্ট হয়, কিন্তু ইসলাম দাবী করে যে একজন মুসলনমান সার্বক্ষনিক সুচিন্তার জন্য কর্মক্ষম থাকবে, তাই মদপান নিষিদ্ধ কিন্তু কিন্তু দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করা হলে ক্ষেত-খামার, যাতায়াত ইত্যাদিতে সরাসরি প্রভাব পরতো যা সরাসরি মানুষের খাদ্য-বস্ত্র, জীবিকার সাথে সংযুক্ত ,তাছাড়া মুক্ত না হয় ঘোষনা করা হলো। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের মত একটা রক্তারক্তি শুরু হয়ে যেতো এবং এত রক্তপাতের ফল কী হতো?  এত প্রচুর সংখ্যক দাসের আর্থিক ও বাসস্থানের সংস্থানের কী হবে, এত মুক্ত দাস কোথায় যাবে, কী করবে।হঠাত করে দুনিয়া থেকে চাকরি উঠিয়ে দিলে যা হবে, দাসপ্রথা উঠিয়ে দিলেও তাই হতো। অর্থাৎ, দাসপ্রথা রাতারাতি বন্ধের বিষয় একেবারেই ছিলো না,  মদপান যেমন ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ্ব হয়েছিলো ,দাসপ্রথাও দীর্ঘ ধাপে ধাপে বিলোপের বিষয় যার সূচনা কছিলো ইসলাম। আর এই মধ্যবর্তী সময়ে ইসলাম লাগামহীন দাসপ্রথাকে একটি কার্যকর উপায়ে বিধিবদ্ধ করে যা  ছিলো ভীষণভাবে মানবিক।  

ইসলামই প্রথমবারের মত  দাসমুক্তিকে ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তথা পুন্যের কাজ ও গুনাহ থেকে দায়মুক্তির বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং উদাহারণস্বরুপ, আল্লাহর নামে করা শপথ ভঙ্গের কাফফারা কষ্ট করে রোজা না রেখে একজন দাসকে মুক্ত করার মাধ্যমে আদায় করা যায়।

যে ব্যক্তি একজন মুসলিম দাসকে মুক্ত করবে, আল্লাহ তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে এমনকি তার গোপনাঙ্গকেও জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করবেন। সূত্র: সহীহ বুখারী ৬৩৩৭, মান সহীহ

কোরানে সরাসরি আয়াত নাযিলের মাধ্যমে দাসীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের পতিতাবৃত্তিতে নিযুক্তি নিষিদ্ধ করা হয়।

 তোমাদের দাসীরা সতীত্ব রক্ষা করতে চাইলে তোমরা দুনিয়ার জীবনের সম্পদের কামনায় তাদেরকে ব্যভিচারে বাধ্য করো না (সূরা আন নূরঃ৩৩)

যার কারনে দেখা যায় ইসলামের প্রথমদিকের মুসলনমানদের সাত আটজনের মধ্যে তিনজনই ছিলেন দাস।ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন একজন আযাদকৃত দাস,বেলাল। প্রথম শহীদ  একজন ইথিওপিনিয়ান দাস, সুমাইয়া বিনতে খাব্বাব (রাঃ),প্রথম শহীদ দম্পতি সুমাইয়া ও তাঁর স্বামী ইয়াসির (রাঃ)। তাঁদের সন্তান আম্মার ইবনে ইয়াসির। আফ্রিকান বংশোদ্ভুত সাহাবী আমির ইবনে ফুআয়রাহ, তিনি সেই সাহাবী যিনি রাসুলাল্লাহ এবং আবু বকর যখন মক্কা থেকে মদীনায় পাড়ি দিচ্ছিলেন, ভেড়ার পাল চড়িয়ে তাঁদের পদচিহ্ন ঢেকে দিতেন।কোরানে বর্ণিত একমাত্র পুরুষ সাহাবী, তাও একজন আযাদকৃত দাস।ইবরাহীমি ধর্মগুলোর একটি বৈশিষ্ট্যি হলো এটি সমাজের তথাকঠিত উঁচু তলার লোকদের চেয়ে নীচু বা দাসদের বেশী আকৃষ্ট করতো। কুরাইশদের সাথে ইসলামের সংঘর্ষের অন্যতম কারন ছিলো এই যে তারা ইসলামকে দাসপ্রথার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছিলো যার উপরে অনেকাংশে মক্কার অর্থনীতি নির্ভরশীল ছিলো।  

দাস বলতে শুধুমাত্র চাকর বা ভৃত্য বোঝায় না, যেমন , চাকরি করা অর্থে সরাসরি চাকর হওয়া বোঝায় না। দাসদের চাকর ব্যতিরেকে নানা কারনে ও প্রয়োজন মেটাতে কেনা হতো, এবং যার যা যোগ্যতা সে অনুসারে কাজ বুঝিয়ে দেয়া হত। এক্ষেত্রে স্মরণ করা যেতে পারে, মিশরে নবী ইউসুফের (আঃ) দাস হিসেবে আগমন। যখন তাঁর রক্তসম্পর্কীয় ভাইয়েরা তাঁকে  কুয়োয় ফেলে মারতে চেয়েছিলো কিন্তু দাসব্যবসায় তাঁকে নিরাপদে মিশরের রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত পৌছে দেয় এবং সেখানের নিঃসন্তান আযীয তাঁকে ভৃত্য হিসেবে নয় বরং পুত্রস্নেহে আসীন করেন।

‘মিসরের যে লোক তাকে ক্রয় করেছিল, সে তার স্ত্রীকে বলল, ‘তার থাকার সুব্যবস্থা কর, সম্ভবতঃ সে আমাদের উপকারে আসবে কিংবা তাকে আমরা পুত্র হিসেবেও গ্রহণ করে নিতে পারি।’ এভাবে আমি ইউসুফকে সে দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম…’ (সূরা ইউসুফঃ২১)

রাজপরিবারে থাকায় তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ের শিক্ষা লাভ করেন যা তাঁকে পরবর্তীতে তিনি সেই মিশরের বড় রাজকীয় কর্তার আসনে অধিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে, তাঁর পূর্ব দাসপরিচয় এক্ষেত্রে বাঁধা হিসেবে দাঁড়ায়নি বরং তাঁর যোগ্যতাকেই প্রাধান্য দেয়া হয়।  এবং তাঁর পুরো পরিবার জেরুসালেম থেকে মিশরে অভিবাসিত হন যা মিশরের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মিশরে অভিবাসিত বনী ইজরাঈল জাতি কালক্রমে আবারো মূল মিশরীয়দের দাসে পরিনত১ হয় এবং তাদের থেকে পরবরতীতে মুসা (আঃ) জন্ম নেন। মুসা মিশরীয় এক নিঃসন্তান সম্রাট/ ফেরাউনের ঘরে রাজপুত্র হিসেবে প্রতিপালিত হন।

 পরবর্তীতে সেই ফেরাউনকে উৎখাত করে মিশরকে অন্যায়ের রাজত্ব থেকে মুক্তি দান করেন। দাসপ্রথার মাধ্যমে দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন জাতির অভিবাসন সম্পন্ন হয়েছিলো, দাসপ্রথা ছিলো আন্তঃসংস্কৃতি আদান প্রদানের উপায়। আজকের দিনে যেমন, কেনিয়ান পিতার সন্তান হিসেবে বারাক ওবামা হয়তো কখনোই কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট হতে পারতেন না কিন্তু আমেরিকায় অভিবাসীত হওয়ায় তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতিতে তাদের দেয়া সুবিধা পেয়ে তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছিলেন, ইউসুফ, মুসাও তাই।

রাসুলাল্লহ খাদীজার দাস যায়েদ বিন হারিসা ছিলেন মুসলনমানদের প্রথম বৈদেশিক অভিযান সিরিয়ার প্রধান সেনাপতি। তাঁর মৃতুয়র পর তাঁর স্থলে স্থলাভিষিক্ত হন তাঁরই পুত্র উসামা বিন যায়েদ বিন হারিসা , মাত্র সতেরো বছর বয়সে এবং যখন সমস্ত বড় সাহাবীরা জীবিত।

গনীমতের অংশ বন্টনে উসামা বিন হারিসা সবসময় উমর পুত্র আব্দুল্লাহ ইবনে উমর থেকে দিগুন বেশী পেতেন। আব্দুল্লাহ একবার এই বিষয়ে উমরকে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেন, রাসুল (সাঃ) সবসময় উসামাকে এভাবেই বেশী দিতেন, তাই আমিও এভাবেই দেই’

ইকরামা, যাকে হাদিস শাস্ত্রের অন্যতম ইমাম হিসেব গণ্য করা হয়; তিনি ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের (রাঃ)দাস।   চার মাযহাবের এক ইমাম মালিক ইবনে আনাসের শিক্ষক ছিলেন বিখ্যাত তাবেঈন নাফি মাওলা ইবনে উমর, তিনি ছিলেন উমর ইবনে আব্দুল আযিয পুত্র আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের আজাদকৃত দাস। তারা কেউই ভৃত্য হিসেবে দাস ছিলেন না, বরং তাঁদের স্নেহের ছাত্র।  

ওসমানী সাম্রাজ্যে আর দাস প্রথা অংগাঙ্গিকভাবে জড়িত। ওই সাম্রাজ্যর আরেক নাম ছিলো মহিলাদের সালতানাত (The Sultanate of Women) কারণ সুলতানা, রাজমাতারা সরাসরি সাম্রাজ্যের নীতি নির্ধারনী বিষয়ে অংশগ্রহণ করতেন। আর এইসব সুলতানাদের বড় অংশই ছিলো দাসী যেহেতু সম্রাট ও রাজপুত্রগণ স্বাধীন নারী বিয়ে করতো না।ভারতের প্রথম মুসলিম বিজেতা ও শাসকও ছিলেন একজন দাস, সুলতান কুতুবউদ্দীন আইবেক। তুর্কেস্তানে জন্ম নেয়া জাতিতে তুর্কি আইবেক ছোটবেলায় দাস হিসেবে পারস্যের নিশাপুরের এক কাজীর কাছে দাস হিসেবে বিক্রিত হন এবং সেখানে তিনি তীর ঘোড়া চালনা সহ যুদ্ধ সংক্রান্ত সকল বিষয়ে দক্ষ হয়ে উঠেন। পরবর্তীতে তাঁকে ঘোরী সম্রাট মুহাম্মদ ঘোরীর কাছে বিক্রি করে দেয়া হয় এবং তিনি তাঁর একজন সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। মোহাম্মদ ঘোরীর বেশীরভাগ সেনাপতিই ছিলেন তাঁর কেনা দাস।ঘোরীর সেনাপতি হিসেবে আইবেক ভারত আক্রমণ করেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর সুলতান হিসেবে ভারতে মামলুক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন যার রাজধানী ছিলো ছিলো লাহোরে। মুসলনমান হিসেবে ভারত জয়ের স্মারক হিসেবে তিনি নির্মান করেন বিখ্যাত কুতুব মিনার যা এখনো সগৌরবে দন্ডায়মান।

কুতুব মিনার

ঘোরীর দাস আইবেক, ইলতুতমিশ নামে আরেক তুর্কি দাসকে কিনে নিয়ে নিজের প্রশাসনের অন্তরভূক্ত করেন, অর্থাৎ ইলতুতমিশ ছিলো দাসের দাস এবং তাঁর মেয়ে জামাতা হিসেবে গ্রহণ করেন। আইবেকের মৃত্যুর পর শামসুদ্দীন ইলতুতুমিশ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত অজনপ্রিয় আরাম শাহকে হত্যা করে মামলুক সাম্রাজ্যের রাজধানী দিল্লীতে নিয়ে আসেন এবং প্রথম সার্বভৌম মুসলনমান শাসক হিসেবে দিল্লী সালতানাত প্রতিষ্ঠা ও শাসন করেন। ইলিতুতিমিশ কন্যা রাজিয়া সুলতানা প্রথম মহিলা শাসক হিসেবে ভারত শাসন করেন, যার নামে জুম্মার খুতবা দেয়া হতো ও মুদ্রা প্রচলিত ছিলো। সুদুর তুর্কীর বালকেরা ভারতের সুলতান হয়েছিলো এই দাসপ্রথার কারনে, যারা কিনা কখনোই নিজ এলাকার হয়তো সামান্য সৈন্যও হতে পারতো না, আজ যেমন গুগল, এমাজনে বাংলাদেশীরা কাজ করে যাদের পক্ষে বাংলাদেশে একই কাজ পাওয়া অসম্ভব ছিলো।

শামসুদ্দিন ইলতুতমিশ ও কন্যা রাজিয়ার দিল্লী সালতানাত

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন তার দুই রাষ্ট্র তত্ত্ব নিয়ে এগুন তখন একইসাথে পরিত্যাক্ত হয় ঘোরী, কুতুবউদ্দীন, লোদী বাবর, আওরংগজেব, টিপু সুলতানের বিজিত ভারতের। হিন্দুরা খুব কম সময়ই ভারত শাসন করতে পেরেছে, এটি বিভিন্ন সময় শাসিত হয়েছে আফগানী, তুর্কী, মংগলদের দ্বারা। ভারতবাসী তাদেরকে আপন করে নিয়েছে, তারাও ভারতকে। আপনিতো আপনার পূর্বপুরুষের বাসস্থান, তাঁদের অর্জন এভাবে ব্যর্থ করে দিতে পারেন না, ভারতের উপর মুসলনমানদের দাবী তুলে দিতে পারেন না। ভাগ্য ভালো, যে জহরলাল নেহেরুর কংগ্রেস হিন্দু রাষ্ট্রের বদলে সেক্যুলার ভারত নির্মান করেছিলেনে নয়তো নাথুরাম গডসকে নায়ক হিসেবে গণ্য করা আজকের বিজেপির হাতে পরলে বাবরী মসজিদের মত তাঁদের সমস্ত স্থাপনা, বিজয় স্মারক, কবরস্থান ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া হতো।

নেহেরুর রাজনৈতিক গুরু মহাত্মা গান্ধী উমর সহ অন্যান্য খোলফায়ে রাশেদার গুণমুগ্ধ ছিলেন। ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস সরকার গঠনের সময় দেয়া তাঁর এক বকৃতায় কংগ্রেস কর্মীদের সাধাসিধে জীবন যাপনে উদ্ভুত্ব করতে গান্ধী বলেন, ‘ আমি আপনাদেরকে রামচন্দ্র বা কৃষ্ণের উদাহারণ দিতে পারবো না, কারণ তারা ইতিহাস দ্বারা স্বীকৃত নয়। কিন্তু, আমার আর উপায় নেই আবু বকর ও উমরের নাম আপনাদের সামনে তুলে ধরা ছারা। বিশাল সাম্রাজ্যের নেতা হওয়া সত্বেও তাঁরা কঠোর জীবন যাপন করে গেছেন’।(অথ্যসূত্রঃহরিজন, জুলাই ৩৭, ১৯৩৭)

অনাদিকাল থেকে চলে আসা দাসপ্রথাকে যতটা অমানবিক হিসেবে দেখানো হয় তা শুধু এতটা একপেশে ছিলোনা,ছিলো ভালো মন্দের মিশেল। মূলত সাদা চামড়ার লোকদের হাতেই দাসপ্রথার সবচেয়ে কলংকিত অধ্যায়গুলো রচিত হয়েছিলো এবং তাসের দ্বারা কালো চামড়ার লোকেদের সাথে যা করা হয়েছিলো তা ছিলো মূলত বর্ণঘৃণা বা সুশীল ভাষায় বর্ণবাদ।আজকের দুনিয়ায় দাসপ্রথা নেই কিন্তু পুঁজিবাদী দুনিয়ার একটা বড় অংশ বেনামে দাসই, এখানে নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে পৌছুনোর যে অমানুষিক চাপ, অপমান, বেতন কর্তন, কাজের চাপ, অফিসের কর্তার রুঢ় আচরন কিছু সম্মানীর বিনিময়ে মাথা পেতে নিতে হয় সম্ভবত অতীতের অনেকে দাসের অবস্থা এর চেয়ে ভালো ছিলো।   

তবে আর সবকিছুর মতই অবশ্যই দাসপ্রথায় কলংকের দাগও ছিলো,  ইসলাম এখানে দাসপ্রথার কল্যানের বাহিরে যা কিছু অমানবিক, অকল্যানকর তা দূর করে একই সামাজিক মর্যাদায় মানুষের দ্বিমুখী কল্যানের ব্যবস্থা করেছিলো, কারো খাদ্য, বস্ত্র, নিরাপদ বাসস্থানের বদলে বিবিধ সেবা পাওয়ার সুযোগ কখনোই কোন অন্যায় নয়।

মানুষের আত্নমর্যাদার প্রতি প্রচন্ড সচেতন উমর, খলিফা হবার পর দাসপ্রথায় যুগান্তকারী সব সংস্কার আনেন। প্রথমত, যুদ্ধে বিজীত অঞ্চলের অমুসলিম লোকদের গণহারে দাস বানানোর বদলে বিজীত অঞ্চলের লোকদের জিজিয়া করের বদলে স্বাধীন নাগরিকের মর্যাদা প্রদান করেন। উচ্চ পদমর্যাদার কেউ বন্দী হলে দাস বানানোর পরিবর্তে ধার্যকৃত মুক্তিপণের বদলে মুক্ত করে দেয়া হত। সিরিয়ায় যখন সম্রাট হেরাক্লিয়াস কন্যা বন্দী হলো, তাকে সসম্মানে তার বাবার কাছে ফেরত পাঠানো হলো। মিশরের ব্যবিলনের যুদ্ধে সেখানের রাজা মুকাউকিসের  (Maqauqas )কন্যা আরমানুসা (Armanusa) ধৃত হলো তাকেও তার বাবার কাছেই ফেরত পাঠানো হয়।২   

রিদ্দার যুদ্বে অনেক আরব দাসে পরিনত হন, পারস্য যুদ্ধের প্রাক্কালে ,৬৩৫ বা ৬৩৬ সালে উমর তাদের প্রত্যেককে মুক্ত ঘোষনা করেন এবং কোন আরবকে দাস বানানো যাবেনা এই মর্মে ফরমান জারি করেন। হেযায থেকে সিরিয়া, আফ্রিকার ইয়েমেন থেকে ইরাকের বসরা, বিশাল আরব অঞ্চল, পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ভূখন্ড,যার লোকেরা আজীবনের জন্য দাস হবার সম্ভাবনা থেকে মুক্ত হলো। এর প্রায় দীর্ঘ ষোলশ বছর পর, ১৮৬৫ সালে আমেরিকা হয় মাত্রই দ্বিতীয় দাস ব্যবসায় মুক্ত অঞ্চল।উমর কত অগ্রগামী ছিলেন!  

মিশর আরবের অংশ নয়, কিন্তু উমর সেখানেও দাস বানানো অপছন্দ করতে শুরু করেন। মিশরের এক দাসের অবিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মিশরের প্রশাসক আমর বিন আল আসকে করা উমরের এক বিখ্যাত প্রশ্ন আছে, উমর বলেন, ‘আপনি কবে থেকে মানুষকে দাস বানানো শুরু করেছেন, যখন তারা তাঁদের মায়েদের থেকে মুক্ত হয়ে জন্মগ্রহণ করে?’ (ইবনে আবদিল হাকাম, ফুতুহ মাসর 290)

উমরের এই অমর বানী যেন বারশ বছর পর রুশোর বিখ্যাত বানী, ‘Man is born free; and everywhere he is in chains. One thinks himself the master of others, and still remains a greater slave than they.’ মানুষ জন্ম হয় স্বাধীনভাবে কিন্তু তারপরই চারদিক থেকে সে শৃঙ্খলিতরই প্রতিধধনি।

গ্রেট মাইন্ডস থিংস এলাইক!

উমর আরো ঘোষনা করেন, যেসব দাসী তার মালিকের সন্তানের মা হবে তারাও মুক্ত হিসেবে গণ্য হবে।

পবিত্র কোরানে আছে, ‘…আর তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীদের মধ্যে যারা মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি করতে চায়,তোমরা যদি তাদের (দাস) মধ্যে ভালো কিছু দেখো ,তবে তাদের সাথে চুক্তি করে নাও  এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা থেকে তোমরা তাদেরকে দাও (সুরা আন নূরঃ৩৩)

উমর কোরানের এই আয়াত রাষ্ট্রে বাস্তবায়নের আদেশ করেন অর্থাৎ কোন দাস যদি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মালিককে একটি নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ প্রদান করতে পারে তবে সে মুক্ত। আনাস (রাঃ) সিরিন নামে একজন দাসী ছিলো।সিরিন আনাসের সাথে তার মুক্তির ব্যাপারে একটি চুক্তিতে আসতে চাইলো কিন্তু আনাস (রাঃ) রাজি হলেন না। যখন এই খবর উমর পর্যন্ত পৌছুলো, তিনি আনাসকে বাধ্য করলেন চুক্তিতে যেতে।  উমরের প্রনীত রাষ্ট্রীয় ভাতা বন্টনেও মালিক ও দাসে কোন পার্থক্য ছিলোনা। একই ভাতা মালিক এবং দাস দুইয়ের জন্যই বরাদ্দ ছিলো।

উমর আরো আদেশ জারি করেন, কোন দাসকে তার আত্নীয় থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবেনা, কোন সন্তানকে তার মা থেকে এবং কোন ভাই বোনকে আলাদা আলাদা বিক্রি করা যাবেনা,তাদের একই সাথে একই মালিকের কাছ বিক্রি করতে হবে।

দাসদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য উমর, মালিক দাস একসাথে আহার করার আহবান জানান, তিনি বলতেন, ‘আল্লাহর অভিশাপ তাদের প্রতি যারা দাসদের সাথে একসাথে বসে খেতে কুন্ঠিত হয়। তিনি নিজেও প্রায়ই দাসদের তার সাথে খাবারের নিমন্ত্রণ জানাতেন।

উমর আরো আদেশ জারি করেন, যদি কোন মুসলিম দাস কোন অমুসলিম দাসকে নিরাপত্তা দান করে তবে তা এক মুক্ত মুসলনমানের দেয়া নিরাপত্তার সমান মর্যাদা পাবে। জেরুসালেম যাত্রায় উমর ভৃত্যকে উটে চড়িয়ে নিজে রশি ধরে হেটেছেন, তাঁর সমস্ত জীবনের সমতা বজায় রাখার সারমর্ম চিত্র যেন তার ভৃত্য সহযোগে জেরুসালেম ভ্রমণ!

তথ্যসূত্রঃ ১।সূরা আশ-শুআরাঃ২২

২।https://www.alim.org/history/khaleefa/umar/14/6/

মেয়েদের একাকী হজ্জ গমণ কি জায়েজ?

বুখারী শরীফে একটি হাদিস আছে, রাসুল (সাঃ) আদি ইবনে হাতিম আল তাঈ (বিখ্যাত দানবীর হাতেম তাঈর পুত্র) (রাঃ) কে বলছেন, ‘যদি তুমি যথেষ্ট দিন বেঁচে থাকো, তবে তুমি অবশ্যই দেখতে পাবে যে মহিলারা হিরা থেকে একাকী ভ্রমন করবে,যতক্ষণ না তারা কাবা প্রদক্ষিণ করবে (তাওয়াফ) এবং তারা এক আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবেনা।’

গত কিছুদিন ধরে যারা মহিলাদের একাকী হজ্জ্ব পালন নিয়ে অনলাইন সরগরম। অনেকেই ক্যাপশন দিচ্ছেন, ‘ নারীদের একাকী হজ্জ অনুমোদন, কেয়ামত আসন্ন’ । তারা সম্ভবত শুধুমাত্র রাসুলের মাহরাম নিয়ে হজ্জ্বের নির্দেশবাচক হাদিস সম্পর্কেই জানে, বা লোকে মুখে শুনেই জানে। কিন্তু, হাদিসের উসুলতো এভাবে কাজ করেনা। কোন বিষয়ে ফতোয়া নিতে সেটি সম্পর্কিত সকল হাদিস একসাথে করে সিদ্বান্ত নেয়া হয়, কোন একক হাদিসের উপর ভিত্তি করে নয়। যেমন, উপরোক্ত হাদিসে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, শুধুমাত্র সৌদী ফতোয়া বোর্ড নয় বরং মহিলাদের একাকী ভ্রমণ, এবং মক্কায় হজ্জ্ব, উমরা পালন স্বয়ং রাসুল (সাঃ) থেকে স্পষ্টভাবে অনুমোদিত।

কিন্তু, শর্ত থাকে যে নিরাপত্তার বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে।

আল হিরা ছিলো সাসান সাম্রাজ্যের ইরাক অংশের রাজধানী। রাসুল কখনো ইরাক বা হিরায় অভিযান পরিচালনা করেননি, তাঁর সর্বোচ্চ বৈদিশিক অভিযান ছিলো হেযাযের সাথে সিরিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চল মু’তা পর্যন্ত। আল হিরা খলীফা আবু বকরের সময় সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুসলনমানদের হাতে আসে।

মক্কা থেকে হিরার দূরত্ব যথেষ্ট বেশী, অপরপক্ষে মাহরাম সাথে করে নেবার হাদিসটি সম্ভবত মদীনায়, মক্কা বিজয়ের পরে বর্ণিত। রাসুল হিরা থেকে মহিলাদের একাকী এসে কাবার তাওয়াফের অনুমতি দিচ্ছেন, কিন্তু মদীনার সাহাবীকে দিচ্ছেন না, কারণ নিরাপত্তা্র প্রশ্ন। রাসুল মক্কায় থাকতেন না, মাত্রই মক্কার লোকেরা মুসলনমান হয়েছে, মেয়েদের জন্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি তখনো পর্যবেক্ষনাধীন , এই অবস্থায় মাহরাম সহ যেতে বলেছেন।

প্রথোমক্ত হাদিসের শেষ বাক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, ‘এবং তারা এক আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবেনা’

এটা সে সময়ের কথা যখন আজকের দিনের মত দ্রুতগতির যানবাহন ছিলোনা, উটের পিঠে মরুভূমি পাড়ি দিতে খুব দ্রুতগতিতে হলেও অর্ধ মাস লাগার কথা আর দাসপ্রথা যখন রমরমা। এর অর্থ যাত্রাকালীন পুরো সময়ে মহিলারা সুবিশাল মরুভূমিতে ডাকাত, দাসী হিসেবে বিক্রিত হয়ে যাওয়া, দুষ্ট লোকের নিগ্রহ অর্থাৎ জাগতিক কোন বিষয়েই ভয় রাখবেনা, জাগতিক সমস্ত ভয়ের উর্দ্ধে উঠে একমাত্র সুমহান আল্লাহর ভয় ছাড়া।

রাসুল এখানে দুটো বিষয়, মুসলনমানদের অধীনে ভাবী সাম্রাজ্য বিস্তার আর সেই সাম্রাজ্যে প্রায় অসম্ভব পর্যায়ের সুনিশ্চিত নিরাপত্তার দিকে ইংগিত করেছেন।

সম্ভত উমর (রা) সময়েই এত অসম্ভব নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা গেছিলো, বাকী তিন খিলাফাও সম্ভব, কেননা আদী ইবনে হাতিম আল তাঈ একশ বিশ বছর হায়াত পেয়েছিলেন, তিনি চার খোলফায়ে রাশেদার যুগই দেখে গেছেন। এই সেই স্বর্ণযুগ যাকে আমাদের এখনের ভাইয়েরা , কেয়ামত আসন্নের আলামত ভাবছেন।

রাসুলের স্ত্রীরাও মাহরাম ছাড়াই হজ্জে যেতেন, খলীফা উমর আব্দুর রহমান বিন আওফ ও উসমান বিন আফফান (রাঃ) নেতৃত্বে একটি সরকারি কাফেলার মাধ্যমে তাঁদের হজ্জের ব্যবস্থা করাতেন। রাষ্ট্রীয় কাফেলা কিন্তু মাহরা্মের পরিপূরক নয়। পরবর্তীতে তাই উসমান খলীফা হবার পর মাহরাম ছাড়া তাঁদের হজ্জ আর চালু রাখতে চাইলেন না, কিন্তু আয়েশা (রাঃ) তা কখনো শুনেননি।

কাফেলা সহযোগে মাহরাম ছাড়া মহিলাদের হজ্জ, উমরা সৌদী আরব সবসময়ই গ্রহন করেছে, শুধু বাকী ছিলো একদম একাকী ভ্রমণ, সেটিও উন্মুক্ত হয়েছে প্রায় তিনবছর, কিন্তু হঠাত এখন বেশী আলোচনা হচ্ছে, সৌদী এক মন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের পর।

অন্য সব বিষয়ে সৌদীর কঠোর সমালোচক হলেও বলতে হবে, সাম্প্রতিককালে সৌদী দুটো দারুন সিদ্বান্ত নিয়েছে।

এক, করোনাকালে প্রথমে হজ্জ্ব বন্ধ ও পরে সীমিত হজ্জ চালু করা

দুই, মেয়েদের মাহরাম ছাড়া হজ্জ্ব ঘোষণা দিয়ে অনুমোদন করা।

প্রথমটা নিয়েও অনেক হায় আফসোস , ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ানো হয়েছে, হজ্জ বন্ধ করে দেয়া হলো, আড়ালে কলকাঠি নাড়ছে ইজরাঈল, হজ্জ বন্ধ কেয়ামতের সুস্পষ্ট লক্ষণ , দাজ্জাল আর ইমাম মাহদী আসলো বলে। এখন দ্বিতীয়টাও নিয়ে হচ্ছে।

ইসলামের ইমেজ রক্ষার্থেও এই সিদ্বান্তের প্রয়োজন ছিলো। এখন মেয়েরা একাকী ইউরোপ, আমেরিকা সব জায়গায় যায়, ইউরোপ-আমেরিকাতো রীতিমতো মেয়েদের প্রতি নিরাপত্তার আইকনে পরিনত হয়েছে, কিন্তু মুসললিম দেশ সৌদী আরব বা হজ্জে যেতে পারেনা।

স্পষ্টতই এটা ইংগিত করে যে, সৌদীতে, হজ্জে খারাপ লোকেরা যায়, যাদের হাতে মেয়েরা অনিরাপদ। যেমনভাবে, উপমহাদেশের মেয়েদের মসজিদে যেতে দেয়া হয়না, ফিতনার ভয়ে। এর অর্থ যেন, মসজিদে সব খারাপ-দূর্বল চরিত্রের লোকেরা যায়, যারা মেয়েদের নামাজ দেখে নামাজ ছেড়ে নিয়ন্ত্রণহীণ বিষয়ে জড়িত হয়ে যেতে পারে, কিন্তু মার্কেটে, রাস্তায় সব ভালো লোক যেখানে মেয়েরা দিব্যি নিরাপদে ঘুরে বেড়াতে পারে।

মেয়েদের প্রতি নিরাপত্তা একটি দেশের, রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও সাফল্যের সূচক। শুধুমাত্র আধুনিক রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় নয়, রাসুলের হাদীস মোতাবেকও। রাসূলের ওই হাদিস ইসলামী খেলাফতের সময়ে নিরাপত্তার উতকর্ষতার সনদ।

যেমন, বর্তমান আফগানী ছাত্ররা ফরমান জারি করেছে যে মেয়েরা মাহরাম ছাড়া একাকী ভ্রমণ করতে পারবেনা। এরা স্বীকার করেই নিচ্ছে, যে এরা মেয়েদের নিরাপত্তা প্রদান করতে পারবে না বা করার কোন ইচ্ছাও নেই। এই আইন নির্লজ্জের মত ঘোষণা করছে যে বর্তমান আফগানিস্তানে নারীদের নিরাপত্তা আমেরিকা অধিকৃত আফগানিস্তানের চাইতে খারাপ, অতএব সাথে সার্বক্ষণিক পুরুষ নিয়ে বেরোও।

যে সরকার নিরাপত্তা দিতে পারবে না, তারতো সরকার গঠনের যোগ্যতাই থাকেনা কিন্তু সরকার গঠণ করে বসে আছেন, কারণ উনারা বিশিষ্ট ইসলামী সরকার! আফগানী ছাত্রদের সরকার যতটা না ইসলামী তার চেয়েও বেশী আফগানী রক্ষণশীল গোত্র ধারার ও হানাফী মাযহাবের অনুসারী সরকার। হানাফী মাযহাব ব্যতীত বাকী তিন মাযহাবেই নারীরা মাহরাম ছাড়া ভ্রমণ করতে পারে।

সৌদী সরকার যেহেতু হানবালী মাজহাবের অনুসারী ও হজ্জ্বে আগত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের নিরাপত্তা দিতে আত্নবিশ্বাসী তাঁদের সেহেতু তারা এই সিদ্বান্ত নিয়েছে।

নারী নেতৃত্বের হাদিস

উমরনামাঃ পারস্য অভিযান

রাসুল (সাঃ) হিজিরী ষষ্ঠয় পারস্যের শাহ খসরু পারভেজ বা দ্বিতীয় খসরুর কাছে ইসলাম গ্রহনের আমন্ত্রণ সম্বলিত চিঠি পাঠান। তাকে বিজয়ী খসরু বলেও ডাকা হতো, তার সময়ে পারস্য সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ বিস্তৃতির জন্য এবং সে ছিলো জরুস্থ্রু পারস্যের শেষ শ্রেষ্ঠ শাহ। সেই কেন শেষ শ্রেষ্ঠ শাহ, সেই কাহিনীই এই চিঠিতে লুকোনো।

রাজ্যজয়ী খসরু রাসুলের সেই চিঠি পড়ে রাগে টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেলে।এমনকি উদ্ধতের সাথে নির্দেশ দেন যেন এই রাসুলকে যেন বন্দী করে তার দরবারে নিয়ে আসা হয়। এ কথা শুনে নবী বলেছিলেন, (চিঠি নয়) পারসিকরা নিজেদের রাজ্যকেই টুকরো টুকরো করে ফেলল।

ওই অপমানের কথা নবীজির চিরদিন মনে ছিলো। উনার থেকে থেকেই সে কথা মনে হতো। খন্দকের যুদ্ধ বা পরিখার যুদ্ধে পরিখা খননের সময়, রাসুল ও সাহাবীদের বড় কষ্টের সময়ে, যখন ভারী ভারী পাথরে তাঁর কোদাল লেগে যাচ্ছিলো তখনো তিনি পারস্য জয়ের দৃশ্য চোখের সামনে ফুটে উঠতে দেখেছিলেন।

রাসুলকে আর খসরুর বন্দী করা হয়নি। ক্ষমতা নিয়ে নিজের প্রধান সহচর, রাজপরিবারের সদস্যদের সাথে ক্ষমতা নিয়ে তার প্রচন্ড দ্বন্দ শুরু হয়। এতটাই যে বড় ছেলে শিরোঈর (kavad II) হাতে ৬২৮ খ্রিঃ সে বন্দী ও পরবর্তীতে মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত হয়। তবে তার আগে তার প্রিয় ছোট ছেলে ও সিংহাসনেরকে সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীকে তার সামনে হত্যা করা হয়।

পিতার মৃত্যুর পর , শিরোঈ ক্ষমতায় বসে আপন ও সৎ মিলে মোট পনেরোর মত ভাইদের সবাইকে হত্যা করে। অনেক সন্তানের গর্বিত পিতা থেকে খসরু নির্বংশ হয়ে পরে। আর বাকী থাকে দুই বোন।সিংহাসনে বসে শিরোঈর সাত বছর বয়স্ক নাবালক পুত্র। পরে তাকেও হত্যা করা হয়। তার পরে আসে তার আরেক নাবালক ছোট ভাই।পরবর্তীতে তাকে হত্যা করা হয়। বাকী থেকে সবচেয়ে ছোট পুত্র তৃতীয় ইয়াযদেগেরদ। কিন্তু ,সে তখনো শিশু হওয়ায় সিংহাসনে তখনই বসতে পারলো না।

রাসুলের ভবিষ্যৎ বানী সত্য হয়ে দারুন এক সমৃদ্ধ রাজপরিবার মাত্র কয়েকবছরের মধ্যে নির্মম সব হত্যাকান্ডে নিজেরা নিজেদেরকে শেষ করে দিতে থাকে।পুরো রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে পরে বিশৃঙ্খলা । রাসুল এসব খবর পেতেন।

তৃতীয় ইয়াযদেগেরদ বড় হবার এই সময়টুকুতে অন্তরবর্তীকালীন সময়ের সিংহাসনে পালাক্রমে বসে খসরুর বেঁচে যাওয়া দুই মেয়ে। শিরোঈয়ের হাত থেকে এই দুই মেয়ের বেঁচে যাওয়ার কারণ, এই দুই বোনের একজন বোরান ছিলো তার সৎ ভাই শিরোঈর স্ত্রী।

তো, এই দুই মহিলার সিংহাসনে বসা নিয়ে একটি বহুল ব্যবহৃত গারীব হাদিস আছে। গারীব মানে, যে হাদিস মাত্র একজন বর্ননাকারী থেকে বর্নিত হয়েছে, এই হাদিসের আর কোন বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী নেই ।

বলা হয়ে থাকে রাসুল যখন শুনেন, কোন পুরুষ উত্তরাধিকার না পেয়ে পারস্য দুজন একজন মেয়েকে ক্ষমতায় বসিয়েছে, রাসুল তখন বলেন, ‘যে জাতি কোন নারীকে ক্ষমতায় বসায় সে কখনো সফলকাম হতে পারে না’।
এই এতটুকু শুনে মনে হতে পারে যে রাসুল, নারীদের ক্ষমতার জন্য দূর্বল, অযোগ্য, অশুভ হিসেবে চিত্রিত করেছেন, নারী এতটাই অপয়া যে সে যদি যোগ্যও হয়, তবু তার উপস্থিতিতে সেই জাতি অসফলকাম হবেই।

অথচ, এই হাদিস একটি বিশেষ জাতি (পারস্য), একটি বিশেষ সময়ে (খসরুর রাজত্বকাল) ও পেছেনে রাসুলের সাথে খসরুর বেয়াদবীর ইতিহাসে সাপেক্ষে বর্ণিত, কোন বৈশ্বিক পরিমন্ডলে সাপেক্ষে নয়। সেই বিশেষ জাতি (পারস্য) ধ্বংস হয়েছে খসরুর কারনে, খসরুর পিতৃহন্তারক ও ভাই হত্যাকারী পুত্রদের কারনে, যারা সকলেই পুরুষ।এই রাজ্যে অভিশাপ বয়ে নিয়ে এসেছিলো এক পুরুষ, সেই জাতির ব্যর্থতার কারনও পুরুষ, ওই দুই নারী সর্বোচ্চ দুই বছর ক্ষমতায় ছিলেন, যখন তাদের আর কিছুই করার ছিলোনা। এত কম সময়ে তারা রাজ্য গুছিয়ে আনার মত কিছুই করতে পারেননি এবং অবস্থার এক বিন্দু পরিবর্তন না হয়ে বিশৃঙ্খলা চলতেই থাকে। তাদের কারোরই রাজত্তকাল এক বছরের বেশী স্থায়ী হয়নি।

পরবর্তীতে তাদের এক বোন রুস্তম ফররুখজাদের হাতে মারা যান আর অপরবোন বোরান, যিনি মূলত রুস্তমের হাতেই মূল ক্ষমতা ন্যস্ত করে নিজে স্রেফ অলংকারিক পদ ধরে রাখেন, পরবর্তীতে ভাই ইয়াযদেগেরদ তৃতীয়র হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দৃশ্যপট থেকে বিদায় নেন। ইয়াযদেগেরদ পরবর্তীতে উমরের শাসনামলে সম্পূর্ণরুপে পরাজিত হয় এবং সেই সাথে পতন হয় পারস্য সাম্রাজ্যের।

হাদিসটি সরাসরি কোরানের সাথে সাংঘর্ষিক, কোরানে সেবার রানীর কথা বিবৃত হয়েছে এবং তাঁকে মোটেও ব্যর্থ হিসেবে চিত্রিত করা হয়নি। হয়তো রাসুল, আগে-পরে আরো অন্য কথাও বলেছিলেন বা অন্যপক্ষ থেকে শুনেছিলেন; কথাপ্রসঙ্গে এই কথাটি বলা হয়েছে। একটা সম্রাজ্যের আন্তঃকন্দোল কতটা বেশী হওয়ায় নারীকেই বসতে হলো, তার মানে সেই সাম্রাজ্যের অবস্থা খুব নাজুক, এবং ব্যর্থ হতে বাধ্য এমন কিছু বোঝাতেও বলা হতে পারে।

কিন্তু আবু বাকরা (রাঃ) শুধুমাত্র একটিমাত্র লাইনই উদ্ধৃত করেছেন, কারণ উটের যুদ্ধে তিনি আলীর (রাঃ) পক্ষে ছিলেন, এবং আয়েশাকে (রা) ঠেকাতে শুধুমাত্র যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকুই ব্যবহার করেছেন। এটি যতটা না ধর্মীয় কারনে বর্ণিত তার চেয়ে বেশী রাজনৈতিক হাদিস। উটের আর সিফিফিনের যুদ্ধে কতভাবেইতো কোরান আর রাসুল ব্যবহৃত হয়েছেন।

আল্লাহই উত্তম জানেন, আবু বাকরা জীবনের একটি দীর্ঘ সময় দাস হিসেবে ছিলেন,খায়বারের দূর্গ অবরোধের সময় যারা দূর্গ থেকে মুসলমান হিসেবে বের হয়ে আসবেন,তারা প্রাণে বেঁচে যাবেন্‌ এমন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলে তিনি বের হয়ে আসেন এবং মুসলনমান হন। তিনি কোন মুহাদ্দিস নন এবং খলিফা উমরের (রাঃ) সময়ে মিথ্যা সাক্ষী জনিত একটি বিচারে তিনি শাস্তি স্বরুপ বেত্রাঘাত প্রাপ্ত হয়েছিলেন।

আমার অবাকই লাগে, মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল বুখারী (রাহি) কিভাবে উমর (রাঃ) থেকে সাক্ষ্যদান সংক্রান্ত বিষয়ে শাস্তিপ্রাপ্ত একজনের হাদিস তাঁর বইয়ে স্থান দেন।উমর (রা) যদি জানতেন, তিনি কী বুখারীর উপর খুশী হতেন!

খসরু কন্যা বোরান

উমরনামা। পর্দার আয়াত ও উমর (রা)

সাধারনত আমরা জানি, নারীদের পর্দার আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপটের বড় চরিত্র উমর (রাঃ)।

হাদিসটি হলো এই, আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবীজীর স্ত্রীরা প্রাকৃতিক কর্ম সারতে (টয়লেট) আল-মানাসিতে যেতেন, যা একটি বিশাল উন্মুক্ত প্রান্তর (বাকীয়া নামক স্থানের কাছে,মদীনায়)। উমর (রাঃ) রাসুল (সাঃ)কে বলতে থাকেন যে , “আপনার স্ত্রীদেরকে পর্দায় আনুন’, কিন্তু আল্লাহর রাসূল তা করলেন না। একদিন রাতে, আল্লাহর রাসুলের স্ত্রী সাওদা বিনতে জামা’আ এশার সময়ে বের হয়ে আসলে এবং উনি ছিলেন অনেক লম্বা মহিলা। উমর তাঁকে চিনে ফেলেন এবং বলেন, “হে সাওদা,আমি তোমাকে চিনে ফেলেছি’! উনি এমনটা করলেন যাতে পর্দার আয়াত দ্রুত নাযিল হয়। তাই, আল্লাহ হিজাবের আয়াত নাযিল করলেন।  

(বুখারী ভলিউম ১, বই ৪, হাদিস নং ১৮8)

এক নজরে হাদিসটি অস্বস্তিদায়ক, এবং অস্বস্তি হওয়াই স্বাভাবিক।

প্রথম অস্বস্তির কারন সাওদার প্রতি উমর (রাঃ)র ব্যবহার।

মনে হচ্ছে যেন, উমর মেয়েদের পর্দায় আনতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন, এতটাই যে সাওদা (রাঃ)কে রাতের বেলায় অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছিলেন। সাওদার (রাঃ) প্রতি উমরের ব্যবহার যেকোন ভাবেই অনপ্রেভিত এবং উমরের ব্যবহারে যারপরনাই বিরক্ত হয়ে সাওদা সে রাতে রাসূল (সাঃ)কে উমরের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছিলেন।

দ্বিতীয় অস্বস্তির কারন, স্বয়ং, আল্লাহর রাসূল বেঁচে থাকতে, উমর (রাঃ)র কেন নারীদের বা নবীপত্নীদের পর্দার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন?

উমরের (রা) এমন ব্যবহারের পেছনে কারন ছিলো।

বিষয়টি পুরো বুঝতে সূরা আল আহযাবের তাফসির খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সূরা আহযাবের আলোচ্য বিষয় মূলত তিনটি; খন্দকের যুদ্ধ- যয়নব ও রাসূল (সাঃ)র মধ্যকার বিয়ে নিয়ে মুসলনমানদের সংশয় দূরকরন এবং উম্মতের মায়েদের চলাচল ও জীবন যাপনের সীমারেখা নির্ধারণ।এর প্রত্যেকটি বিষয় একটি অপরটির সাথে জড়িত উমরের সেইদিনের সেই ব্যবহারের সাথে। 

হিজরী পঞ্চম সাল, উহুদ যুদ্ধ পরবর্তী সময়।

উহুদের পরাজয়, রাসূল (সাঃ)কে হত্যা প্রচেষ্টায় মদীনা থেকে উচ্ছেদ হয়ে খাইবারে আশ্রয় নেয়া ইহুদী গোত্র বনু নাদীরের (নাযির) গোত্র প্রধানদের মুসলমানদের মদীনা থেকে উচ্ছেদে উৎসাহী করে তুলে।তারা মক্কার মুশরিক, মক্কা ও মদীনার গাতাফান গোত্রের সাথে পুনঃ পুনঃ আলোচনা, যুদ্ধপরবর্তী মালামালের ভাগবাটোয়ারার ভিত্তিতে প্রায় দশ হাজার সৈন্যের বিরাট বাহিনী নিয়ে মদীনা আক্রমনের রুপরেখা চূড়ান্ত করে। এই গোত্রদের দিকে ইংগিত করেই নামকরন হয়েছে সূরা আল আহযাবের, আহযাব; যার অর্থ গোত্রসমূহ। মদীনার বাহিরে তখন দশহাজার সৈন্য, আর ভিতরে মুনাফিক ও আরেক থেকে যাওয়া ইহুদী গোত্র বনু কুরাইজার বিশ্বাসঘাতকতা। বাহিরের বিশাল বাহিনী থেকে মদীনা রক্ষা করতে মদীনার এক প্রান্ত বিরাট পরিখা কাটা হয়, যা ইতিহাসে খন্দকের যুদ্ধ। দৃঢ় মনোবল ও প্রচন্ড ধৈর্য্য পরীক্ষায় মুসলমানেরা এই যুদ্ধে দারুন জয় পায়।দ্বিতীয়বারের মত চুক্তি ভঙ্গ করে বিশ্বাসঘাতকতার ও মদীনার বাহিরের শক্তির প্রতি সহযোগীতার জন্য বিচারপরবর্তী কঠোর শাস্তি দেয়া হয় বনু কুরাইযাকে, হত্যা করা হয় প্রায় হাজারের কাছাকাছি ইহুদীকে। শাস্তি বাস্তবায়নের ধরনে কেঁপে উঠে সমগ্র হেযায।

পরপর এমন তিনটি ঘটনায় আল্লাহর রাসুল হিসেবে মুহাম্মদের (সাঃ) অবস্থান এবং তাঁর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে; তাঁদেরকে আর পরাজিত করার সম্ভাবনা আপাত প্রায় অসম্ভব।

ঠিক এমন সময় বিরোধীদের হাতে এমন এক ঘটনা আসলো যা তারা নবীর এই প্রতিষ্ঠিত সম্মান নষ্ট করতে সর্বশক্তি ব্যয় করলো।

সেই ঘটনা হলো জয়নব (রাঃ) ও রাসূল (সাঃ)র বিয়ে।

১।বলা বলা হয়ে থাকে , আরবেরা পালকপুত্রকে নিজের পুত্র সমতুল্য বিবেচনা করতো। সেই নিজের পালকপুত্রের স্ত্রীর সাথে তালাক পরবর্তী বিয়ে ওই সমাজে একেবারেই নিয়মের বাহিরে গিয়ে নতুন ঘটনা বিধায় নবী ও তাঁর পরিবার মুহুর্তেই পরিনত হলো মদীনার সবচেয়ে চর্চিত বিষয়ে।

বিষয়টি সব সময় এত সরল নয়। যেমন, উমরের পিতামহ নুফাইলের দুই স্ত্রীর ঘরে দুই সন্তান ছিলো; খাত্তাব এবং আমর। নুফাইলের মৃত্যুর পর খাত্তাবের মা তার সৎ পুত্র আমরকে বিয়ে করেন; যাদের পুত্র ছিলো বিখ্যাত জান্নাতী, যায়েদ ইবনে আমর। দেখা যাচ্ছে, তারা সৎ পুত্রকেও নিজের পুত্র হিসেবে তেমন বিবেচনায় নিতো না, কিন্তুকিন্তু, রাসুল বিয়ে করতেই ব্যপারটি খুব সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ালো।

২।এর আগে আয়াত নাযিল হয়েছিলো স্ত্রী সংখ্যা চারের মধ্যে রাখা বিষয়ক, কিন্তু রাসূলের এই পঞ্চম বিয়ে পূর্বে নাযিলকৃত আয়াতের বিপক্ষে যায়। মুশরিক, মুনাফিক এবং ইহুদী এই তিন জাতি একজোট হয়ে বদনাম ছড়াতে থাকলো যে ,‘মুহাম্মদ ও কোরান মোটেও কোন ঐশ্বরিক কিছু নয়, বরং তিনি সামান্য পুরুষ যিনি নিজ পালকপুত্রবধু জয়নবকে পছন্দ করায় কোরানের বিধান বদলে দিয়ে এই বিয়ে করে নিয়েছেন’। নবীর এই বিয়ে নিয়ে মুসলমানদের ঈমানের বড় পরীক্ষা চলছিলো, বিয়ে ও নারী এমন বিষয় যা দিয়ে সহজেই নবীকে ঐশ্বরিক থেকে সামান্য পুরুষে পরিনত করা যায়।

নবীর এই বিয়ে সংক্রান্ত বিষয়ে মদীনায় নবীর স্ত্রীদের ব্যাপারে আগ্রহ বেড়ে যায়। 

উমর এই বিষয়ে অস্বস্তিবোধ করতেন যে, যারাই রাসুলের (সা) সাথে সাক্ষাৎ করতে যেতেন তারাই তাঁর স্ত্রীদেরকেও অবলীলায় দেখতে পারতেন। আর সবকিছুর মতই উমর আরবের বাহিরের দুনিয়া সম্পর্কেও ভালো জানতেন, ব্যবসায়ের কাজে তিনি বহু স্থানে গেছেন।তিনি জানতেন, কোন সাম্রাজ্যের উচ্চস্তরের নারীরা সাধারনের এতটা ধরাছোয়ার মধ্যে থাকেন না। তাদের জন্য সুউচ্চ দূর্গ আছে, নিরাপত্তায় ঘেরা আড়ালের ব্যবস্থা আছে। ব্যতিক্রম শুধু রাসুলের স্ত্রীরা অথচ রাষ্ট্রপ্রধান ও রাসুলের স্ত্রী হিসেবে তাঁদের দায়িত্ব,মর্যাদা এবং সামাজিক অবস্থান শুধু মদীনা নয় সারা দুনিয়ার মধ্যেই খুবই উচ্চস্তরের।আবার স্ত্রীর মর্যাদার সাথে স্বামীর মর্যাদাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এখন রাসুলতো কিছুতেই তাঁর জন্য রাজপ্রাসাদ বা দূর্গ বানাবেন না। একবার উমর রাসুলের জন্য, খুঁজুরের চাটাইয়ের পরিবর্তে আরেকটু ভালো কিছুর সুপারিশ করেছিলেন, রাসুল সরাসরি নাকচ করে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় কারন, উমরের কন্যা হাফসা (রাঃ),যিনি একই সংগে নবীপত্নীও। আল্লাহর রাসূলের পর উমর যাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশী ভাবতেন; তিনি হাফসা

মুনাফিক ছাড়া, মুসলনমানদেরও নবীর অন্দরে নিত্য আনাগোনা ছিলো, যারা সকলেই সমান প্রজ্ঞাবান নয়। এত মানুষের পক্ষে নবীর বা নবীর পরিবারের উপযুক্ত সম্মান দেখানো স্পম্ভব নয়।

ইমাম আল নাসাঈ থেকে বর্নিতঃ একদিন আয়েশা (রাঃ) একদিন রাসূলাল্লাহর (সাঃ) ও অন্যান্য সাহাবীদের সাথে একসাথে বসে খাচ্ছিলেন। তারা সবাই একটি বড় থালা থেকে খাচ্ছিলেন, এবং তাঁর (আয়েশা) হাত দূর্ঘটনাক্রমে একজন অতিথির হাতের সাথে লেগে যায় যাতে রাসূল (সাঃ) অসুন্তুষ্ট হন।

জয়নব বিনতে জাহশের সাথে বিয়ের ওয়ালিমার রাত।দুজন সাহাবী এত রাত করে রাসূলের বাড়ি থেকে বের হন যা রাসূলের কষ্টের কারন হয়ে পরে।তাছাড়া ঘরে নবীর স্ত্রীরাও আছেন, এত বেশী সময় বাহিরের পুরুষ থেকে যাওয়া তাঁদের সম্মানের পক্ষেও প্রতিকূল।

উমর তাই চাইতেন, নবীর স্ত্রী ও অন্যান্যদের ধরা ছোঁয়ার মাঝে আড়াল বা পর্দা থাকে।উমর বলতেন, হে আল্লাহর রাসুল, খারাপভালো দুইই আপনার ঘরে প্রবেশ করে, তবে কেন আপনি উম্মতের মায়েদের পর্দার আড়ালে থাকতে বলেন না? (বুখারী)

রাসুলের এমন নীরবতার কারন খুঁজতে আমরা ইবরাহীম (আঃ) ও হাজেরা (আঃ)এর কাহিনী। ইবরাহীমের প্রথম স্ত্রী সারাহ তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী হাজেরাকে দুধের শিশু ইসমাইল সহ কয়েকশত কিলোমিটার দূরে এক জনমানবহীন মরুভুমিতে ফেলে দিয়ে আসতে বললেন। অবশ্যই, খুবই অমানবিক সিদ্বান্ত। এখন হাজেরার স্বামী এবং ইসমাঈলের পিতা হিসেবে ইবরাহীম (আঃ) এঁর একটা দায়িত্ব ছিলো। তাঁর অবশ্য কর্তব্য ছিলো সারাহকে তিরস্কারসমেত এই প্রস্তাব এক বাক্যে নাকচ করা। কিন্তু, করেননিতো। বরং সারাহর ইচ্ছা সম্পর্কে আল্লাহকে জিজ্ঞেস করেছেন আর যতদিন না ফায়সালা আসেনি চুপ থেকেছেন কারণ, তিনি প্রথমে নবী তারপরে স্বামী, পিতা এবং অন্যান্য।

ইয়াকুব (আঃ) এর নিকট যখন তার পুত্রগণ। আরেক পুত্র ইউসুফ (আঃ)র রক্তমাখা, ছেঁড়া জামা নিয়ে তাঁকে ইউসুফের মৃত্যুর কথা জানায়, তিনি জানতেন, যা বলা হচ্ছে মিত্যা, সর্বৈব মিথ্যা, এখনো খুঁজলে হয়তো আদরে ধন, ইউসুফ সারাজীবনের জন্য হারিয়ে যাবেনা। তবু দেখবেন, ইয়াকুব (আঃ) পুত্রদের দোষারোপ, অস্থির হুমকি-ধামকি, জোর-জেরা কিছুই করছেন না,  তাঁর মুখ থেকে শুধু জগৎখ্যাত দুটো বাক্যই বের হয়েছে!

فَصَبۡرٌ جَمِیۡلٌ ؕ ধৈর্য‍্যই সুন্দর

إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ* “আমি তো আমার পুরনো দুঃখ ও নতুন দুশ্চিন্তা আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি”।

নবীরা তাঁদের উপর অর্পিত দায়িত্বের শর্তানুসারে নিজেদের ব্যক্তিগত বিষয়েও সহজে মন্তব্য বা কোন উদ্যোগ নিতে পারেন না।নবী হিসেবে তাঁদের প্রধান কাজ দুটি, ১ প্রতিটি বিষয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে, অতএব আল্লাহর সিদ্বান্তে অটল-অবিচল থাকা। ২। আল্লাহর কথা মানুষের কাছে পৌছে দেয়া। তারা যা কিছু বলবেন তাই হয়ে যাবে শরীয়াহ কিন্তু শরীয়াহ প্রণয়নের একমাত্র এখতিয়ার আল্লাহর। রাসুল মুহাম্মদই তাই। সাল্লেল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

রাসুল একবার তিনরাত অসুস্থতার জন্য তাহাজ্জুদে উঠতে পারেননি। এই সময়ের জন্য ওহী নাযিল বন্ধ ছিলো। তা দেখে বলতে লাগলেন, মুহাম্মদের শয়তান তাঁকে ছেড়ে গেছে। প্রিয় আল্লাহ, জীবরাঈল (আঃ) সম্পর্কে এমন কথা শুনেও রাসূল চুপ ছিলেন, প্রচন্ড কষ্ট পেলেও চুপ ছিলেন, তাঁর হয়ে জবাব দিয়েছিলেন আল্লাহ, সূরাহ আল ইনশিরায়

مَا وَدَّعَکَ رَبُّکَ وَ مَا قَلٰی

‘তোমার রব তোমাকে পরিত্যাগ করেননি এবং তোমার প্রতি অসন্তুষ্টও হননি।‘

জয়নাবের সাথে তার বিয়ে নিয়েও তাই। চোখের সামনে সবাই ভুলে গেলো, জয়নাব তাঁরই মামাতো বোন, ছোটবেলা থেকে তাঁকে তিনি চিনেন, ভালোবাসলে আরো আগেই ভালোবাসতে পারতেন, বিয়ে করতে চাইলে কুমারীই করতে পারতেন, বরং নিজে ঘটকালি করে পালকপুত্রের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। যুক্তি সব চোখের সামনেই আছে, কিন্তু তিনি চুপ।

তাঁর স্ত্রীদের নিয়ে লোকে কথা বলছে, এমন নয় যে শুধু সব উমরই বুঝেন, উমরই প্রজ্ঞাবান, আল্লাহর রাসূল নন বরং মানুষ হিসেবে তাঁরও রক্ত-মাংস আছে, কষ্ট-ভালোবাসা আছে। সবচেয়ে যাকে ভালোবাসতেন, যার সম্পর্কে তাঁর প্রিয়তম মেয়েও অভিযোগ করলে তিনি কষ্ট পেতেন, সেই আয়েশার (রাঃ)সাথে এক সাহাবীকে জড়িয়ে অপবাদ নিয়ে সমগ্র আরব মুখর হয়ে উঠেছে, পুরো মদীনায় আয়েশার নামে বাজে কথার চর্চা চলছে, কিন্তু রাসূলাল্লাহ সমাজপতি, রাষ্ট্রপতির অগাধ ক্ষমতা নিয়ে চুপ। স্বামীর এহেন নীরবতায় একদিকে স্ত্রী আয়েশা কষ্টে কেঁদে বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন, অন্যদিকে আল্লাহর রাসুল যা বলার শুধু আল্লাহকে বলে গিয়েছেন। এবং তাঁর হয়ে সুরা আন নূরে (২৪:১১-২১) উত্তর আল্লাহ দিয়েছেন। সীরাহ থেকে এরকম শত শত উদাহারন দেয়া যাবে।

কিন্তু, উমরের সেই বাধ্যবাধকতা নেই, তাই তাঁর জন্য যা কিছু অবলীলায় বলা সম্ভব আল্লাহর রাসুলের পক্ষে তা নয়। পরবর্তীতে খলিফা হবার পর উমরও তা বুঝেছিলেন, উমর তখন কথা বলতেন কম।

রাসুলের বিভিন্ন মানসিক অবস্থা সাপেক্ষে, তাঁর স্ত্রীদের জন্য ধারাবাহিক আয়াত নাযিল হয়, যার বাকীগুলোর কোনটিতেই উমর অনুঘটক ছিলেন না। যেমন, জয়নব (আঃ)র সাথে ওয়য়ালিমার পরেরদিন সকালে রাসুলের ঘরের শিষ্টাচার ও তাঁর স্ত্রীদের প্রতি ব্যবহারের বিস্তারিত নির্দেশনা সংক্রান্ত এই আয়াত নাযিল হয়।

হে মু’মিনগণ! তোমাদেরকে অনুমতি দেয়া না হলে তোমরা খাদ্য প্রস্তুত হওয়ার আগেই আহারের জন্য নবী-গৃহে প্রবেশ করনা। তবে তোমাদেরকে আহবান করলে তোমরা প্রবেশ কর এবং আহার শেষে তোমরা চলে যেও; তোমরা কথাবার্তায় মশগুল হয়ে পড়না। কারণ তোমাদের এই আচরণ নবীকে পীড়া দেয়, সে তোমাদেরকে উঠিয়ে দিতে সংকোচ বোধ করে। কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচ বোধ করেননা।

তোমরা তার স্ত্রীদের নিকট হতে কিছু চাইলে পর্দার অন্তরাল হতে চাইবে। এই বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্র।

(৩৩:৫৩)

স্বাভাবিকের বাহিরে রাসূলের স্ত্রীদের প্রতি অনেকের বিবাহ সংক্রান্ত আগ্রহও ছিলো। তালহা (রাঃ) উম্মে সালামা সম্পর্কে বলেন, রাসূলের মৃত্যুর পর তিনি তাঁকে বিয়ে করবেন।

তোমাদের কারও পক্ষে আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেয়া অথবা তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীদেরকে বিয়ে করা সংগত নয় আল্লাহর দৃষ্টিতে এটা ঘোরতর অপরাধ (৩৩:৫৩)

এতো গেলো, রাসূলের ঘরের ভিতরের পর্দা কিন্তু তখনো রাসূলের স্ত্রীরা বাহিরে বের হলে খোলামেলাই বের হতেন, যাদের খুশী তারা বাহিরে তাঁদের দেখে নিলেই পারতেন। উমর ওই সময়ের জন্যও পর্দা চাইতেন কিন্তু আল্লাহর রাসুল নিজে থেকে কোন শরীয়াহ প্রণয়ন করতে চাননি, যথারীতি আল্লাহর রাসূল ওহীর অপেক্ষায় ছিলেন এবং উমর তা জানতেন  ।

হে নবী! আপনির আপনার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে মুমিন নারীদেরকে বলুন, ‘ তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয় এতে তাদের চেনা সহজতর হবে (নবী পত্নী হিসেবে), ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবেনা আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু  (সুরা আহযাব-৫৯)

কিছু উল্লেখ্যযোগ্য বিষয়…

১। উমর সমগ্র নারী জাতির পর্দা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন না, তিনি চেয়েছিলেন মূলত নবীর মর্যাদা, উম্মতের মায়ের মর্যাদা এবং নিজের কন্যা হাফসা (রা) জন্য পর্দা। এমনকি, উমরের শাসনামলে মুসলনমান দাসীদের মুখ ঢাকা নিষেধ ছিলো, সম্ভ্রান্তদের থেকে তাদের আলাদা রাখতে, কিন্তু তারা মাথা ও সারা শরীর ঢাকার পর্দা করতেন। সূরা আহযাবেরতভাবে সুস্পষ্টভাবে শুধুই রাসুলের ঘরের নারীদের জন্য নাযিলকৃত আয়াত,

হে নবীপত্নীগণ!তোমরা কোন সাধারন নারীর মত নও,

যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তবে পরপুরুষের সাথে বাক্যালাপে এমনভাবে কোমল কন্ঠে কথা বলো না যাতে অন্তরে যার কুপ্রবৃত্তির রোগ রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয় আর তোমরা রীতি অনুসারে কথা বলবে

আর তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করবে এবং আল্লাহ এবং প্রাচীন মূর্খতা যুগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেরাবে না

…হে নবী পরিবার! আল্লাহ তো তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে চান এবং তোমাদেরকে সর্বোতভাবে পবিত্র রাখতে চান’ (৩২-৩৩)

বাকী নারীদের পর্দার আয়াত সূরা আন নুরের ২৪ নং আয়াত।

২। সাওদা (রাঃ)র সাথে উমরের ব্যবহার। তখনের মুসলনমান সমাজে নারী পুরুষের এতটা বিচ্ছিন্ন ছিলোনা। উমর অন্যান্য নারী সাহাবীদের সাথেও সমানে কথা বলতেন এবং নারী বা পুরুষ যেই হোক, লোকে তাঁর ব্যবহার নিয়ে কী ভাববে তা নিয়ে মোটেই বিচলিত থাকতেন না। যা বলার বলে মনে করতেন, স্রেফ বলে দিতেন। সাওদা (রাঃ)কে দেখেছেন, দেখে চিনেছেন, তা জানান দিয়ে বলে দিয়েছেন এবং চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চেয়েছেন, উম্মতের মায়েরা (সাওদা নবী পত্নী হিসেবে, উমরেরও মা) তাঁদের চিনে ফেলার ব্যাপারে কতটা নাজুক অবস্থায় আছেন, উমরের জায়গায় কোন মুনাফিক থাকলে পরিনতি আরো খারাপ হতেও পারতো। যেমন, এই ঘটনার কিছুদিন পরেই মা আয়েশা (রাঃ) এক সাহাবীঁর সাথে জড়িয়ে বিশ্রী এক গুনাহের অপবাদ সমগ্র মদীনায় ছড়িয়ে পরে। এর অর্থ,আয়াত নাযিলের পরেও সমাজে রাসুলের স্ত্রীদের উম্মতের মা হিসেবে যথাযোগ্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হচ্ছিলো।

৩। উমর স্বয়ং আল্লাহ নিয়ে কীভাবে এত আত্নবিশ্বাসের সাথে কথা বলতেন। উমর কী আল্লাহকে ভয় পেতেন না?

উমরকে (রাঃ) পড়তে দুইধরনের চশমা রাখতে হবে।

খিলাফতের আগের উমর।

খিলাফতের পরের উমর।

প্রথম কারন হলো, আল্লাহ আযযা ওয়াজাল শুধু ভয়ের প্রভু নন, তাঁর সাথে বান্দার সম্পর্ক স্রেফ ভয়ের নয়। তিনি বন্ধু ,অভিভাবক ও ভালোবাসার প্রভুও।বান্দা তাঁকে ডাকে, এবং তিনি তাঁর ডাকে সাড়া দেন। আমাদের প্রত্যকের জীবনেই এমন অসংখ্য ঘটনা আছে, যেখানে আমরা আল্লহর কাছে যেভাবে চেয়েছি, আল্লাহ সেভাবে দিয়েছেন, আমরা এসব দোয়া কবুলের কাহিনী বলেও থাকি, মুমিনের হীবনে এগুলো খুবই স্বাভাবিক বিষয়। উমরও তাই। উমর আল্লাহকে চিনিছিলেন, উনি তাঁকে পেয়েছিলেন। উমরও গর্বের সাথে এই কথাগুলো বলে বেড়াতেন, যে আল্লাহ তাঁর কথায় সম্মত হয়েছেন, আল্লাহর রাসূলও উমরকে কখনো শুধরাতে চেষ্টা করেননি।

খিলাফতের আগের উমর মানে যতদিন রাসুলাল্লাহ, আবু বকর (রাঃ), উমরের দুই অভিভাবক বেঁচে ছিলেন    যত বেশী আল্লাহকে নিয়ে আত্নবিশ্বাসের সাথে কথা বলতেন, খেলাফতের উমর তার একেবারে বিপরীত। তিনি যানতেন এখন আর তাঁর অভিভাবক সরাসরি আল্লাহ, মাঝখানে ভুল হলে আর কেউ শুধরে দিবেনা, সরাসরি আল্লাহই হাত দিবেন, উমর তখন খুব ভয়ে থাকতেন।

খাদীজা-রাসুল-আয়েশাঃ ত্রিভুজ ভালোবাসা

খাদীজা-আল্লাহর রাসূল-আয়েশা (রাঃ)র এই ত্রিভুজ ভালোবাসার সম্পর্ক থেকে আমি কখনো বের হতে পারিনা। আল্লাহর রাসুল ও খাদীজা (আঃ)র সম্পর্কের প্রতিবিম্ব যেন রাসূল (সাঃ) ও আয়েশা (রাঃ)র সম্পর্ক,ইংরেজিতে যাকে বলে mirror image বা বিপ্রতীপ পার্শ্বপ্রতিবিম্ব

প্রথম সম্পর্কে খাদীজা (রাঃ) ছিলেন বয়সে বড় আর রাসূল ছোট, খাদীজার ভূমিকা এখানে মূলত রাসূলের সবকিছুর প্রতি অভিভাবক গোছের, এই অভিভাবকত্ব সবকিছুর, আর্থিক, পারিবারিক,মানসিক, দৈহিক কিংবা ধর্মীয় দিক আর তা জারি ছিলো বিয়ের সময় থেকে খাদীজার মৃত্যু পর্যন্ত।

রাসূল প্রথম যখন ওহী পান তখন তাঁর আবার এর বিপরীত হলো আয়েশার বেলায়, খাদীজার রাসূল এবার আয়েশার বড়,আয়েশা ছোট, আয়েশার অভিভাবক। আয়েশা নবীর বাড়িতে এসেছিলেনই খেলনা নিয়ে, আয়েশা (রাঃ)র পুতুল তাঁর বান্ধবী নিয়ে গেলে রাসূল যেয়ে দৌড়ে নিয়ে আসেন, তাঁর সাথে খেলেন যাতে আয়েশা খুশী হন যেভাবে বাড়ির অভিভাবকেরা বাচ্চাদের খেলা দেখে খুশী হয়।

রাসূলের এখন আর কারো সমর্থন লাগে বরং তিনিই এক রাষ্ট্রের অভিভাবক, খাদীজা বিয়োগের মাত্র দুই বছরেই যেন তিনি ভিন্ন এক মানুষে পরিনত হয়েছেন। ওহী নাযিলের সময় রাসূলের বয়স ছিলো চল্লিশ, দুনিয়ার হিসেবে যথেষ্ট বয়স, উনি দুনিয়ায় আর বেঁচেই চিলেন তেইশ বছর কিন্তু রাসূলকে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আমরা ওই চল্লিশ বছরেই প্রথম দেখি আর দেখি এক পরিনত পুরুষের প্রতি খাদীজার অব্যাহত সমর্থন।

বয়স চল্লিশেও, বিয়ের সময় খাদীজা (রাঃ)সুন্দরী ছিলেন, না বয়সোচিত সুন্দর না, আবারো বিয়ে করার মতই সুন্দর। এর একটা অর্থ হয় উনাকে উনার বয়সের চেয়ে বেশ ছোট দেখাতো। বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর সময় তিনি তাঁর সৌন্দর্য্যের ব্যাপারে আত্নবিশ্বাসী ছিলেন, একটা বিষয়ই যা তাঁকে খোঁচাচ্ছিলো তা তাঁর বয়স।সৌন্দর্য,সম্পদ নিয়ে আত্নবিশ্বাসী খাদীজা বান্ধবী নাফিসার সাথে বলার সময়ও এই বয়স নিয়ে তিনি ভেবে বলছিলেন, ‘কিন্তু তিনি কি রাজী হবেন?’

আবার আয়েশার সাথে বিয়ের সময় রাসূলের বয়স ছিলো বায়ান্ন কিন্তু উনাকে দেখতে পঁচিশ বা তার আশেপাশের দেখাতো এবং যথারীতি সুদর্শন।রাসূল তাঁর মৃত্যুর সময়ও দেখতে বয়স্ক হননি, তাই আয়েশা (রা) সাথে তাঁর যে বিরাট বয়সের পার্থক্য ছিলো, তা বাহ্যিকভাবে ১৫/১৬র বেশী দেখাতো না আর খাদীজার সাথে রাসূলের বিয়ের বয়সের পার্থক্যও ঠিক ১৫।

রাসূলের সমস্ত স্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র এই দুজনের সামনেই জিবরাঈল (আঃ) অনায়েসে আসা-যাওয়া করতেন, কিন্তু অন্যদের বেলায় এড়িয়ে চলতেন।

খাদীজা স্বজ্ঞানে,স্বেচ্ছায় আল্লাহর রাসূলকে বেছে নিয়েছিলেন আর আয়েশা রাসূলের স্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র যিনি বিয়ের সময় জানতেনই না আসলে হচ্ছেটা কী।

দুই সম্পর্কের প্রতিবিম্ব আবার সবসময় সুষম ছিলো না, মাঝে মাঝে যেন ওপর প্রান্তে সবটুকু আছে এই প্রান্তে নেই।

খাদীজা রাসূলের একমাত্র স্ত্রী যার আগে দুবার বিয়ে হয়েছিলো, সন্তানসহ আর রাসুল ছিলেন কুমার।বিপরীতে আয়েশা রাসুলের একমাত্র স্ত্রী যিনি ছিলেন কুমারী আর রাসুল বিবাহিত, খাদীজার সন্তানের পিতা।

খাদীজার সাথে বিবাহিত অবস্থায় রাসুলের জীবনে খাদীজা ছিলেন একমাত্র নারী আর আয়েশার জীবনে রাসূলই একমাত্র পুরুষ।খাদীজার মত আয়েশাও রাসুলকে এককভাবে পেতে চাইতেন, তিনি মৃত খাদীজার নাম পর্যন্ত শুনতে চাইতেন না, কিন্তু তাঁর সময়ে রাসুলের ঘর স্ত্রীতে পরিপূর্ণ ছিলো।

খাদীজা রাসূলের পাঁচ পাঁচটি সন্তানের মা বিপরীতে আয়েশা একেবারেই সন্তানহীন।

খাদীজা ও আয়েশা দুজনই শিক্ষিতা।

নবীজী আল্লাহর গূঢ় ইচ্ছায় লিখতে, পড়তে জানতেন না, কিন্তু তাঁর দুই স্ত্রীই ছিলো শিক্ষিত, জ্ঞানী, উপস্থিত বিচার-বুদ্ধি সম্পন্ন ও প্রবল ব্যক্তিত্ব্যের অধিকারী। প্রথমজন ব্যবসায়ী, দ্বিতীয়জন মুহাদ্দিস, শিক্ষিকা।বিয়ের পর রাসুল গড়পারতা স্বামীদের মত তাঁদের ব্যবসায়ে বাঁধা দিয়েছেন বা পড়াশোনায়, এমন কোন বর্ণণা নেই। পারস্পারিক সহযোগীতা ও সহমর্মিতায় এই দুই ভিন্ন দাম্পত্য ছিলো আদর্শ।

স্ত্রীদের মধ্যে ব্যক্তিত্বে শুধু খাদীজা (রাঃ)ই তাঁর প্রতিদ্বন্দী এবং রাসূলের ভালোবাসা প্রাপ্তিতেও।পার্থক্য হলো খাদীজার সময়ে খাদীজা ছিলেন রাসূলের একমাত্র রানী আর আয়েশা (রাঃ) ছিলেন বাকী নয় স্ত্রীর মধ্যে রানী,দুজনই দুই ভিন্ন সময়ে রাসূলের স্ত্রী হিসেবে সর্বোচ্চ ভালোবাসা আদায় করেছেন। স্ত্রীদের মধ্যে রাসুল সবচেয়ে বেশী প্রশংসা করতেন খাদীজা, তারপরই আয়েশার।

রাসূল (সাঃ)র আরো সুন্দরী স্ত্রী ছিলেন, বিশেষ করে সাফিয়াহ (রাঃ) কিংবা কিবতী দাসী মরিয়ম, কিন্তু রাসূল সবচেয়ে সৌন্দর্যের প্রশংসা করতেন আয়েশার (রাঃ)।

বাকী জীবিত স্ত্রীদের মাঝখানে তাঁর এই রানীসুলভ অবস্থান তিনি রাসূলের মৃত্যুর পরও বজায় রেখেছিলেন যথারীতি তাঁর সাহস, যোগ্যতা ও প্রবল ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে।

রাসূলের বাকী স্ত্রীদের কথা যেন রাসূলের মৃত্যুর সাথেই একটু ঝাপসা হয়ে আসে কিন্তু আয়েশা (রাঃ) ছিলেন ব্যতিক্রম। মুসলিম রাষ্ট্রে (খিলাফাহ অর্থে) নারীদের খলীফা হওয়া যায়না বোধকরি এই একটা বিষয়ই তাঁকে শাসক হতে বিরত রেখেছিলো নয়তো তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হবার সমস্ত যোগ্যতাই রাখতেন এবং তিনি এতে কোন ছাড় দিতেন বলে মনে হয়না যেমন বিয়ের আগে আত্নীয়দের পুনঃ পুনঃ তাগাদার পরও খাদীজা তাঁর ব্যবসায়ে কোন ছাড় দেননি।এই দুই নারীই বৈধব্যে নিজেরদের মতই ব্যস্ত থাকতেন।

মক্কা নগরী ছেড়ে খাদীজা দূর পাহাড়ে নিজে চড়ে হেরা গুহায় নবীজীকে খাবার পৌছে দিতেন। তখন তাঁর অনেক বয়স, তবু বাচ্চা জন্ম দেয়া, ব্যবসায়-সংসার সামলিয়ে তরতর করে পাহাড়ে চড়ে যেতেন। আয়েশা মদীনা ছেড়ে দুই পুরুষ সাহাবী তালহা ও যুবায়েরের সাথে সমান নেতৃত্ব দিয়ে আজকের ইরাকের বসরায় যুদ্ধ্বে জড়িয়েছেন।তাঁর উটের নামেই এই যুদ্ধের নামেই এই যুদ্ধের নাম উটের যুদ্ধ। তিনি নিজে তখন চল্লিশোর্ধ্ব।

খাদীজা মারা গিয়েছেন রাসূলের হাতের তালুতে অন্যদিকে রাসুল মারা গিয়েছেন আয়েশার বুকে, উল্টো।

রাসুল নিয়মিত খাদীজার কবর জিয়ারত করতেন, আর মৃত্যুর সময় আয়েশার ঘর বেছে নেয়ায় তাঁর ঘরই হয়েছে আজ উম্মতের জন্য রাসুলের কবর জিয়ারতের চিরস্থায়ী স্থান।

মেয়েদের জন্য কোথায় নামায পড়া উত্তমঃ মসজিদে না ঘরের কোনে

মেয়েদের নামাজ কোথায় পড়া উত্তম এই ব্যাপারে সরাসরি রাসুলের (সাঃ) কাছ থেকে দুটো হাদিস রয়েছে,

প্রথমটি,

” তোমরা আল্লাহর বান্দীদেরকে মসজিদে আসতে বাঁধা দিয়োনা। যখন তোমাদের মধ্যে কারোর স্ত্রী মসজিদে যাবার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করে, তার সেই অনুমতি যেন ফিরিয়ে দেয়া না হয়’

(বুখারি ও মুসলিম)

এবং দ্বিতীয় হাদিসটি হলো,

হযরত উম্মে হুমাইদ আস-সায়িদী রাযিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, একবার তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে আরয করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনার পিছনে নামায আদায় করা উত্তম মনে করছি’।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন-

আমি ভালো করেই জানি, তুমি আমার পিছনে নামায আদায় করা উত্তম মনে করছো। কিন্তু তোমার জন্য তোমার একান্ত রুমে নামায আদায় করা অন্য রুমে আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর তোমার ঘরের কোনো রুমে নামায আদায় করা বাড়িতে (সামনের রুমে) আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর তোমারবাড়িতে নামায আদায় করা এলাকার মসজিদে আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর তোমার এলাকার মসজিদে নামায আদায় করা আমার পিছনে (মদিনা শরীফে) নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম।

বর্ণনাকারী বলেন, এরপর ঐ সাহাবিয়া মহিলার নির্দেশে তার ঘরের একেবারে ভেতরে অন্ধকার কুঠরিতে নামাযের জন্য জায়গা বানানো হয়। আর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সেখানেই নামায আদায় করতে থাকেন। (মুসনাদে আহমাদ)

এক নজরে দুটো হাদিসে চোখ বুলিয়ে নিলে মনে হতে বাধ্য যে রাসূল (সাঃ) আপাত পরস্পর সাংঘর্ষিক দুটো কথা বলেছেন। এমন মনে হওয়াটা সম্পূর্ন স্বাভাবিক ,মূলত এভাবেই, হাদিসগুলো আমাদের সামনে পেশ করা হয়।

এবার আমরা এই হাদিস দুটো একটু বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে দেখি। প্রথম হাদিসটিতে সরাসরি মেয়েদের মসজিদে আসার পথে বাঁধা দেবার নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।প্রথম হাদিসটি সব মেয়েদের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য, এখানে কোন বিশেষ নাম উল্লেখ করা হয়নি।

হাদিসটির শব্দচয়নের দিকে খেয়াল করি, ”তোমরা (সব মুসলনমানকে বোঝাচ্ছে) আল্লাহর বান্দীদেরকে ( সব মুসলিমাহকে ) মসজিদে আসতে বাঁধা দিয়োনা। যখন তোমাদের মধ্যে কারোর স্ত্রী (তাবৎ মুসলমান পুরুষ) মসজিদে যাবার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করে, তার সেই অনুমতি যেন ফিরিয়ে দেয়া না হয়’ । এই হাদিসে আরো বোঝা যায়, রাসুলের জীবদ্দশায়ও কেউ কেউ নারীদের মসজিদে আসা অপছন্দ করতো, বাঁধা দিতো, যেকারনে রাসুলকে এই বিশেষ উক্তিটি করতে হয়, স্পষ্টত এটি কোন আলোচনার অংশবিশেষ যার সামনের বক্তার অংশটি সচরাচর ব্যবহার করা হয়না।  

দ্বিতীয় হাদিসে একজন মহিলার স্পষ্ট নাম এসেছে, উম্মে হুমাইদ আস সায়িদাহ।  এই হাদিসটির শব্দচয়নের দিকে খেয়াল করি, ‘ তোমার জন্য তোমার একান্ত রুমে নামায আদায় করা অন্য রুমে আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর তোমার ঘরের কোনো রুমে নামায আদায় করা বাড়িতে (সামনের রুমে) আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর তোমার বাড়িতে নামায আদায় করা এলাকার মসজিদে আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর তোমার এলাকার মসজিদে নামায আদায় করা আমার পিছনে (মদিনা শরীফে) নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম।

হাদিসটি ভাষার ব্যবহার লক্ষ্য করুন। রাসুল ঠিক কতবার “তোমার” কথাটি উচ্চারণ করে হাদিসটিকে একজন নির্দিষ্ট মহিলার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রেখেছেন, সার্বজনীন করেননি। সুবাহানাল্লাহ,আমরা ভাবছি বা আমদের সামনে এভাবেই হাদিস পেশ করা হয় যেন আল্লাহর রাসুল মহিলাদের নামাজের ব্যাপারে সাংঘর্ষিক কথা বলছেন, কিন্তু তিনি বাক্যচয়নে স্পষ্টত পার্থক্য রেখে গেছেন, আমরাই দেখছিনা।

এখন কথা হলো, আল্লাহর রাসুল উম্মে হুমাইদকে এই কথা কেন বললেন!

আরো একবার হাদিসটি যদি পড়েন, তাহলে দেখবেন, হাদিসটি কেমন খাপছাড়া।উম্মে হুমাইদ এসে আল্লাহর রাসুলের কাছে মসজিদে নামাজ পড়ার আকুতি জানানোয়, আল্লাহ রাসুল তাকে প্রথম হাদিসের তুলনায় ভিন্ন কথা বললেন। এখানে আল্লাহর রাসুল আগে থেকেই জানেন, উম্মে হুমাইদ কী চায়, এবং আল্লাহর রাসুলের কথাটিও যেন আগে থেকে ঠিক করে রাখা। কিন্তু আল্লাহর রাসুল কিভাবে তাঁর ব্যাপারে আগে থেকেই জানতেন।

ঘটনার সেই অপ্রকাশিত অংশেই আছে, এই হাদিস বর্ণনার মূল কারন। রাসুল (সাঃ) উম্মে হুমাইদের সম্পর্কে জানার উৎস তাঁর স্বামী আবু হুমাইদ আস সায়িদি।

আবু হুমাইদা ছিলেন মদীনার আল খাযরাজ গোত্রের শাখা বনু সাদিয়ার লোক। বনু সাদিয়ার লোকেরা মূলত মদীনার সীমান্ত ছাড়িয়ে এলাকায় চাষ-বাস ও বসবাস করতো যা কিনা ছিলো মসজিদে নববী থেকে বেশ দূরে। বনু সাদিয়ে গোত্রের নিজস্ব মসজিদও ছিলো, যেই মসজিদে রাসুল একবার সালাতও আদায় করেন।খেয়াল করুন, হাদিসটিতে তাঁর এলাকার মসজিদের প্রসঙ্গও রাসুল এনেছেন।

‘…আর তোমার এলাকার মসজিদে নামায আদায় করা আমার পিছনে (মসজিদে নববী) নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম’

মসজিদে নববী

উম্মে হুমাইদ তাঁর গোত্রের কিছু মহিলাসহ প্রতিদিন নামায পড়তে এত দূর থেকে মসজিদে নববীতে আসতেন যা আবু হুমাইদের সংসার জীবনের জন্য অসুবিধাজনক হয়ে উঠে। তিনি এবং তাঁর স্ত্রীর মধ্যে এ নিয়ে কথা চালাচালি হয়। রাসুল (সাঃ) আবু হুমাইদের এই অসুবিধা সম্পর্কে জানতে পারেন। আবার উম্মে হুমাইদও তাঁর এই ব্যাপারে রাসুলের কাছে নালিশ জানান যে “ হে রাসুল, আমরা আপনার সাথে নামাজ পড়তে পছন্দ করি, কিন্তু আমাদের স্বামীরা আমাদের মসজিদে আসতে বাঁধা দেয়” (ইবনে মাজাহ;১২১৭) *

 ‘আমার মসজিদে এক রাকাত নামায অন্যত্র এক হাজার রাকাতের চেয়ে ভালো, শুধুমাত্র মক্কার পবিত্র মসজিদ ব্যতীত’

স্পষ্টত উম্মে হুমাইদ এই হাদিসের আমলের বরকতের জন্যই এতদূর থেকে মসজিদে নববীতে আসতেন এবং বরাবরের মতই এই হাদিসে নারী পুরুষ আলাদা করে উল্লেখ নেই। কিন্তু, এটাও সত্য যে সবার পক্ষে মদীনার নিকটবর্তী বাসিন্দা না হলে প্রতিনিয়ত মসজিদে নববীতে নামায পড়া অসম্ভব ও কষ্টসাধ্য।

এখানে রাসুল মূলত, একটি সাংসারিক বিবাদ মেটাতে চেয়েছেন, মসজিদে নববীতে নামযের কারনে কারো যেন দৈনন্দিন জীবন ব্যহত না হয় তাতে দৃষ্টি দিয়েছেন। উম্মে হুমাইদের জায়গায় তাঁর স্বামী আবু হুমাইদও যদি রোজ মদীনার বাহির থেকে নববীতে আসতেন, তবে তা তার জন্যও কঠিন হতো।

এবং একই সাথে মহিলাদেরকে এই পুন্যের সুসংবাদও দিয়েছেন, যদি নানা ব্যস্ততায়, অসুবিধায় কিংবা অনিচ্ছায়ও যদি নারীরা মসজিদে না এসে ঘরেই পড়তে চায়, তাতেও পুন্য অর্জনে ঘাটতি হবেনা বরং তার নামাজ সে যেখানেই আদায় করে নিক না কেন, সবই উত্তমই উত্তম। কিন্তু, এই হাদিসে পুরুষদের জন্য মসজিদে ফরজ নামাযের বিধান বহাল থাকলো এবং নারীর জন্য শিথিল হলো।

ঘরে নামায কী শুধু মহিলাদের জন্য উত্তম ? 

রাসুল এই হাদিস দিয়ে ঘরে নামাযকে শুধু মহিলাদের জন্য উত্তম করে ঘরকে শুধু মহিলাদের জন্য সংকুচিত (অনেকেই এই বিশেষ উদ্দ্যেশ্যেই হাদিসটি ব্যবহার করেন) এবং পুরুষদের জন্য মসজিদ এমন মোটাদাগে পার্থক্য করে দেননি। বরং, ঘরে নামায, পুরুষের ফরজ সালাত ব্যতীত, নারী পুরুষ উভয়ের জন্যই সর্বাবস্থায় উত্তম

# “একজন ব্যক্তির তার ঘরে সালাত  আমার মসজিদের (মসজিদে নববী) সালাতের চেয়ে উত্তম, ফরজ সালাত ব্যতীত। (আবু দাউদ)

# যায়েদ ইবনে সাবিত থেকে বর্নিত, রাসুল (সাঃ) বলেন, ‘আমি জানি তুমি আমার পিছনে নামাজ পড়তে কতটা আগ্রহী। হে লোক সকল, তোমরা তোমাদের ঘরে সালাত আদায় কর, কেননা ফরয নামায ব্যতীত মানুষের সর্বোত্তম নামায তার ঘরে। (বুখারী ও মুসলিম)

# ইবনে উমর থেকে বর্নিত, রাসুল (সাঃ) বলেন, ‘তোমাদের কিছু নামায তোমাদের ঘরে আদায় কর এবং তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিয়ে ফেলো না।'(বুখারী ও মুসলিম)

# কা’ব ইবনে উজরাহ থেকে বর্নিত, “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বনু আব্দুল আশহালের মসজিদে মাগরিবের নামায পড়লেন এবং যখন তিনি নামায শেষ করলেন তখন কিছু লোক উঠে দাঁড়ালো এবং নফল সালাত আদায় করল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ ‘তোমরা এই নামায তোমাদের ঘরে আদায় কর।’ (সুনানে নাসাঈ)

অন্ধকার কোন…   

রাসুলের এই হাদিসের পর উম্মে হুমাইদ তাঁর ঘরের একেবারের ভেতরের অন্ধকার কোন নিজের নামাযের জন্য বেছে নেন।

এটা একান্তই তাঁর নিজস্ব পছন্দ। পুরো হাদিসে আল্লাহর রাসুল একটিবারের জন্যও অন্ধকার, একেবারে ভেতরের কিছু উল্লেখ করেননি। অন্য কোন মহিলা সাহাবীদেরও এভাবে অন্ধকার স্থান নামাযের জন্য বেছে নিতে দেখা যায়নি, কেউ কেউ করে থাকতেও পারেন ,যার যার ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় যেমন রাসুলের স্ত্রীগণ নিয়মিত জামাতেই পড়তেন কিন্তু এ হাদিস দ্বারা কিছুতেই মহিলাদের জন্য মসজিদের চেয়ে বাড়ির অন্ধকার কক্ষই নামযের জন্য উত্তম তা সাব্যস্ত হয়না।

সুতরাং, দ্বিতীয় হাদিস অনুযায়ী মহিলারা নিজেদের, পরিবারের সুযোগ সুবিধামত কোথায় নামায পড়বে তা মহিলাদের ইচ্ছাধীন করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু, প্রথম হাদিসমতে ,তাদের মসজিদে আসতে বাঁধা দেবার উপরে সাধারণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আমরা যেন, উম্মে হুমাইদের হাদিসের তথ্যসূত্র ব্যবহার করে রাসুলের নারীদের মসজিদে আসতে বাঁধা না দেবার নিষেধাজ্ঞার হাদিসকে ম্লান না করে ফেলি।

আরও পড়ুন মহিলাদের মসজিদে নামায ও আয়েশা (রাঃ)র হাদীস

*জাসের আওদাহ, ‘রিক্লেইমিং দ্যা মস্ক’ 

কোরানে আহলুল বাইত বা বাড়ির লোকেরা

ইবনে আব্বাস থেকে বর্নিত, রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বিদায় হজ্বের সময় লোকেদের সম্বোধন করে বলেন,

‘হে লোকেরা, আমি তোমাদের জন্য দুটো বিষয় রেখে যাচ্ছি, যদি তোমরা এই দুটো বিষয় শক্ত করে আঁকড়ে রাখো তবে তোমরা বিপথগামী হবেনা, (আর তা হলো) আল কোরান ও আমার সুন্নাহ।  (আল হাকিম, বায়হাকী)

বিদায় হজ্বের ভাষনের পর নাযিল হয়,

“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার কৃপাকে পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের ধর্ম হিসেবে মনোনীত করলাম। (সূরা মায়েদাঃ৩)

এই বিষয়ক আরেকটি হাদিস হলো বিখ্যাত গাদিরে খুমের হাদিস;

‘তোমাদের জন্য দুটো ভারী বিষয়  রেখে যাচ্ছি। তাদের মধ্যে প্রথমটি আল কোরান; যাতে আছে আলো ও হেদায়াত। এবং (দ্বিতীয়টি) আমার পরিবার (আহলে বাইত), আমি তোমাদেরকে আমার পরিবারের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করতে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। তোমরা আল্লাহর রশি শক্ত করো এবং আলাদা হয়োনা।

(মুসলিম, বায়হাকী)

শিয়া মতে, সূরা মায়েদার ৩ নং আয়াত এই হাদিসের পরেই নাযিল হয়, শিয়ামতে ‘আহলে বাইত ও মাওলা’ শব্দদ্বয়ের দ্বারা আলী ও তাঁর পরিবারের রাসূল পরবর্তী খেলাফত নিশ্চিত হয় এবং শিয়ারা ১৮ই জিলহজ্জ ঈদুল গাদিরের দিন হিসেবে উদযাপন করে।

কথা হলো রাসূল দু জায়গায় দুই বক্তব্য কেন দিলেন!

দুই বক্তব্য নয়, তাঁর প্রথম বক্তব্যটি সমস্ত উম্মাহ ,দ্বীন ও স্বয়ং আল্লাহ আযযা ওয়াজালের সাথে জড়িত। কিন্তু, গাদিরে খুমের হাদিসটি একটি ঘটনাকেন্দ্রিক। বিদায় হজ্জ থেকে মদীনায় ফিরে আসার সময় রাসূলের হজ্জ কাফেলা গাদিরে খুমে স্থানে যাত্রাবিরতি করেন। এমন সময় কিছু সাহাবী রাসুল আলী (রাঃ)র এক দাসীর সাথে রাত্রিযাপন নিয়ে অসন্তোষ জ্ঞাপন করেন যা শুনে রাসূল (সাঃ) কষ্ট পান। তিনি বলেন, ‘তোমরা কেন আলীকে দেখতে পারোনা, মনে রেখো আমি যার মওলা, আলীও তার মওলা” “মান কুনতু মওলা ফাহাজা আলীউন মওলা”।  

শিয়ারা প্রথম হাদিসটি সহীহ হিসেবে মানেনা এবং এর সংশ্লিষ্ট আয়াতটিকে এই প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছে বলে স্বীকার করেনা।  এবং সুন্নাহের পরিবর্তে এই  আহলুল বাইতকেই কোরানের পরে স্থান দেয় এবং তাদের সমগ্র ধর্ম এই আহলুল বাইতকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়।

আহলুল বাইত কী

আহল অর্থ সদস্য আর বাইত মানে ঘর, অর্থাৎ ঘরের সদস্য। ইসলামী পরিভাষায় রাসুলাল্লাহর ঘরের সদস্যগণ আহলুল বাইত নামে পরিচিত। তাদের আহলুল বাইতের সদস্য রাসুল (সাঃ), ফাতিমা, আলী ইবনে তালিব, তাঁদের দুই পুত্র হাসান এবং হোসেইন, যাদেরকে সম্মিলিতভাবে আহল আল কিসা বা চাদরের লোক বলা হয় (পাক পাঞ্জতন) এবং হোসাইনের বংশ থেকে আসা নয়জন যথাক্রমে জয়নুল আবেদীন, আল বাকীর, আল সাদীক, আল কাদিম, আল রিদা, আল তক্বী, আল হাদী, আল আসকারি এবং আল মাহদী সহ মোট বারোজন ঈমাম।

মজার ব্যাপার হলো, শিয়া এবং তাঁদের ‘সুন্নী’ শাখা বেরেলভীরা রাসুলের স্ত্রীদের তাঁর বাড়ির লোক বলে স্বীকার করেনা, অথচ সাধারণত স্ত্রীরাই বাড়ির অন্যতম সদস্য। স্ত্রীদেরকে অন্তর্ভুক্ত না করার তাদের যুক্তি, স্ত্রীরা তালাকযোগ্য এবং বাড়ির সাথে তাদের সম্পর্ক স্বামীর জীবন-মৃত্যু ও তালাকের সাথে জড়িত। (যদিও রাসূলের কোন স্ত্রীরই তালাক হয়নি এবং রাসূলের মৃত্যুর পরও তাঁদের সাথে রাসূলের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে তাঁদের পুণঃ বিয়েও হয়নি, উনারা উম্মতের মা হিসেবেই রয়ে আছেন) আদি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রচলন হিসেবে এই যুক্তি হিসেবে ঠিকই আছে কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক সমাজে মেয়েরা গুরুত্বপূর্ণ বিয়ের বিষয় এবং বিয়ের পরে জামাইয়ের ঘরই তার প্রধান ঘর বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু, এখানে দেখা যাচ্ছে, ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ (রাঃ) তাঁর বিয়ের পরও রাসূলের ঘরের অংশ বলেই বিবেচিত হচ্ছেন এবং তাঁর সাথে রাসূলের মেয়ের জামাই আলী ইবনে তালিব (রাঃ), যিনি একই সাথে রাসুলের চাচাতো ভাইও কিন্তু রাসুলের বাকী তিন কন্যা এবং জামাইয়েরা বাদ পরছেন।

মেয়ে জামাই  ঘরের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কিন্তু এই একই যুক্তি অনুযায়ী উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) রাসুলের দুই দুইজন কন্যার, রুকাইয়া এবং উম্মে কুলসুম, জামাই হিসেবে আহলে বাইত হবার বড় দাবীদার। কিন্তু, শিয়ামতে তিনি আহলে বাইত হিসেবে বাতিল এবং একজন ঘৃণিত ব্যক্তি (আল্লহই উত্তম বিচারক)। শিয়ামতে ফাতেমা (রাঃ) বাদে রাসুলের বাকী তিন কন্যা তাঁর ঔরসজাত নয় বরং খাদীজার (রাঃ) আগের স্বামীদ্বয়ের সন্তান। শিয়াপাঠ সংকীর্ণ, পরিবার কেন্দ্রিক, অনেকটা কূটচালি হিন্দী সিরিয়ালের মত। ইসলাম , ইসলামের বিরাট বিশাল ব্যপকতা এখানে একেবারেই গৌণ, মূখ্য পরিবার, কে কার সন্তান, কে কার জামাই, কে সম্পত্তির (পড়ুন ইসলামের) উত্তরাধিকার।

শিয়া মতে শুধু আলীই নন, রাসূলের চাচা আব্বাস ইবনে মুত্তালিব, জাফর ইবনে আবু তালিব (রাঃ) তাঁরাও রাসুলের আহলে বাইত বা ঘরের অংশ বলে বিবেচিত হন (তারা সুন্নী মতেও আহলে বাইত) কিন্তু রাসুলের স্ত্রীরা একেবারেই নন। আবার রাসুলের আরেক চাচা হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রাঃ)ও আহলে বাইতের অংশ নন, সম্ভবত উহুদ যুদ্ধের মর্মান্তিক মৃত্যুর কারনে তিনি রাসুল (সাঃ) মৃত্যু পরবর্তী খেলাফত নির্বাচনে আলীর (রাঃ) পক্ষ হয়ে প্রথম তিন খলিফার যথেষ্ট বিরোধীতা করতে পারেননি, তাই তাঁর এ অবদান রাখার ‘ব্যর্থতায়’ তিনি ও তাঁর সন্তান সন্ততিদের নাম খারিজ।

সবচেয়ে বড় ‘ব্যর্থতা’ সম্ভবত তিনি রাসূলের চাদরের নীচের লোক হতে পারেননি। কিন্তু, কে না জানে বদর ও উহুদের শহীদেরা যে কোন মানদন্ডে শ্রেষ্ঠ। বদরী সাহাবী হিসেবে আলী ও ফাতেমা (রা) ও শ্রেষ্ঠ, ফাতেমা (রাঃ) যুদ্ধাহতদের সেবিকা হিসেবে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত থাকতেন।

শিয়া মতে, আহলে বাইতের অন্য দাবীদারেরা সাধারণ মানুষ কিন্তু আলী ও তাঁর পুত্রদের জন্ম কাবা ঘরের অভ্যন্তরে, যদিও কাবাঘর কখনো আতুঁড়ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হত ইতিহাসে এমন ঘটনা পাওয়া যায়না। তবে, গায়েবী ঘটনার ইতিহাস লাগেনা,  তাই তাঁদের জন্ম গায়েবীভাবে কাবার ঘরের অভ্যন্তরে সংঘটিত হয়েছিলো।

শিয়া পাঠ থেকে, উম্মে সালামা (রাঃ) থেকে বর্নিত,

রাসুল (সাঃ) একবার তাঁর প্রিয়তম কন্যা ফাতেমাকে তাঁর স্বামী ও দুই পুত্র হাসান ও হোসাইনকে ডেকে আনতে বললেন। যখন তারা আসলো তিনি তাঁদের একটি চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন এবং তাঁদের হাতের উপর নিজের হাত দিয়ে বলেন, ‘হে আল্লাহ! এরা আমর আহল (পরিবার),তাই তুমি তাঁদের উপর রহমত বর্ষিত করো যেবনহাবে তুমি রহমত বর্ষিত করেছো ইবরাহীমের পরিবারের উপর। সকল প্রশংসা ও গৌরবের অধিকারী তুমি’ ।উম্মে সালামা আরো বললেন, তিনিও চাদরের একপ্রান্ত উঠিয়ে তাঁদের সাথে যোগ দিতে চাইলেন কিন্ত নবীজী তাঁর হাত থেকে তা নিয়ে নিলেন এবং বললেন ‘ তুমি ডান দিকে আছো’  (ডান বলতে উম্মে সালামাকে ইতিবাচক ইংগিত দেয়া হয়েছে, মানে চাদরের লোক না হলেও তিনি সঠিক পথেই আছেন)(তাবারানির বর্ননা, দূর আল মানসুর,ইমাম জালাল উদ্দীন সুয়ুতি) 

তো উম্মে সালামা থেকে বর্নিত এরকম একই ধরনের আরো দুই একটি হাদিস আছে।

তবে সুন্নি পাঠে, চাদরের লোকদের হাদিস মূলত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্নিত। শিয়ারা উম্মে সালামাকে এতটাই দেখতে পারে যে, সুন্নী মতে স্ত্রীদের মধ্যে শুধুমাত্র আয়েশার (রাঃ) ঘরে, তাঁর উপস্থিতিতেই কোরান নাযিল হলেও শিয়া পাঠে উম্মে সালামার ঘরে আয়াত নাযিল হতো তাও শুধু জীবরাঈলই (আঃ) না, একদম মীকাঈল (আঃ) ও আসতেন। মীকাঈল (আঃ) মূলত বৃষ্টি তথা রিযিক বন্টনের প্রধান ফেরেশতা এবং তাঁকে সচরাচর কখনোই কোন মানব সম্পর্কিত আদান-প্রদানে উপস্থিত থাকতে না দেখা গেলেও কোন এক বিশেষ কারনে তাঁকে উম্মে সালামার ঘরে উপস্থিত দেখানো হয়, যেমন চাদরের হাদিসের সময় উনি উম্মে সালামার ঘরেই ছিলেন।

তারা উম্মে সালামাকে যতটা দেখতে পারে ততটাই ঘৃণা করে আয়েশাকে, মনে রাখতে হবে তাদের সব পছন্দ ও অপছন্দ আহলে বাইতের ক্ষমতা কেন্দ্রিক।বিখ্যাত জঙ্গে জামাল যুদ্ধে আয়েশ (রাঃ) আলী (রাঃ)র বিরুদ্ধ্বে ঘটনাচক্রে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যা উম্মে সালামা পছন্দ করেননি এবং পত্র মারফত তাঁকে ফেরত আসতে বলেন। আয়েশা পরবর্তীতে তাঁর ভুল বুঝতে পারেন এবং অনুতপ্ত হন।তাই শিয়া পাঠে আয়েশা হয় উপেক্ষিত হন, নয়তো তাঁর বর্নিত হাদিসের বর্ণনা বদলে যায়।

ইবনে জারির থেকে বর্নিত যে সাফিয়্যাহ বিনতে সায়বাহ বলেন,

 ‘আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্নিত, আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এক সকালে এক কালো উটের পশমের ডোরাকাটা চাদর গায়ে দিয়ে বের হলেন। তখন আসলেন হাসান ইবনে তালিব, তখন তিনি তাঁকে চাদরের নীচে জড়িয়ে ধরলেন,এরপর আসলেন হাসান ইবনে তালিব, তিনা তাঁকেও চাদরের নীচে জড়িয়ে ধরলেন এরপর আসলেন ফাতেমা, তারপরে আলী এবং তিনি তাঁদের দুজনকেও চাদরের নীচে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন, (হে)আহলে বাইত! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূরে রাখতে এবং তোমাদেরকে সম্পুর্ন রুপে পুতঃপবিত্র রাখতে   (মুসলিম)

এই হাদিসের শেষ অংশটুকু সরাসরি কোরানের আয়াত।

“….. (হে)আহলে বাইত! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূরে রাখতে এবং তোমাদেরকে সম্পুর্ন রুপে পুতঃপবিত্র রাখতে”(সুরা আহজাবঃ৩৩)

শিয়াদের কাছে এই আয়াত পবিত্রতার আয়াত বলে পরিচিত যেমন,

আয়েশা থেকে বর্নিত,পবিত্রতার আয়াত ফাতিমা,আলি, হাসান এবং হোসেইনের পক্ষে অবতীর্ণ হয়। (ইয়ানাবী আল মাওয়াদ্দা, আল কান্দুজি, পৃষ্ঠা ৮৭)* শিয়া পাঠ।

এটি সত্যিকার অর্থেই কোরানের আহলে বাইতের আয়াত তবে মজার ব্যাপার হলো এই আহলে বায়াত আলী ইবনে তালিবের পরিবারের জন্য নয় বরং তারা যাদেরকে কিছুতেই আহলে বাইতের অংশ বলে স্বীকার করেনা নবীদের স্ত্রীদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে।

হে নবীপত্নীগণ!তোমরা কোন সাধারন নারীর মত নও,

যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তবে পরপুরুষের সাথে বাক্যালাপে এমনভাবে কোমল কন্ঠে কথা বলো না যাতে অন্তরে যার কুপ্রবৃত্তির রোগ রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয় আর তোমরা রীতি অনুসারে কথা বলবে

আর তোমরা নিজেদের ঘরে  (আল বাইত)অবস্থান করবে এবং আল্লাহ এবং প্রাচীন মূর্খতা যুগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেরাবে না

তোমরা নামায কায়েম করবে,যাকাত প্রদান করবে তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে

হে নবী পরিবার!  আল্লাহ তো তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে চান এবং তোমাদেরকে সর্বোতভাবে পবিত্র রাখতে চান (সূরা আল আহযাব, ৩২৩৩)

শিয়া তফসিরকারকগণের মতে, সূরা আহযাবের ৩২ নং আয়াতের সম্বোধনসূচক সর্বনামগুলো স্ত্রীবাচক, এটি নবীদের স্ত্রীদের জন্য হিসেবে ঠিক আছে কিন্তু ৩৩ নং আয়াতের সম্বোধন পুরুষবাচক, অতএব এটি চাদরের লোকদের জন্য যেহেতু এখানে পাঁচজন সদ্যস্যদের মধ্যে চারজনই পুরুষ। অতএব, এটি আহলে বাইতের আয়াত।

কিন্তু, পুরুষবাচক সম্বোধন রাসূলকে উদ্দ্যেশ্য করেও হতে পারে কারন নবীদের স্ত্রীদের ঘরের মূল ব্যাক্তিটি মানে রাসুল (সাঃ) নিজে একজন পুরুষ এবং স্ত্রীদের পবিত্রতা সম্মানের সাথে স্বামীর পবিত্রতা, সম্মান ওতপ্রোতভাবে জড়িত, কন্যা কন্যার স্বামীর চেয়ে যা বেশী। সূরা আহযাবের এই বিশেষ আয়াতগুলো কেউ তাফসির হিসেবে পাঠ করলে সুস্পষ্টভাবে এটিই পাওয়া যায় যে আয়াতগুলো মূলত জায়নাব বিনতে জাহশের সাথে রাসুলের বিয়ে পরবর্তী অপবাদের বিপরীতে রাসূলের ঘরের সম্মান্ পবিত্রতা বজায় রাখতে নাযিল হয়েছিলো, আর এটিতো খুবই সাধারণ বিষয় যে আমরা নারীপুরুষ দুই বুঝাতে পুরুষবাচক সম্বোধন ব্যবহার করেই থাকি। শুধুমাত্র পুরুষবাচক সম্বোধনেই এই আয়াত আলীর (রাঃ) আয়াত হয়ে যায়না।

কোরানে অবশ্য নবীদের পরিবার যেমন, ইবরাহী (আঃ) ও নুহ (আঃ)র পরিবার প্রসঙ্গেও আহলুল বাইত শব্দটি এসেছে, এটি কোরানের খুবই সাধারণ সম্বোধন।

এখন কথা হলো, এই আয়াত যদি রাসুলের স্ত্রীদের জন্যই হয় তবে কেন রাসূল (সাঃ) চাদরের ভেতরেই সূরা আহযাবের ৩৩ নং আয়াতটি পড়লেন। কোরানের প্রতিটি আয়াত নাযিলের পেছনে যেমন সুনির্দিষ্ট কারন, অর্থ থাকে ঠিক তেমনি আয়াতগুলো দোয়া হিসেবেও কাজ করে। যেমন, সূরা মরিয়মের যাকারিয়া (আঃ)র দোয়াটি।

তিনি বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার হাড়গুলো দুর্বল হয়ে গেছে, আর বার্ধক্যে আমার মাথা সাদা হয়ে গেছে, হে আমার প্রতিপালক! আপনাকে ডেকে আমি কখনো বিফল হইনি।

আমার পরে আমার স্বগোত্রীয়রা (কী করবে) সে সম্পর্কে আমি আশঙ্কাবোধ করছি, আর আমার স্ত্রী হল বন্ধ্যা, কাজেই তুমি তোমার তরফ থেকে আমাকে একজন উত্তরাধিকারী দান কর

যে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং উত্তরাধিকারী বে ইয়াকূবের বংশের এবং হে আমার রাব্ব! তাকে করুন সন্তোষভাজন।

এই আয়াতগুলো নাযিলের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারন এবং প্রতিটি শব্দ কিছু গভীর গুঢ় অর্থ বহন করে এবং একই সংগে এটি দোয়াও। এই আয়াত আওড়াতে এটি প্রয়োজনীয় নয় যে দোয়াকারীকে পুরুষই হতে হবে, নারীরাও পড়তে পারবেন। বার্ধক্যেই পৌছিতে হবে, আমাদের পক্ষে আর ইয়াকুব (আঃ) বংশধর হওয়া সম্ভব নয় তাই এই অংশটুকু বাদ দিতে হবে। কিছুই না, হুবুহু যাকারিয়াকেই (আঃ) পড়ুন, আল্লাহ নিয়ত দেখবেন। এটাই কোরানের উপর আমলের একটি সাধারণ তরিকা।

ঠিক তেমনি, সূরা আহযাবের আহলে বাইতের আয়াত রাসূলের স্ত্রীদের জন্য নাযিল হলেও এটি যেকোন ঘরের লোকদের নিরাপত্তা চেয়েও আমল করা যাবে, রাসূল এই হিসেবেও করতে পারেন এবং সুন্নী মোতাবেক আলীর (রাঃ)পরিবারতো আহলে বাইতের বাহিরে নয়, অতি অবশ্যই পড়া যায়। কিন্তু, রাসুল এই আয়াত দিয়ে দোয়া করেছেন বলে তাতেও নবীর স্ত্রীদের আহলে বাইতের দাবী খারিজ হওয়ার কারন নেই।

আয়েশার (রাঃ) বর্নিত হাদিসটি সম্ভবত মুবাহালার সকালেরও হতে পারে।

রাসূল (সাঃ) নাজরানের খ্রিস্টানদের কাছে ইসলাম গ্রহনের বার্তা পৌছান, বার্তা মোতাবেক নাজরানের খ্রিস্টানেরা মদীনায় এসে রাসুলের সাথে প্রভু জেসাসের প্রভুত্ব খারিজ করে তাঁকে শুধু নবী এবং মুহাম্মদকে (সাঃ) আল্লাহর প্রেরিত রাসুল এই দুটি দাবীই মানতে অস্বীকৃত জানায়। রাসূলের সাথে তাদের প্রচুর তর্ক হচ্ছিলো যা আল্লাহ রব্বুল আলামীন পছন্দ করলেন না। নাযিল হলো মুবাহালার আয়াত।মুবাহালা’ অর্থ পরস্পরকে ধ্বংসের অভিশাপ দিয়ে আল্লাহর নিকট বিনীতভাবে প্রার্থনা করা

আপনার কাছে (হযরত ঈসা বা তৌহীদ) সংক্রান্ত জ্ঞান আসার পর যে কেউ আপনার সাথে বিতর্ক করে এবং (সত্য মেনে নিতে চায় না), হে নবী, তাকে বলে দিন: এসো, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্র সন্তানদেরকে এবং তোমাদের পুত্র সন্তানদেরকে, আমাদের নারীদেরকে এবং তোমাদের নারীদেরকে, আমাদের নিজেদেরকে এবং তোমাদের নিজেদেরকে, এরপর আমরা (মহান আল্লাহর কাছে) বিনীতভাবে প্রার্থনা করি এবং মিথ্যাবাদীদের ওপর অভিশাপ (লানত) দেই (আলে ইমরান: ৬১)

স্ত্রীদের বদলে রাসুল সবচেয়ে নিজের প্রিয় কন্যা ফাতেমা এবং তাঁর পরিবারকে নিয়ে মুবাহালার জন্য বেছে নেন এবং যেমন রাসুল, তেমন তাঁর পরিবার! রাসূল বলেছেন, আর পুরো পরিবার মুবাহালার সম্মুখীন হতে রওয়ানা দিয়ে দিলেন, এ যেন ইবরাহীমের (আঃ) ডাকে ইসমাইলের (আঃ) কোরবানীতে রাজি হবার ঘটনার পুনরাবৃত্তি।

মুবাহালার পথে বের হবার আগে রাসুল তাঁদেরকে নিজের চাদরের নীচে নিয়ে নেন এবং সূরা আহযাবের আয়াতটি পড়ে দোয়া করেন। 

মুবাহালা নির্দিষ্ট দিনে সকালে রাসুলের কোলে হোসেইন, হাত ধরে হেঁটে হাসান এবং পেছনে আলী ও ফাতেমা (রাঃ) নিয়ে উপস্থিত হন। খ্রিস্টান হলেও নাজরানের প্রতিনিধিরা ইশ্বরে বিশ্বাস করেন,  নিজের আপনজনদেরকে  মহান আল্লাহর আসমানী শক্তি ও গজবের মুখোমুখি দাঁড় করানোর মত রাসূলের দৃঢ় আত্নবিশ্বাস দেখে তারা তারা দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পরে এবং নিজেরা  পরামর্শ করে মুবাহালা করার পথ ত্যাগ করে এবং রাসুলের সাথে আপোসে আসে । কিন্তু তারা মুসলমানও হতে চায়নি শুধু আনুগত্য স্বীকার করে  আর রাসুল (সাঃ) তাদের আনুগত্যের বদলে রসূল  তাদের উপর জিযিয়া-কর ধার্য করেন (সীরাত ইবনে হিশাম)

প্রতিবছর ২৪ই জিলহজ্জ শিয়ারা ঈদ আল মুবাহালা পালন করে। এই ঘটনা অবশ্যই আলী ও তাঁর পরিবারে আহলুল বাইত হবার নির্দেশ করে কিন্তু এতেও রাসূলের স্ত্রীদের আহলুল বাইত হওয়া খারিজ হয়না।

নবীজী নানা কারনেই স্ত্রীদের মুবাহালায় না নিয়ে থাকতে পারেন। মুবাহালা দেখতে উন্মুক্ত ময়দানে  প্রচুর লোকের ভিড় থাকার কথা, নাজরানের অপরিচত ৬০/৭০ জন খ্রিস্টান প্রতিনিধির সামনে এতজন স্ত্রী নিয়ে আসাও সমস্যাজনক, যেখানে স্বয়ং কোরানে রাসূলের স্ত্রীদের ঘরে থাকার নির্দেশ ছিলো। এবার কোন এক বা কয়েকজনকে বেছে নিলে স্ত্রীদের মধ্যে তারঁ বা তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বজনিত সমস্যার ব্যাপার ছিলো আর সবার আসার দরকারটাই বা কী যেখানে প্রতিনিধিত্বশীল কয়েকজন হলেই কাজ সমাধা হয় আর এক্ষেত্রে আলীর পরিবার কোরানের শর্তের সাথে দারুন মিলে যায়।  

এ বিষয়ে যাইদ ইবনে আরকামকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, মহানবীর আহলুল বাইত হচ্ছেন তার স্ত্রীরা। তবে তাঁর আহলুল বাইত হচ্ছেন তারা যাদের ওপর তাঁর পরে সদকা হারাম হয়েছে।তখন যাইদকে জিজ্ঞেস করা হল: তারা কারা ? তিনি (যাইদ) বললেন: তারা আল আলী তথা আলীর বংশধর , আল আকীল তথা আকীলের বংশধর, আল জাফার বা জাফারের বংশধর এবং আল আব্বাস বা আব্বাসের বংশধর (রাসূল সাঃর পিতার দিকের আত্নীয়) (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬২৫১, পৃ: ৯১০)

শিয়ামতে ইসলাম ধর্ম শুধুমাত্র পাঁচজন আহলুল বাইতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ও সংকীর্ণ হয়ে পরে যেখানে সুন্নি মতবাদে,  আহলুল বাইতের আকার বেশ বড়, যেখানে রাসূল, রাসূলের প্রত্যেক স্ত্রী,  আহল আল কিসার সদস্যরা এবং বনু হাশিম ও বনু আব্দুল মুত্তালিবের গোত্রও অন্তর্ভুক্ত এবং কোরানের পরে আহলে বাইতকে স্থান না দিয়ে সুন্নাহকে স্থান দেয়ায় নবীর সকল কাজ, অনুমোদন, কথা, তাঁর সকল আত্নীয় এবং সাহাবীরাও অন্তর্ভূক্ত হয়ে ইসলাম এক ব্যাপক, গণতান্ত্রিক ও সার্বজনীন রুপ পায়।