কানিজ ফাতেমা
পন্য বা সেবা ব্যবহার বর্জনের মাধ্যমে ইসরাঈলের দখল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পণ্যসমূহ নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ থাকেন, এদের মধ্যে অনেকেই আবার এ নিয়ে ঠাট্টায় মেতে উঠেন। আসলে ইসরাঈলী পণ্য বলতে যেসব পণ্য সামনে আনা হয় সেসব আসলেই কতটা ইসরাঈলের এবং এসব বর্জনে আসলেই ইসরাঈলের কিছু যায় আসে কী?
বিষয়টি বুঝতে ইসরাঈল রাষ্ট্র কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে হবে।ইসরাঈল স্বাভাবিকভাবে সেই ভূখন্ডের মানুষ দ্বারা গঠিত কোন রাষ্ট্র নয় বরং ওই ভূখণ্ডের আদি অধিবাসীদের উচ্ছেদ করে বাহির থেকে জাহাজ বোঝাই লোক এনে পশ্চিমের সর্বাত্নক সমর্থনে কৃত্রিমভাবে প্রতিষ্ঠিত; এই অব্যাহত পশ্চিমা সমর্থন কূটনৈতিক,রাজনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক।
অর্থনৈতিক সমর্থন দু ভাবে করা হয়; ১। সরাসরি অনুদান প্রদানের মাধ্যমে, যেমন প্রতিবছর আমেরিকা ইসরাইলকে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাদে শুধু আর্থিকভাবে ৩.৮ বিলিয়ন সাহায্য দিয়ে থাকে।
২।ইসরাইলে বিনিয়োগ ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে ইসরাঈলকে স্বাবলম্বী করার মাধ্যমে।
ব্যবসায়ের নামে দখলদার ভূমিতে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানের প্রতিটিই একেকজন দখলদার এবং তাদের পণ্যসমূহ বর্জনের জন্য পরিচালিত হয় BDS Movement (Boycott,Divestment & Sanctions)।এই আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা বর্তমানে ইসরায়েলের কারাগারে বন্দী। বর্তমান বাস্তবতায় ইসরায়েলের সাথে কম বেশী ব্যবসায় সবাই করে, কিন্তু বিডিএস মুভমেন্টে সচরাচর উচ্চারিত পণ্যগুলো সরাসরি ইজরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিষ্ঠা করতেই সেখানে আছে এবং তাদের টিকে থাকতে বড়ধরনের সহযোগীতা করেছে বা করে যাচ্ছে। ইসরাঈলে এসব ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের অবদান এতটাই বেশী যে এই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙ্গে পরলে ইসরাইলও ভেঙ্গে পরবে ।
HP(এইচপি)/Hewlett-Packard Israel:

১৯২২ সালে দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখন্ডে আমেরিকান-ইহুদীদের জন্য গড়ে তোলা হয় রা’আনানা শহর আর এই শহরে ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় HPর সদর। দপ্তর বাকী দুনিয়ায় তারা মূলত হার্ডও্যায়ার নির্মান প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হলেও HP Israel প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দ্যশ্য ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সকে নিরাপত্তা ও সমরাস্ত্র বিষয়ে উন্নত প্রযুক্তি ও সেবা দিয়ে সহযোগীতা করে যাওয়া।
ইসরায়েল নৌ বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও যান্ত্রিক অবকাঠামো Hpর গড়ে দেয়া যে নৌ বাহিনী ২০০৭ থেকে সমুদ্রপথে আসা গাযার জন্য সমস্ত ত্রাণ ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য নিষ্ঠুরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।২০১০ সালে,এই খুনে নৌ বাহিনী গাযার জন্য সাহায্য সহায়তা নিয়ে আসা এক বহরের নয় জনকে গুলি করে হত্যা করে। ইসরায়েল নৌবাহিনীর জন্য গড়ে দেয়া HP এর একই মডেল পরবর্তীতে ইসরায়েলের বাকী বাহিনীগুলোতেও প্রয়োগ করা হয়।
২০০৯ সালে ইসরায়েল আর্মির সমস্ত কম্পিউটার সম্পর্কিত যন্ত্রাংশের যোগান দেয় HP Global.
ইসরায়েলের টিকে থাকার বা তাকে সুরক্ষা দেবার অন্যতম নিয়ামক হলো Basel Biometric System,এক বিশেষ জৈবিক সনাক্তকরন পদ্ধতি যাতে নানা কাজের খোঁজে ও প্রয়োজনে অধিকৃত ইসরায়েলে প্রবেশ করতে চাওয়া ফিলিস্তিনিদের আংগুলের ছাপ ও চোখের মনির সাহায্যে সনাক্ত করে সম্পূর্ণ রেকর্ড ইসরায়েলের ডাটাবেসে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। Baselই সর্বপ্রথম সাফল্যের সাথে ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজেদের ভূখন্ডে ইসরায়েলের সম্পূর্ণ ইচ্ছাধীন ও নিয়িন্ত্রণে থাকা এক অনাহূত হিসেবে চিহ্নিত করে ও ফিলিস্তিনিদের যেকোন প্রতিরোধের বিরুদ্ধে ইসরায়েলকে পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। পুরো ইসরায়েল এইরকম শত শত বাসেল বায়োমেট্রিক চেকপয়েন্ট দিয়ে সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত। কঠোর নজরদারীর মাধ্যমে চিকিৎসা ও ছোট খাটো কাজের প্রয়োজনে ফিলিস্তিনিরা অধিকৃত অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারে বটে তবে তা ভীষণ হয়রানিমূলক ও অপমানজনক।ইসরায়েলে এই পদ্ধতির তুমুল সাফল্যের পর সারা পৃথিবীতেই বায়োমেট্রিক পদ্ধতি এখন তুমুল জনপ্রিয় যদিও এর প্রথম গিনিপিগ ফিলিস্তিনিরা।

Basel Biometric System এর মালিকানা ইসরায়েলের মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্সের,অর্থায়ন আমেরিকার এবং এর উন্নয়ন ,নিরাপত্তা ফাঁড়িগুলোয় এর প্রতিস্থাপন,পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পালন করে HP Israel।পরবর্তীতে বিডিএস মুভমেন্ট জোরদার হওয়ায় এইসব তথ্য গোপন করা হয় কিন্তু HP Israel ২০১৭ এর পর এখন শুধু ইসরায়েলে কম্পিউটার যন্ত্রাংশ বিক্রি করে এমন ভাবারও কোন কারন নেই যখন এই চেকপয়েন্টগুলো থেকে HP Israel এর আয়ের পরিমান ছিলো শতকোটি। আজকাল আমি যখনই আমার বাসায় বা অন্য কোথাও এইচপির পণ্য দেখি স্রেফ ঘৃণা হয়।
বাংলাদেশে এইচপির যে পণ্যগুলো আসে তা সরাসরি আমেরিকা বা ইসরায়েলের সাথে সংযুক্ত নয় বরং চীন থেকে আমদানীকৃত।কিন্তু, এমন দূরবর্তী বয়কটের একটা ফলও মূল সদরদপ্তরগুলোতে পৌছে এবং তাদের নিট আয়ে প্রভাব ফেলে এবং যারা পশ্চিমে থাকেন তাদের এসব পণ্য বর্জন সরাসরি তাদের ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্থ করে।
বাংলাদেশে এইচপির পণ্যের সাথে পাল্লা দিয়ে বিক্রি হয় হয় ডেলের (Dell) পণ্য।ইহুদীমাত্রই জায়নাবাদী এমন একটা ধারনা অনেকের আছে এবং ডেল ইহুদী মালিকনাধীন। ইজরায়েলে বিনিয়োগের পাশাপাশি ২০১৪ সালে ডেল ১.৮ মিলিয়ন ডলার ফ্রেন্ডস অব ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সে অনুদান হিসেবে প্রদান করে। কিন্তু ইহুদী মালিকানাধীন হবার পরেও এই কোম্পানীর ইসরায়েল সেবা এইচপির আগ্রাসী ব্যবসায়েরর তুলনায় সামান্য মনে হয়,হয়তো এমন হতে পারে এইচপির যে কারিগরি সক্ষমতা ছিলো ডেলের তা ছিলোনা । তবে বিডিএস মুভমেন্টের পর ডেল ইসরায়েলের সাথে ব্যবসায় করার ব্যাপারে আগের চেয়ে বেশী সতর্কভাবে পদক্ষেপ নেয়। ইজরায়েলে ডেলের চেয়েও বেশী বিনিয়োগ আছে লেনেভোর (Lenovo)।
ইন্টেলঃ HPর মত আরেক আগ্রাসী ইসরায়েল পৃষ্ঠপোষক হলো আমেরিকান টেক জায়ান্ট ইন্টেল। ইসরায়েলের অর্থনীতিতে ইন্টেলের অবস্থান ফিনল্যান্ডের নোকিয়ার সমতুল্য।অন্যান্য টেক জায়ান্টরা যেখানে ইসরায়েলে শুধুমাত্র গবেষনাগার খুলে যেমন এপল,স্যামসাং; ইন্টেল সেখানে চারটি গবেষনা কেন্দ্রের পাশাপাশি ইসরায়েলেই তাদের প্রোডাক্ট তৈরী করে, এইমুহূর্তে যে কম্পিউটারে আপনি লেখাটি পড়ছেন এবং মাইক্রোপ্রসেসর যদি ইন্টেলের হয় তবে ৮০ শতাংশ সম্ভাবনা যে সেটি ইসরায়েলের কিরাইয়াট গাট বা জেরুসালেমের কারখানায় তৈরী।ইসরায়েল থেকে রপ্তানীকৃত মোট পন্যের ১৪% বা তারও বেশী ইন্টেলের। ইসরায়েলের দূর্বল প্রতিষ্ঠাণগূলো কিনে নেয় অর্থাৎ ইসরায়েল থেকে আয় করা অর্থ ইসরায়েলেই বিনিয়োগ করে, অসংখ্য উদ্যোক্তার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, জ্ঞান-বিজ্ঞান,গবেষণার প্রতি ইজরায়েলের অনুরাগ, যেমন বিশ্বে মাথাপিছু প্রতি গবেষণায় বিশ্বে ইজরায়েল এক নম্বরে বা তাদের মেধা নিয়ে যা বাজারে চালু আছে তাতে ইজরায়েলের অবদান অতি সামান্যই, এর ৯০ শতাংশ বা তারও বেশী পশ্চিমাদের গড়ে দেয়া।

ইন্টেলে নেতানিয়াহু
প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে ২০১৭ পর্যন্ত, মোট ১২ বছরে ইসরায়েলে ইন্টেলের বিনিয়োগ ছিলো প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের, ২০১৯ সালে বিনিয়োগ করা হয় ৫ বিলিয়ন দুই ফিলিস্তিনি গ্রাম ফালুজা এবং ইরাক-আল-মানসিয়া দখল করে গড়ে তোলা শহর কিরইয়াট গাটে তাদের প্ল্যান্ট বর্ধিতকরন প্রকল্পে।

২০২১ ইন্টেল আরো ৬০০ মিলিয়ন ব্যয় করার ঘোষনা দেয় মেগা চিপ ডিজাইন গবেষোণায় যাতে কম্পিউটারকে আরো উন্নত ও হালকা করা যায় ও ১০ বিলিয়ন ডলার কিরইয়াট ঘাট সেমিকন্ডাক্ট্রর প্ল্যান্টে; এতে কর্মসংস্থান হবে আরো ৬০০০ হাজার ইসরায়ীলীর। বর্তমানে ইন্টেলে কর্মরত ইসরাঈলীর সংখ্যা ১২,০০০, চুক্তিভিত্তিক ও সাপ্লাইয়ার মিলে যার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় চল্লিশ হাজারে।
ইন্টেল তাদের বিনিয়োগ শুধু ইন্টেলের পেছনেই করেনা,২০২০ সালে এটি ১৫.৩ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেয় জেরুসালেমে অবস্থিত ড্রাইভারবিহীন স্বয়ংক্রিয় গাড়ি উদ্ভাবনের ইসরাইলী কোম্পানি মোবাইল আই (Mobileye),বর্তমানে যার বার্ষিক আয় ১ বিলিয়ন ডলার । তবে চিপ শিল্পে ইন্টেলের আগের দাপট কমে এসেছে, সেই সাথে কমে এসেছে ইজরায়েলে তাদের ফান্ডিঙয়ের পরিমানও, এখন ইজরায়েলে অর্থ লগ্নিকারী বড় প্রতিষ্ঠান হলো আমেরিকার নতুন চিপ জায়ান্ট Nvidia। গত ৫ বছরে Nvidia শত শত মিলিয়ন ডলার ইজরায়েলে বিনিয়োগ করেছে, ৪০০ মিলিয়ন ডলার খরচে তৈরী করে দিয়েছে ইজরায়েলে নির্মিত প্রথম AI জেনেরেটেড সুপার কম্পিউটার Israel 1। এমনকি ৭ ই অক্টোবর পরবর্তী ইজরাঈলী গণহত্যার মধ্যেও এট ইজরায়েলে এ বছর তাদের বিলিয়ন ডলারের লগ্নি জারি রাখে।

বিকল্পঃ Intel, Nvidia এর খুব ভালো বিকল্প AMD Ryzen microprocessor.
Meta, Instagram, Whatsapp: কয়েকবছর আগের কথা, হোয়াটসএপ ব্যবহারকারীদের তথ্য ব্যবহার করবার ঘোষনা দেয়াতে বিশ্বের সবখানে হোয়াটসএপ বয়কটের আওয়াজ ওঠে। রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠে টেলিগ্রাম, সিগনাল ও তুরস্কের বিপ এপস। অবস্থা বেগতিক দেখে হোয়াটসএপ ব্যবহারকারীদের তথ্য এন্ড টু এন্ড এনক্রিপ্টেড থাকবে বলে ঘোষনা দেয় যা আজ পর্যন্ত বলবত আছে। সবটাই মিথ্যা।
হোয়াটসএপকে যেমন আমরা বিশ্বাস করেছি, করেছিলো গাযার অধিবাসীর। এর চরম মাশুল তাদের দিতে হয়েছে।৭ই অক্টোবর পরবর্তী গাযা হত্যাকান্ডে ইজরায়েল মূলত AI জেনেরেটেড পদ্ধতিতে খুবই কিউট নামের এক বিশেষ সফটও্যারের মাধ্যমে হামাসের যোদ্ধাদের টার্গেট করে হত্যা মিশন পরিচালনা করে যার নাম ল্যাভেন্ডার, যার ইজরাঈলী কোড নাম অবশ্য হোয়ার ইজ ড্যাডি। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই সফটওয়্যার তার তথ্য সংগ্রহ করেছে ব্যবহারকারীর সকল নিরাপদ রাখার কথা দেয়া হোয়াটসএপ গ্রুপ ডেটা থেকে, অর্থাৎ, হামাসের কোন সদস্য যদি কোন হোয়াটসএপ গ্রুপে থাকে সেই গ্রুপের সমস্ত সদস্যকেও এই সফটওয়্যার হত্যার টার্গেট মিশনে অন্তর্ভূক্ত করেছে।

ল্যাভেন্ডার তৈরী এবং এর পরিচালনার কাজ করে ইজরাঈলী মিলিটারি ইউনিট-৮২০০ যে প্রজেক্টের সাথে যুক্ত ছিলেন ইজরায়েলের তেল আবিবে বসবাসকারী Guy Rosen যে কিনা একই সাথে মেটার চিফ ইনফরমেশন সিকিউরিটি অফিসারও। জায়নাবাদ বিপক্ষ সকল তথ্য মেটাতে ফিল্টার হবার প্রধান কারিগরও এই গাই রোজেন।
ইন্সটাগ্রামের প্রধান এডাম মোজেরি একজন ইজরাইল-আমেরিকার দ্বৈত নাগরিক এবং জায়নাবাদী ইহুদি। মজার ব্যপার হলো, উইকিপিডিয়া এবং সর্বত্র মোজেরির জন্মস্থান আমেরিকা দেখালেও এক টুইটে সে নিজেই জানায়, তার জন্ম ইজরায়েলের বেথে (Beth)। ইন্সটাগ্রামের ফিডে সংবাদ দেখানো কমিয়ে দেয়া এবং রাজনৈতিক সংবাদ দেখতে চাইলে সেটিংসে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার অপশনের শয়তানি বুদ্ধি এই মোজেরির।
মেটার সিইও মার্ক জাকারবার্গ আমেরিকান ইহুদী যে ইজরাইলী জায়নাবাদী স্বচ্ছাসেবক প্রতিষ্ঠান কুখ্যাত যাকাকে (Zaka) মোটা অংকের অনুদান দিয়ে থাকে যারা কিনা ৭ই অক্টোবরের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে আনা গণ ধর্ষন ,৪০ মাথা কাটা বাচ্চা, ওভেনে বেক করা বাচ্চার মত প্রপাগান্ডার জনক এবং যে প্রপাপগান্ডা এখন পর্যন্ত ইজরায়েলের পক্ষে এই গণহত্যার বৈধতা দিয়ে যাচ্ছে। আল জাজিরা ও টিআরটির(TRT) ৭ই অক্টোবর নিয়ে করা বিশদ ডকুমেন্টারিতে ৭ই অক্টোবর বিনির্মানে যাকার অপবাদানের বিস্তারিত আছে। বিকল্পঃ টেলিগ্রাম, সিগন্যাল।
ভাইবারঃ ইসরায়েলী কুখ্যাত দখলদার সামরিক বাহিনী তথা IDF এ কর্মরত দুই বন্ধুর উদ্যোগ,সদর দপ্তর তেল আবি। এই প্রতিষ্ঠানের আরেক পন্য আইওএসের ফাইল শেয়ারিং ক্লাউড iMesh.
গুগল ও ইউটিউবঃ মেটার মতই জায়নাবাদী গুগল ও ইউটিউব । গুগলের প্রতিষ্ঠাটা সের্গেই বিন একজন ইহুদী। ইউটিউবে আপনি ইজরায়েলের বিপক্ষে কিছু লিখতে পারবেন না। সরাসরি ব্যান, আমি মোট সাতবার বিভিন্ন মেয়াদে ব্যান খেয়ে চিরতরে ইউটিউব বয়কট করেছি। গুগল ইজরায়েলকে তার দখলদার সামরিক বাহিনীর জন্য উচ্চতর ক্লাউড সেবা দিয়ে যাচ্ছে এবং ইজরায়েলের সাথে যৌথভাবে এবং খোলাখুলিভাবে ১.২ বিলিয়নের দীর্ঘমেয়াদী তথ্য ও প্রতিরক্ষা সেবা দিতে চুক্তিবদ্ধ। মজার ব্যপার হলো, আমেরিকার সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে গুগলে কর্মরত কোন কর্মচারী গুগুলের এই সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কোন প্রশ্ন করতে পারে, তাহলে তৃতীয় বিশ্বের কোম্পানির মত তৎক্ষণাৎ তারা চাকরিচ্যুত হয়। বিকল্প সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে আমি DuckDuck Go ব্যবহার করি, গুগলের মত এত আরামদায়ক না হলেও, বয়কট মোটেও কোন আরামদায়ক বিষয় নয় বরং কষ্টকর ও কৃচ্ছতার বিষয়।
Fiverr: সদরদপ্তর তেল-আবিব,ইসরাঈল এবং এর সিইও মিশা কফম্যান একজন উগ্র ও প্রকাশ্য জায়নাবাদী, IDF এ অর্থলগ্নিকারী।অক্টোবর ১০ তারিখে মিশা এক টুইটারে IDF এ তার অনুদান দিগুন করার ঘোষনা দেন।

ফিভারে একজন ক্লায়েন্ট যত টাকার কাজ করে, ফিভার তার ২০% কেটে নেয় ।এর সহজ বিকল্প; Upwork ও Freelancer।
Lo’real: মধ্য ৮০র দশক থেকেই ইসরাইলে ব্যবসায় কার্যক্রম চালিয়ে আসলেও প্রথম ১৯৯৪ সালে ইসরাইলী প্রসাধন কোম্পানি ইন্টার বিউটির ৩০ শতাংশ শেয়ার,৭ মিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়ে পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দ্যশ্যে যাত্রা শুরু করে ফরাসী ব্যবসায় দৈত্য লরিয়ে্লের সহায়ক শাখা; লরিয়েল-ইসরাইল। ৯০র দশকে ৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ ছিলো বিশাল আর ইসরায়েলের ইমেজের জন্য বিপুল।যেহেতু, বিনিয়োগ থেকে লাভ নয় বরং ইসরায়েলকে সহায়তা করাই উদ্দ্যেশ্য তাই বাহির থেকে সিইও না এনে কোম্পানির প্রধান রাখা হয় কিনে নেয়া কোম্পানির তৎকালীন গড প্রপারকেই(Gad Propper)। প্রথম কারখানা স্থাপিত হয় মিগডাল হ্যামেক নামে এক ফিলিস্তিনি দখলকৃত গ্রামে,যার পূর্ব নাম মুজায়দিল।গ্রামটি ভীষণ বর্ণবাদী, ইসরাইলে এখনো অনেক মুসলমান-খ্রিস্টান ফিলিস্তিনি বসবাস করে কিন্তু তাড়িয়ে দেয়া মূল অধিবাসীরা তো দুরস্ত, এই গ্রামে কোন অ-ইহুদী, ফিলিস্তিনি জমি কিনতে,ভাড়া থাকতে, ও বসবাস করতে পারেনা। প্রতিষ্ঠার বছরখানেক পরেই ১৯৯৮ সালে ইসরাইলের প্রতি তাদের সমর্থন ও অর্থনীতিতে অবদানের জন্য জুবিলি পদক দেয়া হয়,যা কিনা ইসরায়েলের সর্বোচ্চ সম্মাননা পদক।
লরিয়েল ২০০৮ সালে, ১ লক্ষ ইউএস ডলার লাইফটাইম ইনভেস্টমেন্ট এওয়ার্ড হিসেবে ও্য়েইজম্যান ইন্সটিটিউট অব সায়েন্সকে প্রদান করে, যে ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইসরাইলি মিলিটারীর হয়ে গোপন আনবিক,রাসায়নিক ও জৈবিক অস্ত্রের গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ করে।
মধ্যপ্রাচ্যে লরিয়েলের সমস্ত উৎপাদন-রপ্তানির মূল কেন্দ্র Loreal Israel, বর্তমানে ১,১০০ কর্মী বাহিনী ও ৮৫০০ বিক্রয় কেন্দ্র নিয়ে ইসরায়েলের ১ নং প্রসাধনী কোম্পানি, মোট বিক্রির পরিমান প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার।এখানের ডেড সী থেকে তৈরিকৃত ‘Natural Sea Beauty’ ব্র্যন্ডের অধীনে অনন্য পণ্য বিশ্বের ২২টি দেশে রপ্তানি করে, যে লুত সাগর ভূমির মতই ফিলিস্তিনিদের থেকে পুরোপুরি ছিনতাইকৃত এবং বর্তমানে ইসরায়েলের পর্যটন,শিল্প,খনিজ সম্পদের অন্যতম উৎস।

মধ্যপ্রাচ্যের সবকটি দেশ এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে ল’রিয়েলের পণ্য রপ্তানি হয় এই ইসরায়েল থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে না হয় ইসরায়েল থেকে রপ্তানি হয় কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায়- নিউজিল্যান্ডে কেন?লরিয়েল ইসরায়েলের প্রধান এই কোম্পানির প্রধান থাকার পাশাপাশি ইসরায়েল-ইইউ চেম্বার অব কমার্সের প্রধানও ছিলেন।তার কার্যকরী লবিঙয়ের ফল অস্ট্রেলিয়ায়-নিউজিল্যান্ডে ইসরাইলের এই নতুন রপ্তানি পথ।প্রসাধনী ব্র্যন্ডের বাহিরে লরিয়েল ইসরাইল লিমিটেড বর্তমানে এক বিরাট কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান যার অধীনে রয়েছে ১২৫৭টি প্রতিষ্ঠান ।ল’রিয়েল প্যারিসের হয়ে তার অবদানের জন্য গড প্রপার ২০০৮ সালে ফ্রান্সের সর্বচ্চো পদক লিজিওন ডি অনার পদকে ভুষিত হন,তিনি ব্রিটেনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদক অর্ডার অব ব্রিটিশ এম্পায়ার (OBE) পদকপ্রাপ্ত।
ল’রিয়েলের হয়ে ইসরায়েলের পক্ষে কাজ করার জন্য পুরস্কৃত করা হয় সেখানে বিপক্ষে বললেই মিলে বহিষ্কার। জানুয়ারী ২০১৮ সালে লরিয়েল প্যারিস ইউকে বিউটি ব্লগার আমেনা খাতুনকে তাদের হেয়ার কেয়ার ব্র্যান্ড এলভাইভের (Elvive) প্রমোশনের জন্য ভাড়া করে, হিজাবী বিউটি ব্লগারকে হেয়ার লাইনের জন্য ভাড়া করায় বিষয়টি বেশ প্রশংসিতও হয় কিন্ত মাত্র দু-সপ্তাহের মাথায় তাকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে এক টুইটের জন্য তাকে সরাসরি বরখাস্ত করে।
আমেনা খান
ল’রিয়েল প্যারিস ইউকের অন্যতম জনপ্রিয় ব্র্যন্ড বডিশপের স্লোগান হচ্ছে যে,তারা সবস্ময় সামাজিক অবিচার ও মানবাধিকার রক্ষার প্রচারক কিন্তু ইসরায়েলের বেলায় তাদের কর্মকান্ড সম্পূর্ণভাবে ফিলিস্তিনিদের প্রতি অন্যায়ের সহায়ক।
লরিয়েলের বিখ্যাত কয়েকটি ব্র্যান্ডের নাম, Body shop, Garnier, Maybelline New york.
Cococola, ম্যকডোনাল্ড ও স্টারবাকস হলো বয়কট আন্দোলনের হোলি ট্রিনিটি। এরা এত বেশী বনেদী জায়নাবাদী এবং এদের বিপরীতে অসংখ্য ভালো বিকল্প থাকায় এই তিন পাপীকে চোখ বন্ধ করে বয়কট করে ফেলুন। এটি সত্য যে ,অন্যান্য পশ্চিমা কোম্পানির মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে কোকোকোলা এক খ্রিস্টান ফিলিস্তিনির উদ্যোগে ২০১৪ সালে ২৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে পশ্চিম তীরের রামাল্লা ও গাযায় নিজেদের প্ল্যান্ট খুলে যাতে কিছু ফিলিস্তিনিদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়।এমনকি ২০১৫ সালে ফিলিস্তিন অংশের কোকোকোলার সিইও বয়কট ইসরায়েলের পক্ষে প্রকাশ্যে তার সমর্থন প্রদান করে। কিন্তু, তাতে কোকোকোলার পাপ কমে না। কোকোকোলা প্রথম বড় আমেরিকান শিল্প হিসেবে দখলকৃত ফিলিস্তিনে তাদের কোম্পানি খুলে, এর প্রতিবাদে, আরবলীগ ১৯৬৬ সালে সমস্ত আরব দেশগুলোতে কোক নিষিদ্ধ করে। এটি ছিলো ইতিহাসে প্রথম বয়কটের ঘটনা। এত বড় ঘটনার পরও কোকোকোলা অব্যাহতভাবে ইজরায়েলে তাদের উতপাদন চালু রাখে। আরবরা যতদিন জাতীয়তাবাদী ছিলো কোকের উপর এই নিষেধাজ্ঞা বলবত ছিলো। কিন্তু, ধীরে ধীরে নানা রাজনীতি, হত্যা ক্যুর মাধ্যমে আরব নেতারা পূর্ণ জায়নাবাদীতে পরিবর্তীত হয়ে ১৯৯৭ সালে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। একই বছর ইজরায়েলের সরকার আরব লীগের বিপক্ষে যেয়ে দীর্ঘ ৩০ বছর অব্যাহত ইজরায়েলকে অর্থনৈতিক সহায়তা করার জন্য ইজরায়েল বানিজ্য পদক প্রদান করে। জাতিসংঘ ২০২০ সালের মানবাধিকার লংঘনের দায়ে কালো তালিকায় কোকের নাম অন্তর্ভূক্ত ছিলো।

কোকোকোলার ইজরায়েল তোষণ-প্রতিপালন তালিকা এত দীর্ঘ যে এটি নিয়ে আলাদা লেখা লিখতে হবে। অন্তর্জালে এসবই পাওয়া যায়। যার খুশী সে পড়ে নিতে পারে। আর যারা বলেন, কোকোকোলা আমেরিকান পন্য বটে, তবে উতপাদিত হয় বাংলাদেশে, তারা জানেন না, প্রতিটি বিক্রিত কোকের একটি অংশ ট্রেডমার্ক ব্যবহারের অংশ হিসেবে অনেক হাত ঘুরে হলেও কোকের জায়নাবাদী মালিকের হাতেই পৌছে।
স্টারবাক্সের প্রধান হাওয়ার্ড শুলজ (Howard Schultz)একজন জায়নাবাদী ইহুদী। ম্যকডোনাল্ড ফ্রিতে দখলদার সৈন্যদের খাবার সরবারহ করত।
Pepsi: পেপসির পূর্ণরুপ পেপসি কেনার প্রতিটি পয়সা ইসরায়েলের জন্য খরচ করুন (PEPSI-Pay each penny to Save Israel) বলে একটি কথা প্রচলিত,যদিও এর সত্যতা নিশ্চিত করা গেলেও এটিকেও চোখ বন্ধ করে বয়কট করুন।
কোকাকোলার মতই ইসরায়েলের আরেক জনপ্রিয় পানীয় তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ড সোডা স্ট্রিম, হলিউডের ইহুদী এবং জায়নাবাদী অভিনেত্রী স্কারলেট জোহানসন একসময় এর মুখপাত্র ছিলেন ।BDS মুভমেন্টের অব্যাহত প্রচারে ইসরায়েলের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড সোডা স্ট্রিম ২০১৫ সালে দখলকৃত পশ্চিম তীরে তাদের ফ্যক্টরি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়, বিডিএস আন্দোলনকারীরা যখন এই অর্জন উদযাপন করছিলো তখনই এগিয়ে আসে Pepsico (পেপসিকো) এবং ৩.২ বিলিয়ন ডলারে সোডা স্ট্রিম কোম্পানি কিনে নিয়ে তাৎক্ষনিক কোম্পানিটিকে বাঁচিয়ে দেয়। সাবরা (Sabra) ব্র্যন্ডের নামে ফাস্টফুডও তাদের। আমেরিকা ও কানাডায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীরা সহজেই এই পণ্য এড়িয়ে যেতে পারেন।

এছাড়াও বয়কট তালিকায় রয়েছে প্রক্টর ও গ্যম্বল, ইউনি লিভার,রেকিট এন্ড বেনকিজার, লেইস, ক্যাডবেরি চকোলেট, বাউন্টি চকোলেট, কিটক্যাট, নেসলে।

কোন পন্য কেনার আগে পন্যটি ইজরায়েলের সাথে সংশ্লিষ্ট কিনা জানতে ব্যবহার করুন, No Thanks নামের এপটি। এপটি একজন প্রবাসী ফিলিস্তিনির তৈরী যিনি তাঁর এক ভাই ও বোনকে ইজরাইলীদের হাতে হারিয়েছেন।
পশ্চিমসহ সারা বিশ্বের অসংখ্য সংবেদনশীল মানুষ এই বয়কটের সমর্থক,নিয়মিত এই পন্যসমূহ এড়িয়ে চলেন কারন ফিলিস্তিন গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুসলনমানদের একক কোন বিষয় নয় বরং মানুষ হিসেবে প্ররিচয় দেবার অন্যতম নিয়ামক। আপনার একটি পণ্য বর্জন হয়তো বাঁচিয়ে দিবে কোন ফিলিস্তিনি বা ফিলিস্তিনের পক্ষে কাজ করে যাওয়া কর্মীর।







You must be logged in to post a comment.