কানিজ ফাতেমা
হিস্ট্রি চ্যানেলে বিভিন্ন সভ্যতা ও ধর্মের উৎপত্তি নিয়ে একবার একটা ধারাবাহিক প্রচারিত হয়েছিলো।প্রচার হবার আগে বেশ কিছুদিন চলে বিজ্ঞাপন,যতটা আগ্রহ ছিলো দেখার জন্য,দেখে প্রত্যাশা অনুযায়ী মজা পাইনি,কেন পাইনি তা বলছি।
ডকুমেন্টারিটার মতে বিভিন্ন ধর্মের দেব দেবী,ধর্মীয় কিচ্ছা কাহিনী,প্রাচীন পৃথিবীর বিভিন্ন স্থাপনা যেমন পিরামিড,স্টোন হ্যাঞ্জ(stone henge) নির্মানে মানুষকে সাহায্য করেছে এমন কিছু যারা কিনা এই পৃথিবীর কেউ নয়(Non human entity),এই জ্ঞান মানুষের নয় বরং এই জ্ঞান আমাদের এই পৃথিবীর বাহির থেকে আসা,মহাজাগতিক,ভিন গ্রহবাসী অতি বুদ্ধিমান এলিয়েনদের থেকে পাওয়া।
যেমন হিন্দুদের দেবতা কৃষ্ণ,উনি দেখতে অবিকল মানুষের মতই তবে তার গায়ের রঙ নীল।ডকুমেন্টারি মতে এলিয়েনদের গায়ের রঙ নীল হয়ে থাকতে পারে,প্রাচীন কালের মানুষ কোন এক এলিয়েনকে দেখেই তাকে কৃষ্ণ নামে পূজো শুরু করে, আবার হিন্দু ধর্মের অনেক দেবতার মাথার পিছনেই একটা চাকতির মত উজ্জ্বল কিছু দেখা যায় যা কিনা এলিয়েনদের সসারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।মহাভারতের আকাশে উড্ডীন যুদ্ধযানগুলোকেও ওরা এলিয়েনদের বিভিন্ন যানের সাথে তুলনা করে দেখায়। খুবই আগ্রহদ্দীপক, প্রচুর খেটে আর গবেষনা করে তৈরী করা,কিন্তু এলিয়েনের মত একটা বিষয় যেটা একেবারেই অপ্রমানিত সেটা নিয়ে আমার বিশেষ আগ্রহ ছিলো না কিন্ত বাদবাকী বিষয়গুলো সত্যিই ভাবনার খোরাক জোগায়।পশ্চিমা বিদগ্ধ গবেষকেরা যখনই এসব স্থাপনা নির্মান কৌশল বের করতে পারেন না তখনই এলিয়েন তত্ত্বে দ্বারস্ত হোন,কিন্তু এলিয়েন নিজেইতো ভীষন ভাবে প্রমানহীন।
প্রাচীন পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম ও স্থাপনা আসলেই এমন কিছু সাহায্য করেছে যারা কিনা এই মনুষ্য সমাজের অন্তর্ভুক্ত নয় যেমন মসজিদুল আকসা এবং ইজরায়েলের পুরনো শহর(Old City)। তবে তারা ভিনগ্রহ বাসী এলিয়েন না,তারা হলো মূলত ১।জ্বীন জাতি (এদের মধ্যে আবার ভাগ আছে ভালো জ্বীন ও খারাপ জ্বীন বা শয়তান)২।ফেরেশতা (কোরানের হারুত ও মারুত)।
শয়তান ও কালো জাদু কি?
আদম (আঃ)কে সিজদা দিতে অস্বীকার করে বেহেস্ত থেকে তার অনুসারী জ্বীন সহ বিতারিত জ্বীনই শয়তান,বাইবেলে এর নাম লুসিফার।শয়তান মানুষকে আল্লাহর উপাসনা থেকে ফিরিয়ে রাখার ওয়াদা করে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের কাছ থেকে মোট তিনটি ক্ষমতা দিয়েছিলো ১/ কেয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা
২/মানুষের শিরা-উপশিরায় ঢোকার ক্ষমতা ৩/যেখানে খুশী,সেখানে যাবার ক্ষমতা।শয়তানের মূল লক্ষ্য মানুষকে এক আল্লাহর থেকে ফিরিয়ে রাখা তা যেভাবেই হোক,তার কাছে ঈমান বিক্রি করে পূজো দিলে সে তার ক্ষমতাবলে মানুষকে কিছু সুযোগ সুবিধা দিতে পারে,আর এই পূজো বা আত্না বিক্রির নামই কালো জাদু।
“কতইনা মন্দ তা যার বিনিময়ে তারা তাদের আত্নাকে বিক্রি করেছে”(সূরা বাকারা-৯০)
মনে রাখা ভালো শয়তান নিজে সবসময় সরাসরি পূজো নেয় না,প্রতিনিধির মাধ্যমে নেয় যেমন মূর্তি,সাপ,গরু ।জ্বীন জাতির ক্ষমতা ও মানুষের ক্ষমতা আলাদা,পৃথিবীতে থেকেও আমাদের জগত আলাদা,কিরকম ভাবে আলাদা,যেমন কুকুরের শব্দের শ্রাব্যতার সীমা উর্দ্ধে ৩৫০০০Hz,বাদুরের ১,০০,০০০ Hz কিন্তু মানুষের মাত্র ২৬,০০০ Hz । তার মানে কুকুর,বাদুর অবলীলায় যে শব্দ শুনে আমরা মানুষরা শুনি না,আবার আমাদের চারপাশে যে সমান্তরাল ভাবে আরেকটা জগত রয়েছে তার কিছুই আমরা দেখি না কিন্তু জ্বীনরা হয়তো ঠিকই দেখে।
মসজিদুল আকসা এবং ইজরায়েলের পুরনো শহর(the Old City)জ্বীনদের দ্বারা তৈরী,কেউ যদি মসজিদুল আকসা বা অল্ড সিটির ভ্রমনে যান তবে অল্ড সিটির দেয়ালের নীচের অংশ (দেয়ালের উপরের অংশ বিভিন্ন রোমান সম্রাটদের তৈরী,দুই অংশে দুইরকমভাবে কাটা পাথর ব্যবহৃত হয়েছে) বা ডোম অব রক মসজিদের একদম ভিতরের দিকের খিলানগুলো দেখলেই বুঝবেন এত প্রকান্ড পাথর মানুষের পক্ষে কাটা ও বহন করা দুইই অসম্ভব,এগুলো পৃথিবীর উপরের পাথরও নয়,সমুদ্রের নীচ থেকে তুলে আনা।তাহলে এটা নিশ্চিত যে প্রাচীন পৃথিবীর স্থাপনা নির্মানে জ্বীনদের অবদান একদম মিথ্যা না।
প্রাচীন মিশর,সিরিয়া আর ইরাক ছিলো জাদুর উর্বর ক্ষেত্র।ইতিহাস মতে এর শুরুটা হয় প্রাচীন ইরাকে ইবরাহিম (আঃ)র জন্মের আগে আগে। ব্যবিলন নগরীর সম্রাট নমরুদ (বাইবেলের Nimrud)প্রথম নিজেকে সূর্য দেবতা হিসেবে পরিচয় দেয়,সূর্য পুজার চল তখন থেকেই শুরু।( http://www.the-ten-commandments.org/origin_of_babylon_sun_worship.html )

নেমরুত পাহাড়ে (the Nemrut Hill,Turkey) নমরুদের মূর্তির ধ্বংসাবশেষ
নম্রুদের মূর্তি
কোরানে আছে,ইবরাহীম (আঃ) প্রথমে আকাশের তারকারাজিকে ও পরে রাতের পূর্ন চাঁদকে নিজের প্রভূ হিসেবে মনে করেন,কিন্তু এই চাঁদ একসময় ডুবে যায়,তারপর তিনি উদিত সূর্যকে নিজের প্রভূর আসনে বসান,তিনি বলেন,’এ আমার রব,এ সবচেয়ে বড়’কিন্তু সন্ধ্যা হতে তাও ডুবে যায়,তখন তিনি প্রভূ নির্বাচনে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে ঘোষনা দেন যা কিছু ডুবে যায় তা তার প্রভু হতে পারেনা।(সূরাঃ৭৭-৮৪)
কোরানে এভাবে চন্দ্র,সূর্য ধরে ধরে বোঝানোর কারন তখনকার মানুষের চন্দ্র,সূর্য পুজোর অসারতা বোঝানো।
তার স্ত্রী সেমিরামিস (Semiramis)ছিলো স্বর্গ থেকে বিতাড়িত শয়তানের পূজারি এবং চন্দ্র দেবী(The goddess of Moon)।
দুনিয়ার বুকে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার পর নমরুদ আকাশেও নিজের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে বাবেল টাওয়ার(tower of Babel) নির্মানকাজ শুরু করে,এই টাওয়ারেও ছিলো শয়তান পূজো করার আলাদা জায়গা।এই তথ্যগুলো অবশ্য কোরানের না,বাইবেলের।

বাবেল টাওয়ারের ধ্বংসাবশেষ
কোরানে বাবেল শহরের কথাও এসেছে, বাবেল শহরে তখন কালো জাদুর রমরমা অবস্থা, যেহেতু নমরুদ নিজেকে খোদা হিসেবে দাবী করে তাই সাধারন মানুষ কালো জাদুকে খারাপ কিছু মনে করতো না। আল্লাহ তখন হারুত ও মারুত নামের দুই ফেরেশতাকে পাঠালেন।তারা মানুষকে দুনিয়ায় কালো জাদু শেখাতে এসেছিলো,কিন্তু শেখানোর আগে তারা বলে দিতো যে তারা মানূষের জন্য পরীক্ষা,এই জাদু শেখা কুফুরীর অংশ তাই কেউ যেন না শিখে।কিন্তু তারপরও কেউ ঈমান বিক্রি করে শিখতে চাইলে তারা শেখাতো।এখানে আল্লাহর ইচ্ছাটা ছিলো মূলত মানুষকে ঈমান ও কুফরি কালামের পার্থক্য বোঝানো।
পিরামিডঃ পিরামিড কিভাবে এবং কেন নির্মিত হয়েছিলো তা এখনো গবেষকদের কাছে একটা বড় রহস্য,যেমেন বেলে পাথরের ব্লকগলোর উতস ও তৈরী পদ্ধতি,বহন করা, টেনে তোলা, নিখুঁত জ্যামিতিক পদ্ধতিতে খাপে খাপে বসিয়ে দেয়া,নির্মান পদ্ধতি পুরোটাই আগাগোড়া একটা রহস্য। একেকটা পিরামিড স্থাপনা হিসেবে পুরোই একেকটা নিখুঁত অংক,অথচ হ্যায়ারোগ্লাফিক রীতির ভাষায় কোন অংকের নাম নিশানাও খুঁজে পাওয়া যায়না, কে অংকগুলো কষেছিলো তার ন্যূনতম ধারনাও পাওয়া যায়না,নেই তাদের কোন সাক্ষর, নেই অংক ও বিজ্ঞান শেখার উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধ্বংসাবশেষের।
বলা হয়ে থাকে পিরামিডগুলো ছিলো ফারাওদের সমাধিস্থল,কিন্তু আশ্চর্যের কথা হলো এক বেচারা তুতেনখামেন ছাড়া আর একটা মমিও পিরামিডের ভিতর পাওয়া যায়নি,কিছু খালি শবাধার পাওয়া গেছে,বলা হয়ে থাকে এখানে ওদের মমি ছিল যা চুরি হয়ে গেছে কিন্তু একটা শবাধারের আয়তনও সাধারন উচ্চতার মানুষের সাথে মানানসই নয়।কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন মিউজিয়ামে অনেক মমি পাওয়া যায়,এই মমিগুলোর সবগুলোই বাহিরের সমাধিস্থল থেকে পাওয়া,সুতরাং পিরামিড সমাধিস্থল হিসেবে তৈরী হয়েছিলো এসব স্রেফ বাজে কথা।তাহলে পিরামিডগুলো বানানো কেন হয়েছিলো?
এজন্য আমরা মিশর থেকে ১২,৩৩৬ কিলোমিতার দূরে পাওয়া যায় আরো তিন সভ্যতার পিরামিডের সাথে একটু মিলিয়ে নিই চলুন।ল্যাটিন আমেরিকায় মোট তিনটি সভ্যতার বিকাশ ঘটে যথা ১।মায়া সভ্যতা ২।ইনকা সভ্যতা ৩।আজট্যাক সভ্যতা।এর মধ্যে মায়া সভ্যতা ও আজট্যাক সভ্যতার পিরামিড বানানোর চল ছিলো।মায়া ও আজট্যাক সভ্যতারও আগে পাওয়া যায় পেরুর পিরামিড।

অ্জযাট্যাকদের পিরামিড
মায়া ও আজট্যাকদের পিরামিড মোটেও শবাধার জাতীয় কিছু ছিলো না,এই দুই জাতিই বিজ্ঞান,স্থাপত্য,অংক বিশেষ করে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে মোহাচ্ছন্ন (obsession on astrology) ছিলো,ওদের পিরামিডগুলো প্রধানত উপাসনালয় ও মাণমন্দির হিসেবেই ব্যবহৃত হতো,প্রচুর বলি চড়ানোও হতো।পিরামিডগুলোর পাশেই মানুষের হাড়গোড়ের বিশাল স্তুপ আবিষ্কৃত হয়েছে। সাধারন মানুষের জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে এত কৌতুহল,সূর্যের অবস্থান জানতে চাওয়া,এত বলি চড়ানো অস্বাভাবিক,ওদের স্থাপনা গুলোর মতই অস্বাভাবিক।

পিরামিডের সামনের মাণমন্দির, পিলারগুলোর অবস্থান সুর্যের বিভিন্ন অবস্থান বোঝার জন্য ব্যবহৃত হয়, স্টোন হ্যাঞ্জের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ
উপাসনালকেই মানমন্দির হিসেবে ব্যবহার করা বুঝায় হয় ওদের ধর্ম খুব আধুনিক গোছের কিছু ছিলো যেখানে ঈশ্বরের উপাসনার পাশাপাশি বিজ্ঞান চর্চা করা হতো,অথবা আকাশের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করাই ওদের ধর্ম ছিলো,ওদের ঈশ্বর মহাকাশেরই কেউ। তিন সভ্যতারই প্রধান দেবতা ছিলো সূর্য,তারা নিজেদেরকে পৃথিবীতে সূর্যের প্রতিনিধি মনে করতো আর স্থানিক দেবতা কুকুলকান হলো নামের উড়ুক্কু সাপ।এই দেবতার জন্য তারা কুমারী মেয়ে ও শিশু নরবলি দিতো।

ইনকাদের পিরামিড
৫২টি ধাপের কুকুলকান পিরামিড আসলে মায়ান বর্ষ্পঞ্জি,যারা মনে করতো এই পৃথিবীর আয়ুষ্কাল ৫২ বছর পর ২০১২ সালে ধ্বংস হয়ে যাবে।তাদের এত আশ্চর্য বিজ্ঞান,জোতির্বিজ্ঞান,অংক ও স্থাপত্য জ্ঞান থাকার পরও তারা ভুল ভবিষ্যতবানী করেছিলো কারন তারা যার বা যাদের সাহায্য নিয়েছিলো তাদের গায়েবের জ্ঞানের পথ রুদ্ধ,কোরান মতে আকাশের উল্কাপিন্ডগুলো সর্বদা শয়তানকে আরশের কথা শুনে ফেলতে বাঁধা দেয়(১৫সূরা হাশরঃ১৮)
ফেরেশতারা জ্বীনদের তাদের কথা শুনতে বাঁধা দেয় ,এই জন্য দেখা যায় সুলায়মান (আঃ)র মৃত্যুর পরও আল আকসা মসজিদ ও অল্ড সিটির অসম্পূর্ন কাজ সম্পন্ন করা পর্যন্ত তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন,জ্বীনেরা উনার ভয়ে পুরো কাজ ঠিকঠাক মত শেষ করে,পরে উইপোকা উনার লাঠি খেয়ে ফেলার পর উনার দেহ পরে যায়,তখন জ্বীনেরা বুঝতে পারে ওদেরকে কত বড় বোকা বানানো হয়েছে।
আবার ফিরে যাই মিশরে।মিশরের প্রধান দেবতাও ছিলো তিন সূর্য দেবতা,যেমন ১।হোরাস-উদীয়মান সূর্যের দেবতা ২।রা (Ra )- উদিত সূর্য ৩।অসিরিস(Osiris)-অস্তগামী সূর্যের দেবতা।পরে ফারাও এসে এই তিন সূর্য দেবতাকে এক সূর্্যেের চাকতির (Sun Disk)মধ্যে নিয়ে আসেন।(www.reviewofreligion.org)
পিরামিডগুলোর গায়ে এর নির্মানকারির নাম নেই শুধু আছে একচোখা দেবতা হোরাসের ছবি(One eyed Sun God,যা কিনা এখনের সিক্রেট সোসাইটির অন্যতম প্রতীক)।

পিরামিডের গায়ে একচোখা দেবতা হোরাসের ফলক
আবার গিজার বিখ্যাত তিন পিরামিডগুলো আকাশের এক বিশেষ নক্ষত্রপুঞ্জ কালপুরুষের(Constellation of Orion belt) বরাবর স্থাপিত।মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো মানুষের সৃষ্টি আকাশের নক্ষত্র মালা থেকে তাই তাদের আকাশের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা জরুরী।তাদের আরেক দেবী আইসিস(Isis),যে কিনা সূর্য দেবতা হোরাসের মা ও ওসিরিসের স্ত্রী সরাসরি নক্ষত্রের সাথে সম্পর্কিত।

দেবতা রা,আমুন ও সেমিরামিসের মাথার দুই শিঙের মাঝখানে সান ডিস্ক
তাহলে বলাই যায় মিশরের পিরামিড গুলো মূলত মানমন্দির ও তাদের মহাকাশের দেবতাদের জন্য নির্মিত।
আরও অদ্ভুত পিরামিডের গায়ে অংকিত বিচিত্র হায়ারোগ্লিফিক ভাষা।ইবরাহীম (আঃ)র উপর ততদিনে অজিফা নাযিল হয়ে গেছে,মুসা(আঃ)পেয়েছেন তাওরাত,এগুলোর কোনটাই হায়ারোগ্লিফিক ভাষায় না বরং সেমেটিক ভাষায়।তাদের বইয়ের ভাষা যদি হায়ারোগ্লিফিক তবে এই ভাষা এত দুর্বোধ্য হতো না,ধর্ম প্রচারও মাঠে মারা যেতো।তারমানে সাধারন মিশরীয়দের কথ্য ভাষা আর পিরামিড নির্মানকারিদের ভাষা ভিন্ন ছিলো,যে কারনে এর সম্পূর্ন পাঠোদ্ধার আজও সম্ভব হয়নি,আর কোনদিন হবেও না।
মায়া ও এজট্যাক সভ্যতার মাঝখানে ছিলো ইনকা সভ্যতা,ইনকারা আবার পিরামিড বানাতো না কিন্তু ইনকাদেরকে লাফ দিয়ে পার হয়ে আজট্যাকরা আবার পিরামিড বানানো শুরু করে,মাঝখানে বছরের ব্যবধান,স্থানের ব্যবধানতো ছিলোই তার উপর মায়ান ভাষা আর এজট্যাক ভাষা ভিন্ন ভিন্ন।ইনকারা আবার ছিলো মমি বানাতে অস্তাদ জাতি,ইনকাদের লিখিত কোন কিছুর অস্তিত্ব ছিলো না যাতে করে এক সভ্যতা থেকে আরেক সভ্যতায় পিরামিড বা মমি বানানোর কৌশল পৌছে দেয়া যায়,আবার তিন সভ্যতারই ভাষা একেবারেই ভিন্ন।(http://www.johnwhye.com)
এখন কথা হলো দূর আফ্রিকার মিশরের পিরামিডের সাথে মিল থাকতে পারলে পেরু,হন্ডুরাস,আর্জেটিনা,মেক্সিকোতো গায়ে গা লাগানোই।ভিন্ন ভিন্ন সময়ের দূরবর্তী সভ্যতার চিন্তা চেতনা ও কাজকর্মে কি আশ্চর্য মিল,যেন তাদের মধ্যে কোনরকম যোগাযোগ ছিলো অথচ এখনের সময়ের মানুষেরা নির্মান কৌশল ও নির্মানের কারন কিছুই পুরোপুরি বের করতে পারছে না।কারনটা কি এমন কিছু নয় যে এতে এমন কোন শক্তি জড়িত ছিলো যাদের জ্ঞান আর মানুষের জ্ঞান সমান নয় এবং তারা প্রকাশ না করলে মানুশের সাধ্য নেই যে জানতে পারে।ব্ল্যাক ম্যাজিসিয়ানদের কাছে মিশরের পিরামিড এখনো তাদের স্বর্ণ সময়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়,হয়তো তারা জানে কারা ছিলো এর নির্মানের পিছনে।
কোরানে পিরামিডের নির্মান নিয়ে কিছু বলা নেই এবং দরকারও নেই কারন আল্লাহ বলেছেন তিনি ফেরাউন (রামসেস দ্বিতীয়র লাশ পৃথিবীর মানুশের জন্য সংরক্ষন করবেন এবং তিনি করেছেন যার লাশ কোন পিরামিদের ভিতরে নয় বরং উন্মুক্ত এক সমাধিস্থল থকে ১৮৮১ সালে উদ্ধার করা হয় যা বর্তমানে কায়রো মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে,আল্লাহ যদি বলতেন পিরামীদের ভিতরে সংরক্ষন করবো তাহলে সেটা ভুল হতো।কোরানে শুধু আছে ফেরাউনের আল্লাহকে উঁকি মেরে দেখার দালান নির্মানের কথা,যার দায়িত্ব ফেরাউন(রামসিস দ্বিতীয়)তার মন্ত্রী হামানকে দিয়েছিলো,কোন জাদুকরকে না,ওই দেয়াল ও তার নির্মান কৌশল দুইই বর্তমানে জানা যায়,কোন রহস্য নেই।
কিন্তু ফেরাউন যে জাদু ও জাদুকরের পৃষ্ঠপোষকতা করতো তার কথা কোরানে আছে, মূসা (আঃ)র সাথে আল্লাহকে নিয়ে বাহাসে ফেরাউন রাজ্যের সমস্ত যাদুকরদের ফেরাউনের পক্ষ হয়ে তাদের ভেল্কি দেখানোর জন্য ডাকে,তারা সবাই রং বেরংয়ের সাপ বের করে নিয়ে আসে,কিন্তু মূসা(আঃ)র লাঠির সাপ জাদুকরদের সমস্ত সাপ গিলে ফেলে।এই অভূতপূর্ব ঘটনা দেখে জাদুকরেরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার পর জাদুর প্রকোপ অনেকাংশে কমে আসে বটে তবে তা বেশী দিনের জন্য নয়।
কোরান অনুযায়ী কালোজাদুর প্রকোপ আবার শুরু হয় সুলাইমান (আঃ)র সময় থেকে,কোরানের সূরা বাকারায় এর উল্লেখ আছে।সুলাইমান (আঃ) অবাধ্য জ্বীন জাতিকে বশে এনে তাঁর প্রয়োজনীয় কাজ কর্ম সারতেন।ইহুদীদের একাংশ যথারিতী এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলতো ও বলতো তিনি মোটেও গডের প্রেরিত নবী নয় বরং কালো জাদু চর্চাকারী।
“(যাদের কিতাব দেয়া হয়েছিলো/ইহুদী-নাসারাগন)ঐ সবের অনুসরন করে থাকে যা সুলায়মানের রাজত্বকালে শয়তানরা আবৃত্তি করত। অথচ সুলায়মান কুফরি করেননি,বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল,তারা মানুষকে জাদু বিদ্যা শিক্ষা দিত এবং বাবেল শহরে হারুত ও মারুত দুই ফেরেশতার উপরে যা নাযিল হয়েছিলো,তা শিক্ষা দিত।আর তারা কাউওকে শেখাতো না যে পর্যন্ত না বলত যে, ‘আমরা তো পরীক্ষা,সুতরাং তোমরা কুফুরী করোনা।এরপর্ব তারা এদের কাছ থেকে শিখতো,যার মাধ্যমে তারা পুরূষ ও স্ত্রী লোকের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতো“ (সূরা বাকারা-১০২)
স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর জাদু এখনো দুনিয়া জুড়ে ব্যপক প্রচলিত জাদু এমনকি বাংলাদেশেও।
কিতাবী ছাড়া সমস্ত জাতিতেই সূর্য কোন না কোন ভাবে দেবতা,হিন্দু ধর্মে সূর্য হলো সেই দেবতা যাকে প্রতিদিন দেখা যায়,সূর্্যে দেবতার জন্য রয়েছে নিজস্ব মন্ত্র ও পূজোর রীতি নীতি,মিশরে ছিলো সূর্য দেবতা হোরাস,ইনকারাও সূর্য পূজো করতো এখনো যার চিহ্ন আছে বর্তমান আর্জেন্টিনার পতাকায়(Sun Gog/Sun of May)। তোমরা সূর্যকে সিজদা করোনা,চন্দ্রকেও না,আল্লাহকে সিজদা কর,যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন…’(সূরা হা মীম সিজদাহ-৪১:৩৭)এজন্য মুসলমানদের জন্য সূর্য উদয়,ও সূর্যাস্তের সময় নামায পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।হাদীসে আছে সূর্য এই সময় শয়তানের দুই শিঙয়ের মাঝে অবস্থান করে (মিশকাত,হাদীস নং ১০৪২)(এই শিংয়ের প্রসংগে পরে আসছি)।
গরুঃনিরীহ,গৃহপালিত এই প্রানীর নামে কোরানের একটি সম্পূর্ন সূরাই নাযিল হয়েছে,সূরা বাকারা ,কোরানের দিত্বীয় ও বৃহত্তম সূরা। প্রথম প্রথম আমার কাছে এই নামকরন খুব অদ্ভুত লাগলেও ধীরে বুঝতে পারলাম ধর্ম জগতে গরুর গুরুত্ব ব্যপক। গরু হিন্দু ধর্মের কাছে খুবই ভক্তিস্থানীয়,মহাদেব শিবের বাহন,রাধা-কৃষ্ণের লীলার সাথী।

শিবের বাহন নন্দী,কৈলাসের পাহারাদার
আবার ইহুদীরা তাদের আল আকসা কম্পাউন্ডে থার্ড টেম্পল বানানোতে পর্যন্ত হাত দিবে না যতদিন পর্যন্ত না ইজরায়েলে একটি লাল গাভীর জন্ম হয়,তাওরাতের(Old Testaments) এ গাভীর পূর্ণ বর্ননা আছে । আবার বাইবেল মতে যিশু খ্রিষ্টের জন্ম এক গোয়াল গরে,(কোরান মতে এক নির্জন নদীর ধারে একাকী)। কোরানে যাই,মূসা (আঃ)তখন ইহুদীদের নবী,তিনি চল্লিশ দিনের জন্য তূর পর্বতে গিয়েছিলেন তার উম্মতকে ভাই হারূন (আঃ)র দায়িত্বে দিয়ে,এসে দেখেন তার উম্মত এক আল্লাহকে বাদ দিয়ে সামেরী নামক এক ব্যক্তির পাল্লায় পরে বিভিন্ন অলংকার নির্মিত এক বাছুরের উপসানা করছে যা কিনা কোনরকমে ‘হাম্বা’ শব্দ করতে পারতো।মূসার কওম তাতেই এত আশ্চর্য হয় যে প্রভু হিসেবে স্বীকার করে নেয়।‘…অতঃপর তোমরা তার যাওয়ার পর বাছুরকে (উপাস্যরুপে) গ্রহণ করেছিলে,আর তমরা ছিলে যালেম”(সূরা বাকারা:৫০,খন্ডাংশ)। “আর মূসা যখন তার কওমকে বলেছিলো,’হে আমার কওম,নিশ্চয় তোমরা বাছুরকে গ্রহন করে নিজেদের উপর যুলুম করেছ।সুতরাং তোমরা তোমাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে তওবা করো”(সূরা বাকারাঃ৫৪,খন্ডাংশ)যাইহোক আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেন।
ভাবছেন ঘটনা এখানেই শেষ,মোটেও না।প্রাচীন আরবে বা’য়াল দেবতা খুবই গুরুত্বপূর্ন,কোরান এবং বাইবেল দুই জায়গায় এর নাম এসেছে।বা’য়াল দেবতার কয়েকটা রুপ পাওয়া যায়,অবাক হয়ে খেয়াল করলাম এর একটা রূপ হলো সামেরি নির্মিত সেই গরু,আর সেই গরুর দুই শিঙয়ের মাঝখানে সেই সূর্য,যা কিনা মিশরীয় দেবদেবীর মাথায়ও ছিলো।

সামেরী নির্মিত বা’য়ল দেবতার অনুরূপ,লন্ডন মিউজিয়াম

সাপ,সুর্য,গরু সব একসাথে,মিশরীয় ছবি

গরুর মাঝখানে মিশরীয় দেবতা আমুন
কোরানে শয়তানের কোন বর্ণনা নেই কিন্তু বাইবেলের চিত্র গুলোতে লুসিফার মানেই দুই শিঙ্গওয়ালা একজন।হাদীসে বর্নিত বিশেষ সময়ে সূর্যের দুই শিঙয়ের মাঝখানে চলে আসার সাথে এই দেবতাদের আশ্চর্য মিল,সুবাহানাল্লাহ।
সাপঃ হিন্দু ধর্মে সাপ খুবই সম্মানিত আবার মায়া সভ্যতায়ও ছিলো কুকুলকান নামে সর্প দেবতা,পিরামিডের গায়েও পাওয়া যায় খোদাইকৃত সাপের প্রতিকৃতি।মায়ানদের সর্প দেবতা আবার উড়তেও পারে,যেমন চীনের ড্রাগন।
গ্রীক মিথলজির অর্ধেক ঘোড়া অর্ধেক মানব (Unicorn)র সাথে হুবুহু মিল আছে ইরাকের নিমরুদ শহরের অর্ধেক ঘোড়া অর্ধেক মানবের অথচ কোথায় ইউরোপ আর কোথায় এশিয়া।আবার নমরুদের ঈগলকে পাওয়া যায় মিশরীয় হায়ারোগালাফিক ও পিরামিডে,সিংহ মানব(স্ফিংস)কেও পাওয়া যায় নমরুদের মূর্তির পাশে।
তাহলে দেখা যায় কিতাব আসেনি এমন সব সভ্যতার ধর্মীয় রীতি নীতিগুলো মোটামুটি হাজার মাইলের ভৌগলিক ও সময়ের দূরত্ব থাকার পরও প্রায় একই,যেন তাদের মধ্যে কোন যোগসূত্র ছিলো। আলাহ রব্বুল আলামীনকে হাজার হাজার নবী পাঠিয়ে বছরের পর বছর তাঁর পথে ডাকতে হয়েছে,একের পর এক নবীকে নির্যাতন ও নিষ্ঠুর মৃত্যু বরন করতে হয়েছে,মানুষকে যতই তার পথে ডাকা হোক না কেন তার ডাক ভুলে যেতে একটুও সময় লাগে না(গরুর হাম্বা ডাক শুনেই ভুলে যায়),কিন্তু অন্য পথগুলোতে কী আশ্চর্য রক্তপাতহীন,নির্ঝঞ্ঝাট সুসমন্বয়।তখনতো আর আজকের যুগের মত ইন্টারনেট,মোবাইল ছিলো না,তাহলে যোগসূত্রগুলো স্থাপন করলো কে,এমন কেউ যে অবশ্যই মনুষ্য সমাজের কেউ না (কারন এই সভ্যতাগুলোর মধ্যে এত দীর্ঘসময় থাকার মত লম্বা জীবনকাল কোন মানুষেরই নেই,তার ভাষা,দৈহিক সীমাবদ্ধতার কথা ব্যতিরেকেই) এবং যে আল্লাহকে এক উপাস্য হিসেবে দেখতে চায় না।
You must be logged in to post a comment.