কানিজ ফাতেমা।
মুসলমানরা ছাড়া বর্তমানে ইহুদী,খ্রীষ্টান কেউই কোরবানী দেয়না। ইহুদীরা একসময় দিতো বটে,তাদের বইয়ে কোরবানেটের (Qorabanot) কথাও উল্লেখ আছে। এখন আর কোরবানী দেয় না, কারন দেখায় তাদের কোরবানী দেবার কোন জায়গা নেই (টেম্পেল মাউন্ট)। তাদের ধর্মতে, আব্রাহাম কোরবানী দিয়েছিলেন টেম্পেল মাউন্টে, আরবের মরুভূমিতে নয়। আবার কখনো টেম্পেল তৃতীয় (Temple Third/মসজিদুল আকাসা) (বর্বর) মুসলমানদের থেকে উদ্ধার হলে পরে উনারা আবার কোরবানী দিতে পারেন। আর খ্রীষ্টানদের কোরবানীর কোন বালাই কোন কালেই নেই। তারা আরো বিশ্বাস করে ইসমাইল নয় বরং কোরবানী দিতে আদিষ্ট ব্যক্তিটি ইসহাক (আঃ)।
আল্লাহ আব্রাহামের দুইপুত্রের মধ্যে তাঁর প্রিয়তমটিকে নিজের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। এখন ইহুদী মতে কোরবানীর জন্য আদিষ্ট আল্লাহর সেই প্রিয়তম ছেলেটি ইসহাক (আঃ), ইহুদীদের আদি পিতা, পবিত্র পুরুষ। এবং মুসলমানদের মতে ইসমাইল (আঃ), রাসূল (সাঃ)র পুর্বপুরুষ।
কে ছিলেন সেই পবিত্র পুত্র তা প্রমান করতে ইহুদীদের প্রমান তাদের পবিত্রগ্রনথ Genesis/ তাওরাত আর মুসলমানদের আল কোরান।
তবে দুঃখজনক বিষয় হলো ইহুদিদের আদিপুস্তক বর্তমানে আর তার আদিরুপে নেই, একটু খুঁজলেই তার অনেকগুলো পরিবর্তিত প্রতিলিপি পাওয়া যায়।
ইসমাইল (আঃ) কে তাঁর মর্যাদা দিতে নারাজগণ জেনেসিস থেকে ইসহাকের পক্ষে তিনটি ও কোরান থেকে একটি যুক্তি দেখায়।
প্রথমত ,জেনেসিসের এক তথ্যমতে কোরবানীর সময়ে ইসহাকই (আঃ)(Issac/আইজাক) ছিলেন ইবরাহীমের একমাত্র পুত্র, কারন ইসমাইল তখনো জন্মলাভই করেননি।
যেমন,
“তোমার সেই একমাত্র সন্তানকে, যাকে তুমি ভালোবাস, সেই ইসহাককে নাও। ওই মোরিয়া দেশে যাও,সেখানে পর্বতগুলির মধ্যে একটির উপরে তাঁকে আমার উদ্দ্যেশ্যে বলি দাও” (আদি পুস্তক/জেনেসিস ২২:২)
অথচ জেনেসিসেরই আরেক অংশে অন্যরকম বানী দেখা যায়, যেমন ইবরাহীম (আঃ)র এক প্রার্থনা ছিলো এমন…
“প্রভু, তুমি আমাকে কেন সন্তান দাওনি,আমার উত্তরাধিকারী হবে একজন ক্রীতদাস পরিবার জাত । তখন প্রভু পরমেশ্বরের এই বানী তাঁর কাছে উপস্থিত হলঃ ঐ ব্যক্তি তোমার উত্তরাধিকারী হবে না, তোমার ঔরসজাত সন্তানই হবে তোমার উত্তরাধিকারী” (আদিপুস্তকঃ gen.15:1-4)
এখানে একজন ক্রীতদাসী মানে স্পষ্টতই হাজেরা (Hager)। তার মানে ইতিমধ্যেই হাজেরা ইবরাহীমের জীবনে প্রবেশ করেছে এবং তাঁর প্রবেশের কারন সারাইর (Sarai) সন্তানহীনতা। প্রভু পরমেশ্বর এখানে একজন ‘ঐ ব্যক্তির’ কথা বলছেন। এখানে ‘ওই ব্যক্তিটি’ কে? সেকি ইসমাইল? সেকি তখন জীবিত, নাকি তাঁর পৃথিবীতে আসার পূর্বেই তাঁকে নিয়ে প্রভু ও আব্রাহামের কথা চলছে?
তাহলে, নিম্নোক্ত শ্লোকটি দেখুন,
“সে (সারাহ) তার দাসী হ্যগারকে তার স্বামী আব্রাহামকে স্ত্রী হিসেবে দেয়…পরে আব্রাহাম হ্যাগারের কাছে গমন করলে সে গর্ভবতী হয়, এবং নিজের গর্ভ হয়েছে দেখে নিজ কত্রীকে (সারাহ) তুচ্ছ জ্ঞান করতে লাগলো” (জেনেসিস ১৬:৩-৪)
খুবই আগ্রোহদ্দীপক শ্লোক। এই শ্লোকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট; ১। হ্যাগার দাসী নয় বরং তাঁর সাথে আব্রাহামের বিয়ে হয়েছিলো এবং দ্বিতীয়ত, সারাহই এই বিয়ের উদ্যোগ নেন ।
এত ভালোবাসার সন্তান ইসহাক থাকতে কী দরকার ছিলো সারার ইবরাহীমকে আবার বিয়ে দেবার,তাও আবার আব্রাহামের এতটা বৃদ্ধ বয়সে? এই দরকারটা একটি দিকেই ইংগিত করে যে ইবরাহীম ও সারা দম্পতি ছিলেন নিঃসন্তান।তাঁর মানে ইসহাকের তখনো জন্ম হয়নি, হলে এই বিয়ের প্রয়োজন ছিলোনা। অতএব, জেনেসিস মতেই ইসহাক আব্রাহামের প্রথম কোরবানীর সময়ে বলা একমাত্র সন্তান কিছুতেই নন। তার আগেই তাঁর আরেক ভাই ছিলো।
ইসমাইল বিদ্বেষীরা এখানে তাদের দ্বিতীয় যুক্তি দেখায় যে, ইসমাঈল নামকাওয়াস্তে সন্তান হলেও সে আল্লাহর সেই প্রতিজ্ঞাত সন্তান বা জহীবুল্লাহ নয়। বরং, ইসহাকই ইবরাহিমের একমাত্র উত্তরাধিকারী, পুত্র এবং নবুওয়তের একমাত্র বৈধ উত্তরাধিকার। এর কারন, ইসহাক (আঃ) রাজকন্যা সারাহ (আঃ)র ঘরের ছেলে,আর ইসমাঈল (আঃ)সারাহরই মিশরীয় দাসী হাজেরা (আঃ)র ঘরের। দাসীর ঘরের ছেলে ইসমাঈল সম্মানে ও জাতে কিছুতেই ইসহাক (আঃ)র সমান নয়।
“ইশ্বর তাঁকে বললেন, ঐ বালক (ইশ্মায়েল) এবং ঐ দাসীটির ব্যাপারে তুমি ক্ষুব্ধ হয়ো না,সারা তোমাকে যা বলেছে,তাই কর, কারন ইসহাকের দ্বারাই তোমার বংশধারা রক্ষিত হবে। তবে ঐ দাসীপুত্রের দ্বারাও আমি এক জাতি উৎপন্ন কারন সেও তোমার সন্তান” (আদিপুস্তকঃ জেনেসিস .21:8-13.)
এই শ্লোকগুলোতে ইবরাহীম ও তাঁর প্রভুর কথায় কথায় স্ববিরোধীতা, তাদের সম্পর্কে মানুষের মনে কোন সুধারনার সৃষ্টি হওয়া বেশ কষ্টসাধ্য।
একবার আবরাহাম বলছেন প্রভু তাকে কোন সন্তান দেয়নি,আবার বলছেন একজন ক্রীতদাস হবে তাঁর উত্তরাধিকারী,তার মানে তার একজন সন্তান আছেই যাকে নিয়ে তিনি খুশী নন যেহেতু তার জন্ম এক ক্রীতদাসের ঘরে। ইবরাহীম খুশী হন বা না হন এই আয়াত থেকে এটা স্পষ্ট যে, ইসহাকই তাঁর একমাত্র ও বড় ছেলে নন, তার আগেই তাঁর এক পুত্র ছিলো যার নাম ইসমাঈল। প্রভু আর তাঁর নবী দুইজনই এখানে গ্রিক মিথলজির গডদের মত ভীষণ অনিরপেক্ষ যারা দাস দাসীদের মানুষ হিসেবে প্রাপ্ত অধিকার স্বীকার করে না, রাজরক্তই সব।অথচ তাওরাত,কোরান এইসব ঐশী ধর্মগ্রন্থগুলো নাযিল হবার কারনই ছিলো মানুষে মানুষে সমতা ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা।হ্যাঁ, মূল তাওরাত অবশ্যই এমন ছিলোনা, সেগুলো সমতা ও ন্যায্যতার অনুপম দলীলই ছিলো।
আবার প্রভু শ্লোকের যে অংশে বলছেন, কোন ক্রীতদাসের ছেলে তার(ইবরাহীমের) উত্তরাধিকারী হবে না,হবে তার ঔরসজাত সন্তান;এই অংশটুকু খুবই অযৌক্তিক।কারন সন্তান যে নারীর গর্ভেই হোক না কেন,দাসী বা রাজকন্যা, পুরুষ এক হলে ঔরসও একই হবে, জেনেসিস যেন জোর করে ইসমাঈলের ঔরসও বদলে দিতে চাচ্ছে। আবার প্রভু এমন এক সময়ে এই কথা বলছেন যখন দাসী গ্রহন করা,দাসীর ঘরে সন্তান হওয়া খুবই স্বাভাবিক বিষয়।
পুরো জেনেসিস জুড়েই ইসমাঈল (আঃ) ও তাঁর মা হাজেরার (আঃ) প্রতি বিদ্বেষ উগরে উগরে দেয়া হয়েছে, যেমন শুধুমাত্র ইসহাক(আঃ)কেই ইবরাহীম ভালোবাসতেন , “তোমার সেই একমাত্র সন্তানকে যাকে তুমি ভালোবাস,সেই ইসহাককে নাও…” ইশ্মায়েলকে ভালো না বাসার আরো যুক্তি হিসেবে মূলত আব্রাহামের হ্যাগার ও তার সন্তানকে নির্জন মরুভুমিতে নির্বাসনে পাঠানোর উদাহারন দেয়া হয়। আগের দিনে মূলত শাস্তি হিসেবে লোকদের দীপান্তরে বা নির্জন এলাকায় পাঠানো হতো। হ্যাগার আর সন্তানের নির্বাসনও তাই সারা আর তাঁর সন্তানের সাথে খারাপ আচরনের শাস্তি।
তো কী সেই খারাপ আচরন! জেনেসিস থেকে দুটো ঘটনা পাও্যা যায়। প্রথমটি,
‘…তো নিজের গর্ভ হয়েছে দেখে সে (হ্যাগার) নিজ কত্রীকে (সারাহ) তুচ্ছ জ্ঞান করতে লাগলো” (জেনেসিস ১৬:৩-৪)
কিন্তু আবার এই জেনেসিসেই আছে সারাহর দেয়া কষ্টে হ্যাগারই ঘর ছেড়ে মরুভুমিতে চলে গিয়েছিলেনন, এ ঞ্জেল গ্যাব্রিয়েলই তাকে সন্তানের(ইসমাঈলের) সুসংবাদ দিয়ে সারাহর ঘরে ফেরত পাঠান।
7 The angel of the Lord found Hagar near a spring in the desert; it was the spring that is beside the road to Shur.8 And he said, “Hagar, slave of Sarai, where have you come from, and where are you going?”( প্রভুর ফেরেশতা হ্যাগারকে মরুভুমির এক ঝর্ণার পাশে খুঁজে পান এবং জিজ্ঞেস করেন, ‘হ্যাগার, সা্রাইয়ের দাসী, তুমি কোথা থেকে এসেছো এবং কোথায় যাচ্ছ?”
“I’m running away from my mistress Sarai,” she answered.( আমি আমার মহিলা প্রভু সারাইয়ের কাছ থেকে পালাচ্ছি)
9 Then the angel of the Lord told her, “Go back to your mistress and submit to her.” 10 The angel added, “I will increase your descendants so much that they will be too numerous to count.” ( তারপর প্রভুর ফেরেশতা তাঁকে বললেন, “যাও তোমার কত্রীর কাছে নিজেকে সমর্পন করো”। তিনি আরো বললেন, “আমি তোমার বংশধরদের এমনভাবে বৃদ্ধি করবো যারা সংখ্যা গোনার জন্য অসংখ্য হবে’।
এঞ্জেল গ্যাব্রিয়েল বা জিব্রাইল সামান্য কোন ফেরেশতা নন, সরাসরি আল্লাহ ও নবীগণের মধ্যকার বার্তা আননয়নকারী। হ্যাগার এতই যদি খারাপ মহিলা হতেন গ্যাব্রিয়েল কক্ষনোই তাঁর সাথে কথা বলতেন না, গ্যাব্রিয়েলের সাথে কথা বলা প্রকারন্তরে আল্লাহর সাথে কথপোকথন। আর উনি উদ্দ্যশ্যহীন ঘোরাঘ্রিও করেন না, স্বয়ং আল্লাহ হ্যাগারের জন্য বার্তা পাঠিয়েছে বলেই তিনি এসেছেন। ইবরাহীমের বংশধারা আকাশের তারার মত অগনিত হবে এমন একটি প্রতিশ্রুতিমূলক আয়াত কোরানেও আছে, তবে তা ইবরাহীমকে উদ্দ্যশ্য করে।
শুধু তাই নয়, হ্যাগারের কষ্ট শুনে আল্লাহ তাঁকে সন্তান দেয়ায় এই সন্তানের নামও রাখা হয় ইসমায়েল যার অর্থ আল্লাহ যাকে শুনেছেন। তাওরাত যেন অনেক চাইলেও হ্যাগারের মর্যাদা নীচু করতে পারছে না, বরং যত বিশ্লেষন করবেন দেখবেন ততই তাঁর মর্যাদা। আর এ্রর সবই জেনেসিস মতে, কারন কোরানে একটিবারও হ্যাগার বা হাজেরা নামটি আসেনি,এই নাম শুধুই জেনেসিসেই পাওয়া যায়।
11 The angel of the Lord also said to her:
“You are now pregnant
and you will give birth to a son.
You shall name him Ishmael,
for the Lord has heard of your misery.
দ্বিতীয় ঘটনা,
“Abraham made a great feast on the day that Isaac was weaned. But Sarah saw the son of Hagar the Egyptian, whom she had borne to Abraham, laughing. So she said to Abraham, ‘Cast out this slave woman with her son, for the son of this slave woman shall not be heir with my son Isaac’” (Genesis 21:10).
আব্রাহাম শিশু ইসহাকের দুধ ছাড়ানো উপলক্ষ্যে এক বড় ভোজের আয়োজন করে। ওই ভোজে সারাহ খেয়াল করলো,মিশরীয় দাসীর সন্তান, যে কিনা সারাহর কারনে আব্রাহামের ঘরে জন্মলাভ করে, হাসছে। তাই সে আব্রাহামকে বললো, ‘নির্বাসনে পাঠাও এই দাসী মহিলাকে তাঁর সন্তান সহ কারন এই দাসী কিছুতেই আমার পুত্র ইসহাকের সাথে উওত্তরাধিকারী হতে পারে না।’ (জেনেসিস ২১ঃ১০)
ছোট ইসমাইলের হাসিতে সারাহর রেগে যাওয়ার কারন কী ছিলো। বাচ্চারাতো এমনিতেই না বুঝেই হাসে।
এর কারন হতে পারে দুটো; ১। সারাহর হিংসা, যেটা আমরা মুসলনমানেরাও মেনে নেই।
২। হাসির কারন ইসমাইলের ইসহাকের প্রত অবজ্ঞা। কিন্তু, অবজ্ঞার হাসি হাসতে একজন শিশুকে একটি নির্দিষ্ট বয়সে উপনীত হতে হয়, এবং তাই যদি হয় তার মানে অবশ্যই ইসমাইল ইসহাক থেকে বয়সে বড় ছিলেন সুতরাং ইসহাক কিছুতেই ইবরাহীমের প্রথম ও একমাত্র সন্তান নয়।
ইশ্মায়েল সম্বন্ধে জেনেসিসে আরো বলা হয়েছে,
12 He will be a wild donkey of a man;
his hand will be against everyone
and everyone’s hand against him,
and he will live in hostility
toward all his brothers.”
(“ইশ্মায়েল স্বাধীন এবং উদ্দাম হবে যেমন উদ্দাম হয় বন্য গাধা। সে সবার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে এবং সবাই হবে তার প্রতিপক্ষ।সে স্থান থেকে স্থানান্তরে ঘুরে বেড়াবে এবং ভাইদের বসতির কাছেই তাঁবু গাড়বে।“)(জেনেসিস ১৬:১২)
খেয়াল করে দেখবেন,পশ্চিমে দীর্ঘদিন আরবদের বন্য,বর্বর জাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে শুধু মাত্র এই শ্লোকের উওর ভিত্তি করেই।
কোরান জুড়ে এমন একটা আয়াতও দেখানো যাবে না যেখানে প্রভুরই প্রেরিত কোন নবী বা নবী পুত্রের প্রতি এই ধরনের কোন কুৎসা রটনা করা হয়েছে।ইশ্মায়েল নবী না হতে পারেন কিন্তু নবী পুত্রতো, নবী পুত্রের কোন দায়ভারই কী পিতা ইবরাহীমের উপর বর্তায় না? পরিবর্তিত জেনেসিস মতে যেন সব দোষ যেন শুধুই দাসী হ্যাগারের!
আবার, “তোমার সেই একমাত্র সন্তানকে যাকে তুমি ভালোবাস,সেই ইসহাককে নাও ও মোরিয়া দেশে যাও,সেখানে পর্বতগুলির মধ্যে একটির উপরে তাঁকে আমার উদ্দ্যেশ্যে বলি দাও” (আদি পুস্তক/জেনেসিস ২২:২)।
এখন চলুন এই মোরিয়া পাহাড়টা খুঁজে বের করি।বাইবেলে মোরিয়া পাহাড়ের কথা মোট দুইবার এসেছে; একবার ইসহাককে উৎসর্গ করার স্থান হিসেবে জেনেসিসে, আরেকবার ক্রনিকালসে(Chronicles) যেখানে নবী সলোমান(সুলাইমান)মোরিয়া পাহাড়ের উপর টেম্পেল মাউন্ট ( নির্মান নিয়ে।
কিন্তু,সমস্ত ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে টেম্পেল মাউন্টের পাহাড়ের নাম কখনোই মোরিয়া পর্বত ছিল না। মোরিয়া শব্দেরই আরবী মারওয়া। সাফা,মারওয়া বলে দুই পাহাড়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায় সেখানে যেখানে শিশু ইসমাঈল ও হাজেরা (আঃ)কে রেখে এসেছিলেন ইবরাহীম, আর বাইবেল ,কোরান দুইমতেই ইসহাক(আঃ)কে কখনোই আজকের মক্কার আসে পাশেও এসেছিলেন তা জানা যায় না!
তাদের চতূর্থ যুক্তিটি হল, কোরআনে সরাসরি বলা নেই যে ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পুত্র ইসমাঈলকেই (আঃ) কুরবানী করতে মনস্থির করেছিলেন। কথা সত্য,কোরানে সরাসরি বলা নেই যে ইসমাইল (আঃ)ই সেই ব্যক্তি যাকে কোরবানী দিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।
আমরা এতক্ষন জেনেসিসের সাথে ছিলাম,আসুন আমরা এবার তাদের দেয়া চারটি যুক্তিই কোরান দিয়ে খন্ডন করি,নিশ্চিত থাকুন,এখানে অন্তত কোন স্ববিরোধীতা পাবেন না। ইবরাহীমের সন্তান কোরবানীর ঘটনাটি কোরানের সূরা ৩৭ নং সূরা সাফফাতে এসেছে।
আয়াত নং
১০০ “হে আমার রব,আমাকে সৎকর্মশীল পুত্র দান করুন”
১০১ “অতঃপর তাকে আমি পরম ধৈর্যশীল একজন পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলাম”
১০২ “অতঃপর যখন সে তাঁর সাথে চলাফেরা করা বয়সে পৌছল,তখন সে বলল,”হে প্রিয় বতস,আমি স্বপ্নে দেখেছি যে ,আমি তোমাকে যবেহ করছি,অতএব দেখ তোমার কী অভিমত’;সে বলল,’হে আমার পিতা,আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে,আপনি তাই করুন।আমাকে ইন শা আলাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন’।“
১০৩ “অতঃপর তারা উভয়ে যখন আত্নসমর্পন করল এবং সে তাঁকে কাত করে শুইয়ে দিল”
এই আয়াতগুলোতে স্পষ্টত কোরান কোন নামই নেয়নি কিন্তু এই ঘটনা বর্ননা করেই একই সূরায় কোরান আবার বলছে,
“আর আমি তাঁকে ইসহাকের সুসংবাদ দিয়েছিলাম, তিনি সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত একজন নবী হবে,আর আমি তাঁকে ও ইসহাককে বরকত দান করেছিলাম,আর তাঁদের বংশধরদের মধ্যে কেউ ছিল সৎকর্মশীল এবং কেউ নিজের প্রতি স্পষ্ট যালিম”(সূরা সাফফাতঃ১১২-১১৩)।
এই আয়াতে স্পষ্ট যে ইসমাঈল (আঃ) যখন চলা ফেরা করার মত এবং নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করার বয়সে পৌছান তখন ইসহাক (আঃ)র দুনিয়ায় কোন অস্তিত্বই ছিলো না,তাঁর জন্মই হয় কোরবানীর পরীক্ষা ঘটে যাবার পর। ই
কোরান কিন্তু ইসহাককে (আঃ) বরকতময় নবী হিসেবে স্বীকার ও সম্মান দুইই করছে।
কোরানের অলংকারশৈলী (বালাগাহ) যদি বিবেচনায় নেই , কোরান তাদের জন্মের ক্রমানুসারে তাঁদের নাম উল্লেখ করেছে, যেমন,
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাকে বৃদ্ধ বয়সে দান করেছেন ইসমাঈল ও ইসহাককে” (সূরা ইবরাহীম:৩৯)
আবার দেখুন,
“অতঃপর আমি তাঁকে ইসহাকের জন্মের সুসংবাদ দিলাম এবং ইসহাকের পর ইয়াকুবেরও” (সূরা হূদঃ৭১)
ইয়াকুব (আঃ) ছিলেন ইসহাকের পুত্র ও ইবরাহীমের প্রপৌত্র,এই ইয়াকুব (আঃ)রই আরেক নাম ইজরায়েল।
কিন্তু জেনেসিস এখানে ভীষণ ভুল করেছে। জেনেসিস ২১.৫ নং শ্লোকমতে মতে ইসহাকের জন্মের সময় আব্রাহামের বয়স ছিলো ১০০ বছর আবার একই বইয়ের ১৬.১৬ নং শ্লোক মতে ইসমাঈলের জন্ম হয় আবারাহামের ৮৬ বছর বয়সে। এই হিসাবে জেনেসিস মতেই ইসমায়েল ইসহাকের চেয়ে ১৪ বছরের বড় ।
“নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরিক্ষা।আমি তার পরিবর্তে দিলাম যবেহ করার জন্য এক মহান জন্ত”(সূরা ইবরাহীম:১০৮)।
জেনেসিসে যেখানে ইশ্মায়েলকে বন্য গাধা বলছে সেখানে কোরান তাঁর পরিবর্তে জবাই হওয়া এক পশুকেই মহান বলে অভিহিত করেছে, কোরান সম্মান প্রদর্শনের এক দারুন উদাহারন। আল্লাহর জন্য জবাইকৃত পশু যদি হয় মহান তাঁর জন্য জবাই হতে যায় মানুষটি স্রষ্টার চোখে আরো বহু বহু মহান। অতএব, মর্যাদায় ইসমাইল (আঃ), ইসহাক (আঃ) থেকে মহান।
ইসহাক না ইসমাঈল কাকে কোরবানী করতে নির্ধারন করা হয়েছে তা শেষ করবো এই আয়াতটা দিয়ে।
“আমি তাঁর জন্যে এ বিষয়টি (কুরবানী) পরবর্তীদের জন্য রেখে দিয়েছি” (সূরা ইবরাহিমঃ১০৯)
তো কারা এই পরবর্তী? আবার ফিরে যাই সেখানে যেখান থেকে এই লেখা শুরু করেছিলাম।ইহুদী,খ্রীষ্টানরা কেউই কোরবানী দেয়না, দেই আমরা,মুসলমানরা,যারা ইসমাঈল (আঃ)র সরাসরি পরবর্তী বংশধরের(রাসূল সাঃ) উম্মত, ইসহাক(আঃ)র না।
সুতরাং ইসমাঈল (আঃ)ই কোরবানীর জন্য নির্ধারিত নবী,ইসহাক (আঃ) নয়।


You must be logged in to post a comment.