ইবরাহীম (আঃ) কাকে কুরবানি দিতে চেয়েছিলেন,ইসহাক না ইসমাঈল (আঃ)কে!

কানিজ ফাতেমা।

মুসলমানরা ছাড়া বর্তমানে ইহুদী,খ্রীষ্টান কেউই কোরবানী দেয়না। ইহুদীরা একসময় দিতো বটে,তাদের বইয়ে কোরবানেটের (Qorabanot) কথাও উল্লেখ আছে। এখন আর কোরবানী দেয় না, কারন দেখায় তাদের কোরবানী দেবার কোন জায়গা নেই (টেম্পেল মাউন্ট)। তাদের ধর্মতে, আব্রাহাম কোরবানী দিয়েছিলেন টেম্পেল মাউন্টে, আরবের মরুভূমিতে নয়। আবার কখনো টেম্পেল তৃতীয় (Temple Third/মসজিদুল আকাসা) (বর্বর) মুসলমানদের থেকে উদ্ধার হলে পরে উনারা আবার কোরবানী দিতে পারেন। আর খ্রীষ্টানদের কোরবানীর কোন বালাই কোন কালেই নেই। তারা আরো বিশ্বাস করে ইসমাইল নয় বরং কোরবানী দিতে আদিষ্ট ব্যক্তিটি ইসহাক (আঃ)।

আল্লাহ আব্রাহামের  দুইপুত্রের মধ্যে তাঁর প্রিয়তমটিকে নিজের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। এখন ইহুদী মতে কোরবানীর জন্য আদিষ্ট আল্লাহর সেই প্রিয়তম ছেলেটি ইসহাক (আঃ), ইহুদীদের আদি পিতা, পবিত্র পুরুষ। এবং মুসলমানদের মতে ইসমাইল (আঃ), রাসূল (সাঃ)র পুর্বপুরুষ।

কে ছিলেন সেই পবিত্র পুত্র তা প্রমান করতে ইহুদীদের প্রমান তাদের পবিত্রগ্রনথ Genesis/ তাওরাত আর মুসলমানদের আল কোরান।

তবে দুঃখজনক বিষয় হলো ইহুদিদের আদিপুস্তক  বর্তমানে আর তার আদিরুপে নেই, একটু খুঁজলেই তার অনেকগুলো পরিবর্তিত প্রতিলিপি পাওয়া যায়।

ইসমাইল (আঃ) কে তাঁর মর্যাদা দিতে নারাজগণ জেনেসিস থেকে ইসহাকের পক্ষে তিনটি ও কোরান থেকে একটি যুক্তি দেখায়।

প্রথমত ,জেনেসিসের এক তথ্যমতে কোরবানীর সময়ে ইসহাকই (আঃ)(Issac/আইজাক) ছিলেন ইবরাহীমের একমাত্র পুত্র, কারন ইসমাইল তখনো জন্মলাভই করেননি।
যেমন,

“তোমার সেই একমাত্র সন্তানকে, যাকে তুমি ভালোবাস, সেই ইসহাককে নাও। ওই মোরিয়া দেশে যাও,সেখানে পর্বতগুলির মধ্যে একটির উপরে তাঁকে আমার উদ্দ্যেশ্যে বলি দাও” (আদি পুস্তক/জেনেসিস ২২:২)

অথচ জেনেসিসেরই আরেক অংশে অন্যরকম বানী দেখা যায়, যেমন ইবরাহীম (আঃ)র এক প্রার্থনা ছিলো এমন…

“প্রভু, তুমি আমাকে কেন সন্তান দাওনি,আমার উত্তরাধিকারী হবে একজন ক্রীতদাস পরিবার জাত  । তখন প্রভু পরমেশ্বরের এই বানী তাঁর কাছে উপস্থিত হলঃ ঐ ব্যক্তি তোমার উত্তরাধিকারী হবে না, তোমার ঔরসজাত সন্তানই হবে তোমার উত্তরাধিকারী” (আদিপুস্তকঃ gen.15:1-4)

এখানে একজন ক্রীতদাসী মানে স্পষ্টতই হাজেরা (Hager)। তার মানে ইতিমধ্যেই হাজেরা ইবরাহীমের জীবনে প্রবেশ করেছে এবং তাঁর প্রবেশের কারন সারাইর (Sarai) সন্তানহীনতা। প্রভু পরমেশ্বর এখানে একজন ‘ঐ ব্যক্তির’ কথা বলছেন। এখানে ‘ওই ব্যক্তিটি’ কে? সেকি ইসমাইল? সেকি তখন জীবিত, নাকি তাঁর পৃথিবীতে আসার পূর্বেই তাঁকে নিয়ে প্রভু ও আব্রাহামের কথা চলছে?

তাহলে, নিম্নোক্ত শ্লোকটি দেখুন,

“সে (সারাহ) তার দাসী হ্যগারকে তার স্বামী আব্রাহামকে স্ত্রী হিসেবে দেয়…পরে আব্রাহাম হ্যাগারের কাছে গমন করলে সে গর্ভবতী হয়, এবং নিজের গর্ভ হয়েছে দেখে নিজ কত্রীকে (সারাহ) তুচ্ছ জ্ঞান করতে লাগলো” (জেনেসিস ১৬:৩-৪)

খুবই আগ্রোহদ্দীপক শ্লোক। এই শ্লোকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট; ১। হ্যাগার দাসী নয় বরং তাঁর সাথে আব্রাহামের বিয়ে হয়েছিলো এবং দ্বিতীয়ত, সারাহই এই বিয়ের উদ্যোগ নেন ।

ত ভালোবাসার সন্তান ইসহাক থাকতে কী দরকার ছিলো সারার ইবরাহীমকে আবার বিয়ে দেবার,তাও আবার আব্রাহামের এতটা বৃদ্ধ বয়সে? এই দরকারটা একটি দিকেই ইংগিত করে যে ইবরাহীম ও সারা দম্পতি ছিলেন নিঃসন্তান।তাঁর মানে ইসহাকের তখনো জন্ম হয়নি, হলে এই বিয়ের প্রয়োজন ছিলোনা। অতএব, জেনেসিস মতেই ইসহাক আব্রাহামের প্রথম কোরবানীর সময়ে বলা একমাত্র সন্তান কিছুতেই নন। তার আগেই তাঁর আরেক ভাই ছিলো।

ইসমাইল বিদ্বেষীরা এখানে তাদের দ্বিতীয় যুক্তি দেখায় যে, ইসমাঈল নামকাওয়াস্তে সন্তান হলেও সে আল্লাহর সেই প্রতিজ্ঞাত সন্তান বা জহীবুল্লাহ নয়। বরং, ইসহাকই ইবরাহিমের একমাত্র উত্তরাধিকারী, পুত্র এবং নবুওয়তের একমাত্র বৈধ উত্তরাধিকার।  এর কারন, ইসহাক (আঃ) রাজকন্যা সারাহ (আঃ)র ঘরের ছেলে,আর ইসমাঈল (আঃ)সারাহরই মিশরীয় দাসী হাজেরা (আঃ)র ঘরের। দাসীর ঘরের ছেলে ইসমাঈল সম্মানে ও জাতে কিছুতেই ইসহাক (আঃ)র সমান নয়।

“ইশ্বর তাঁকে বললেন, ঐ বালক (ইশ্মায়েল) এবং ঐ দাসীটির ব্যাপারে তুমি ক্ষুব্ধ হয়ো না,সারা তোমাকে যা বলেছে,তাই কর, কারন ইসহাকের দ্বারাই তোমার বংশধারা রক্ষিত হবে। তবে ঐ দাসীপুত্রের দ্বারাও আমি এক জাতি উৎপন্ন কারন সেও তোমার সন্তান” (আদিপুস্তকঃ জেনেসিস .21:8-13.)

এই শ্লোকগুলোতে ইবরাহীম ও তাঁর প্রভুর কথায় কথায় স্ববিরোধীতা, তাদের সম্পর্কে মানুষের মনে কোন সুধারনার সৃষ্টি হওয়া বেশ কষ্টসাধ্য।
একবার আবরাহাম বলছেন প্রভু তাকে কোন সন্তান দেয়নি,আবার বলছেন একজন ক্রীতদাস হবে তাঁর উত্তরাধিকারী,তার মানে তার একজন সন্তান আছেই যাকে নিয়ে তিনি খুশী নন যেহেতু তার জন্ম এক ক্রীতদাসের ঘরে। ইবরাহীম খুশী হন বা না হন এই আয়াত থেকে এটা স্পষ্ট যে, ইসহাকই তাঁর একমাত্র ও বড় ছেলে নন, তার আগেই তাঁর এক পুত্র ছিলো যার নাম ইসমাঈল। প্রভু আর তাঁর নবী দুইজনই এখানে গ্রিক মিথলজির গডদের মত ভীষণ অনিরপেক্ষ যারা দাস দাসীদের মানুষ হিসেবে প্রাপ্ত অধিকার স্বীকার করে না, রাজরক্তই সব।অথচ তাওরাত,কোরান এইসব ঐশী ধর্মগ্রন্থগুলো নাযিল হবার কারনই ছিলো মানুষে মানুষে সমতা ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা।হ্যাঁ, মূল তাওরাত অবশ্যই এমন ছিলোনা, সেগুলো সমতা ও ন্যায্যতার অনুপম দলীলই ছিলো।

আবার প্রভু শ্লোকের যে অংশে বলছেন, কোন ক্রীতদাসের ছেলে তার(ইবরাহীমের) উত্তরাধিকারী হবে না,হবে তার ঔরসজাত সন্তান;এই অংশটুকু খুবই অযৌক্তিক।কারন সন্তান যে নারীর গর্ভেই হোক না কেন,দাসী বা রাজকন্যা, পুরুষ এক হলে ঔরসও একই হবে, জেনেসিস যেন জোর করে ইসমাঈলের ঔরসও বদলে দিতে চাচ্ছে। আবার প্রভু এমন এক সময়ে এই কথা বলছেন যখন দাসী গ্রহন করা,দাসীর ঘরে সন্তান হওয়া খুবই স্বাভাবিক বিষয়।

পুরো জেনেসিস জুড়েই ইসমাঈল (আঃ) ও তাঁর মা হাজেরার (আঃ)  প্রতি বিদ্বেষ উগরে উগরে দেয়া হয়েছে, যেমন শুধুমাত্র ইসহাক(আঃ)কেই ইবরাহীম ভালোবাসতেন , “তোমার সেই একমাত্র সন্তানকে যাকে তুমি ভালোবাস,সেই ইসহাককে নাও…” ইশ্মায়েলকে ভালো না বাসার আরো যুক্তি হিসেবে মূলত আব্রাহামের হ্যাগার ও তার সন্তানকে নির্জন মরুভুমিতে নির্বাসনে পাঠানোর উদাহারন দেয়া হয়। আগের দিনে মূলত শাস্তি হিসেবে লোকদের দীপান্তরে বা নির্জন এলাকায় পাঠানো হতো। হ্যাগার আর সন্তানের নির্বাসনও তাই সারা আর তাঁর সন্তানের সাথে খারাপ আচরনের শাস্তি।

তো কী সেই খারাপ আচরন! জেনেসিস থেকে দুটো ঘটনা পাও্যা যায়। প্রথমটি,

‘…তো নিজের গর্ভ হয়েছে দেখে সে (হ্যাগার) নিজ কত্রীকে (সারাহ) তুচ্ছ জ্ঞান করতে লাগলো” (জেনেসিস ১৬:৩-৪)

কিন্তু আবার এই জেনেসিসেই আছে সারাহর দেয়া কষ্টে হ্যাগারই ঘর ছেড়ে মরুভুমিতে চলে গিয়েছিলেনন, এ ঞ্জেল গ্যাব্রিয়েলই তাকে সন্তানের(ইসমাঈলের) সুসংবাদ দিয়ে সারাহর ঘরে ফেরত পাঠান।

The angel of the Lord found Hagar near a spring in the desert; it was the spring that is beside the road to Shur.And he said, “Hagar, slave of Sarai, where have you come from, and where are you going?”( প্রভুর ফেরেশতা হ্যাগারকে মরুভুমির এক ঝর্ণার পাশে খুঁজে পান এবং জিজ্ঞেস করেন, ‘হ্যাগার, সা্রাইয়ের দাসী, তুমি কোথা থেকে এসেছো এবং কোথায় যাচ্ছ?” 

“I’m running away from my mistress Sarai,” she answered.( আমি আমার মহিলা প্রভু সারাইয়ের কাছ থেকে পালাচ্ছি)

Then the angel of the Lord told her, “Go back to your mistress and submit to her.” 10 The angel added, “I will increase your descendants so much that they will be too numerous to count.” ( তারপর প্রভুর ফেরেশতা তাঁকে বললেন, “যাও তোমার কত্রীর কাছে নিজেকে সমর্পন করো”। তিনি আরো বললেন, “আমি তোমার বংশধরদের এমনভাবে বৃদ্ধি করবো যারা সংখ্যা গোনার জন্য অসংখ্য হবে’।

এঞ্জেল গ্যাব্রিয়েল বা জিব্রাইল সামান্য কোন ফেরেশতা নন, সরাসরি আল্লাহ ও নবীগণের মধ্যকার বার্তা আননয়নকারী। হ্যাগার এতই যদি খারাপ মহিলা হতেন গ্যাব্রিয়েল কক্ষনোই তাঁর সাথে কথা বলতেন না, গ্যাব্রিয়েলের সাথে কথা বলা প্রকারন্তরে আল্লাহর সাথে কথপোকথন। আর উনি উদ্দ্যশ্যহীন ঘোরাঘ্রিও করেন না, স্বয়ং আল্লাহ হ্যাগারের জন্য বার্তা পাঠিয়েছে বলেই তিনি এসেছেন। ইবরাহীমের বংশধারা আকাশের তারার মত অগনিত হবে এমন একটি প্রতিশ্রুতিমূলক আয়াত কোরানেও আছে, তবে তা ইবরাহীমকে উদ্দ্যশ্য করে।

শুধু তাই নয়, হ্যাগারের কষ্ট শুনে আল্লাহ তাঁকে সন্তান দেয়ায় এই সন্তানের নামও রাখা হয় ইসমায়েল যার অর্থ আল্লাহ যাকে শুনেছেন। তাওরাত যেন অনেক চাইলেও হ্যাগারের মর্যাদা নীচু করতে পারছে না, বরং যত বিশ্লেষন করবেন দেখবেন ততই তাঁর মর্যাদা। আর এ্রর সবই জেনেসিস মতে, কারন কোরানে একটিবারও হ্যাগার বা হাজেরা নামটি আসেনি,এই নাম শুধুই জেনেসিসেই পাওয়া যায়।

1The angel of the Lord also said to her:

“You are now pregnant
    and you will give birth to a son.
You shall name him Ishmael,
    for the Lord has heard of your misery.

দ্বিতীয় ঘটনা,

“Abraham made a great feast on the day that Isaac was weaned. But Sarah saw the son of Hagar the Egyptian, whom she had borne to Abraham, laughing. So she said to Abraham, ‘Cast out this slave woman with her son, for the son of this slave woman shall not be heir with my son Isaac’” (Genesis 21:10).

আব্রাহাম শিশু ইসহাকের দুধ ছাড়ানো উপলক্ষ্যে এক বড় ভোজের আয়োজন করে। ওই ভোজে সারাহ খেয়াল করলো,মিশরীয় দাসীর সন্তান, যে কিনা সারাহর কারনে আব্রাহামের ঘরে জন্মলাভ করে, হাসছে। তাই সে আব্রাহামকে বললো, ‘নির্বাসনে পাঠাও এই দাসী মহিলাকে তাঁর সন্তান সহ কারন এই দাসী কিছুতেই আমার পুত্র ইসহাকের সাথে উওত্তরাধিকারী হতে পারে না।’ (জেনেসিস ২১ঃ১০)

ছোট ইসমাইলের হাসিতে সারাহর রেগে যাওয়ার কারন কী ছিলো। বাচ্চারাতো এমনিতেই না বুঝেই হাসে।

এর কারন হতে পারে দুটো; ১। সারাহর হিংসা, যেটা আমরা মুসলনমানেরাও মেনে নেই।

২। হাসির কারন ইসমাইলের ইসহাকের প্রত অবজ্ঞা। কিন্তু, অবজ্ঞার হাসি হাসতে একজন শিশুকে একটি নির্দিষ্ট বয়সে উপনীত হতে হয়, এবং তাই যদি হয় তার মানে অবশ্যই ইসমাইল ইসহাক থেকে বয়সে বড় ছিলেন সুতরাং ইসহাক কিছুতেই ইবরাহীমের প্রথম ও একমাত্র সন্তান নয়।

ইশ্মায়েল সম্বন্ধে জেনেসিসে আরো বলা হয়েছে,

12 He will be a wild donkey of a man;
    his hand will be against everyone
    and everyone’s hand against him,
and he will live in hostility
    toward all his brothers.”

(“ইশ্মায়েল স্বাধীন এবং উদ্দাম হবে যেমন উদ্দাম হয় বন্য গাধা। সে সবার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে এবং সবাই হবে তার প্রতিপক্ষ।সে স্থান থেকে স্থানান্তরে ঘুরে বেড়াবে এবং ভাইদের বসতির কাছেই তাঁবু গাড়বে।“)(জেনেসিস ১৬:১২)

খেয়াল করে দেখবেন,পশ্চিমে দীর্ঘদিন আরবদের বন্য,বর্বর জাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে শুধু মাত্র এই শ্লোকের উওর ভিত্তি করেই।

কোরান জুড়ে এমন একটা আয়াতও দেখানো যাবে না যেখানে প্রভুরই প্রেরিত কোন নবী বা নবী পুত্রের প্রতি এই ধরনের কোন কুৎসা রটনা করা হয়েছে।ইশ্মায়েল নবী না হতে পারেন কিন্তু নবী পুত্রতো, নবী পুত্রের কোন দায়ভারই কী পিতা ইবরাহীমের উপর বর্তায় না? পরিবর্তিত জেনেসিস মতে যেন সব দোষ যেন শুধুই দাসী হ্যাগারের!

আবার, “তোমার সেই একমাত্র সন্তানকে যাকে তুমি ভালোবাস,সেই ইসহাককে নাও ও মোরিয়া দেশে যাও,সেখানে পর্বতগুলির মধ্যে একটির উপরে তাঁকে আমার উদ্দ্যেশ্যে বলি দাও” (আদি পুস্তক/জেনেসিস ২২:২)।

এখন চলুন এই মোরিয়া পাহাড়টা খুঁজে বের করি।বাইবেলে মোরিয়া পাহাড়ের কথা মোট দুইবার এসেছে; একবার ইসহাককে উৎসর্গ করার স্থান হিসেবে জেনেসিসে, আরেকবার ক্রনিকালসে(Chronicles) যেখানে নবী সলোমান(সুলাইমান)মোরিয়া পাহাড়ের উপর টেম্পেল মাউন্ট ( নির্মান নিয়ে।

কিন্তু,সমস্ত ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে টেম্পেল মাউন্টের পাহাড়ের নাম কখনোই মোরিয়া পর্বত ছিল না। মোরিয়া শব্দেরই আরবী মারওয়া। সাফা,মারওয়া বলে দুই পাহাড়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায় সেখানে যেখানে শিশু ইসমাঈল ও হাজেরা (আঃ)কে রেখে এসেছিলেন ইবরাহীম, আর বাইবেল ,কোরান দুইমতেই ইসহাক(আঃ)কে কখনোই আজকের মক্কার আসে পাশেও এসেছিলেন তা জানা যায় না!

তাদের চতূর্থ যুক্তিটি হল, কোরআনে সরাসরি বলা নেই যে ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পুত্র ইসমাঈলকেই (আঃ) কুরবানী করতে মনস্থির করেছিলেন। কথা সত্য,কোরানে সরাসরি বলা নেই যে ইসমাইল (আঃ)ই সেই ব্যক্তি যাকে কোরবানী দিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।

আমরা এতক্ষন জেনেসিসের সাথে ছিলাম,আসুন আমরা এবার তাদের দেয়া চারটি যুক্তিই কোরান দিয়ে খন্ডন করি,নিশ্চিত থাকুন,এখানে অন্তত কোন স্ববিরোধীতা পাবেন না। ইবরাহীমের সন্তান কোরবানীর ঘটনাটি কোরানের সূরা ৩৭ নং সূরা সাফফাতে এসেছে।

আয়াত নং
১০০ “হে আমার রব,আমাকে সৎকর্মশীল পুত্র দান করুন”
১০১ “অতঃপর তাকে আমি পরম ধৈর্যশীল একজন পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলাম”
১০২ “অতঃপর যখন সে তাঁর সাথে চলাফেরা করা বয়সে পৌছল,তখন সে বলল,”হে প্রিয় বতস,আমি স্বপ্নে দেখেছি যে ,আমি তোমাকে যবেহ করছি,অতএব দেখ তোমার কী অভিমত’;সে বলল,’হে আমার পিতা,আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে,আপনি তাই করুন।আমাকে ইন শা আলাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন’।“
১০৩ “অতঃপর তারা উভয়ে যখন আত্নসমর্পন করল এবং সে তাঁকে কাত করে শুইয়ে দিল”

এই আয়াতগুলোতে স্পষ্টত কোরান কোন নামই নেয়নি কিন্তু এই ঘটনা বর্ননা করেই একই সূরায় কোরান আবার বলছে,

“আর আমি তাঁকে ইসহাকের সুসংবাদ দিয়েছিলাম, তিনি সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত একজন নবী হবে,আর আমি তাঁকে ও ইসহাককে বরকত দান করেছিলাম,আর তাঁদের বংশধরদের মধ্যে কেউ ছিল সৎকর্মশীল এবং কেউ নিজের প্রতি স্পষ্ট যালিম”(সূরা সাফফাতঃ১১২-১১৩)।

এই আয়াতে স্পষ্ট যে ইসমাঈল (আঃ) যখন চলা ফেরা করার মত এবং নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করার বয়সে পৌছান তখন ইসহাক (আঃ)র দুনিয়ায় কোন অস্তিত্বই ছিলো না,তাঁর জন্মই হয় কোরবানীর পরীক্ষা ঘটে যাবার পর। ই

কোরান কিন্তু ইসহাককে (আঃ) বরকতময় নবী হিসেবে স্বীকার ও সম্মান দুইই করছে।
কোরানের অলংকারশৈলী (বালাগাহ) যদি বিবেচনায় নেই , কোরান তাদের জন্মের ক্রমানুসারে তাঁদের নাম উল্লেখ করেছে,  যেমন,

“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাকে বৃদ্ধ বয়সে দান করেছেন ইসমাঈল ও ইসহাককে” (সূরা ইবরাহীম:৩৯)

আবার দেখুন,

“অতঃপর আমি তাঁকে ইসহাকের জন্মের সুসংবাদ দিলাম এবং ইসহাকের পর ইয়াকুবেরও” (সূরা হূদঃ৭১)

ইয়াকুব (আঃ) ছিলেন ইসহাকের পুত্র ও ইবরাহীমের প্রপৌত্র,এই ইয়াকুব (আঃ)রই আরেক নাম ইজরায়েল।
কিন্তু জেনেসিস এখানে ভীষণ ভুল করেছে। জেনেসিস ২১.৫ নং শ্লোকমতে  মতে ইসহাকের জন্মের সময় আব্রাহামের বয়স ছিলো ১০০ বছর আবার একই বইয়ের ১৬.১৬ নং শ্লোক মতে ইসমাঈলের জন্ম হয় আবারাহামের ৮৬ বছর বয়সে। এই হিসাবে জেনেসিস মতেই ইসমায়েল ইসহাকের চেয়ে ১৪ বছরের বড় ।

“নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরিক্ষা।আমি তার পরিবর্তে দিলাম যবেহ করার জন্য এক মহান জন্ত”(সূরা ইবরাহীম:১০৮)।

জেনেসিসে যেখানে ইশ্মায়েলকে বন্য গাধা বলছে সেখানে কোরান তাঁর পরিবর্তে জবাই হওয়া এক পশুকেই মহান বলে অভিহিত করেছে, কোরান সম্মান প্রদর্শনের এক দারুন উদাহারন। আল্লাহর জন্য জবাইকৃত পশু যদি হয় মহান তাঁর জন্য জবাই হতে যায় মানুষটি স্রষ্টার চোখে আরো বহু বহু মহান। অতএব, মর্যাদায় ইসমাইল (আঃ), ইসহাক (আঃ) থেকে মহান।

ইসহাক না ইসমাঈল কাকে কোরবানী করতে নির্ধারন করা হয়েছে তা শেষ করবো এই আয়াতটা দিয়ে।

আমি তাঁর জন্যে বিষয়টি (কুরবানী) পরবর্তীদের জন্য রেখে দিয়েছি” (সূরা ইবরাহিমঃ১০৯)

তো কারা এই পরবর্তী? আবার ফিরে যাই সেখানে যেখান থেকে এই লেখা শুরু করেছিলাম।ইহুদী,খ্রীষ্টানরা কেউই কোরবানী দেয়না, দেই আমরা,মুসলমানরা,যারা ইসমাঈল (আঃ)র সরাসরি পরবর্তী বংশধরের(রাসূল সাঃ) উম্মত, ইসহাক(আঃ)র না।

সুতরাং ইসমাঈল (আঃ)ই কোরবানীর জন্য নির্ধারিত নবী,ইসহাক (আঃ) নয়।

যে নবীর নাম স্বয়ং আল্লাহ রেখেছেন,ইয়াহিয়া (আঃ)

কানিজ ফাতেমা

আমাদের দেশে ইয়াহিয়া নামটার খুব কুখ্যাতি থাকলেও আল কোরানে এটি একটি সম্মানিত নাম।স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই নাম রাখেন আর এটি এমন এক নাম যা এর পূর্বে কেউ কখনো শুনেনি,রাখাতো দূরের কথা।যাকারিয়া (আঃ) যখন মরিয়ম (আঃ)কে তাঁর কক্ষে দেখতে যেতেন তখন তিনি দেখতে পেতেন সেই ঘর খাবার দাবার আর এমন ফলফলাদিতে ভর্তি যা সেই মৌসুমে পাওয়া যেত না,তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতেন ,মরিয়ম,এসব কোথা থেকে?মরিয়ম বলতেন, ‘এসব আল্লাহর থেকে আসে,আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বেহিসাব রিযিক দান করেন’
এসব দেখে বৃদ্ধ নবী যাকারিয়ার বুকটা হাহা করে উঠে,তিনি যে নিঃসন্তান,আল্লাহ রব্বুল আলামীন যে তাকে এখনো কোন সন্তান দেননি।সন্তান প্রাপ্তিতে দেরী নবীদের একটা সাধারন পরীক্ষা।এই পরীক্ষা দিয়েছেন ইমরান(আঃ),ইবরাহীম(আঃ),শেষ নবী মুহাম্মদ(সাঃ)।তিনি আবারও আল্লাহর দরবারে হাত তুললেন,সূরা মরিয়মের তার সেই বিখ্যাত দোয়া,

‘৩।যখন তিনি তাঁর রবকে নিভৃতে ডেকেছিলেন
৪। তিনি বলেছিলেন,হে আমার রব!আমার অস্থি দূর্বল হয়ে পরেছে এবং বার্ধক্যের দরুন মাথার চুলে শুভ্রতা ছড়িয়ে পরেছ।“হে আমার রব আমিতো আপনাকে ডেকে কখনো বিফল মনোরথ হইনি।নিশচয়ই তুমি সব শোনো ও দেখো।‘
৫।আর আমি আশংকা করছি আমার স্বজন বর্গ থেকে আমার পরে এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা,অতএব ,আপনি আপনার তরফ থকে আমাকে দান করুন একজন উত্তরাধিকারী;হে আমার রব তাকে সন্তোষভাজন করুন।‘(সূরা মরিয়ম ৩-৫)

তিনি আরো বলেছেন,

‘হে আমার পালনকর্তা!তোমার নিকট থেকে আমাকে পুতঃ পবিত্র সন্তান দান কর,নিশচয়ই তুমি প্রার্থনা শ্রবণকারী।‘(সূরা আল ইমরান ৩৮)

অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার পর আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলেন, ‘অতঃপর আমি তাঁর দোয়া কবুল করলাম,তাকে দান করেছিলাম ইয়াহিয়া এবং তার জন্য তার স্ত্রীকে প্রসবযোগ্য করেছিলাম।(সূরা আল আম্বিয়াঃ৯০)

জীবরাঈল(আঃ) তাঁকে সেই সুসংবাদ শোনালেন, “হে যাকারিয়া,আমি তোমাকে একটি পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছি,তার নাম ইয়াহিয়া।এর আগে কাউকে আমি এই নাম দেইনি।“(সূরা মরিয়ম ৭)

সূরা মরিয়মের ১২-১৫ আয়াত এবং ৩০-৩৩ আয়াতে একই ঢঙ্গে,একই আঙ্গিকে কোরান প্রথমে ইয়াহিয়া (আঃ) ও পরে ঈসা(আঃ)র সাথে আমাদের সপ্রশংসিত পরিচয় করায়। পবিত্র কোরানে তাঁর নামউল্লেখিত আয়াতগুলোতে (সর্বমোট ৫ বার) তাঁর চরিত্র ও হৃদয়ের কোমলতার উল্লেখ করে ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে,তাঁকে আল্লাহ দৃঢ় ভাবে এক কিতাব ধারন করতে বলেছেন,এই কিতাব ছিলো মূসা (আঃ)র উপর নাযিলকৃত তাওরাত। সম্পর্কের দিক দিয়ে ইয়াহিয়া (আঃ) ছিলেন ঈসা (আঃ)র মামা।

আমি সবসময়ই ভেবেছি,মরিয়ম (আঃ) যখন একাকী সন্তান প্রসবের তীব্র কষ্ট পেয়েছেন তখন ইয়াহিয়া(আঃ)র ভূমিকাটা কী ছিলো কিংবা ঈসা (আঃ)র ধর্ম প্রচারের সময়। ইয়াহিয়া(আঃ)র কথা যতটা বাইবেলে এসেছে ততোটা কোরানে নেই,স্বাভাবিক যেহেতু তিনি ঈসা (আ)র সরাসরি পূর্ববর্তী নবী,তাঁদের দুইজনের মাঝখানে আর কোন নবী নেই এবং তিনি তাঁর আগমন বার্তা ঘোষণাকারী।
তবে বাইবেলে ইয়াহিয়া (আ;)কে আমরা খুঁজে পাবো সম্পূর্ন ভিন্ন এক নামে,জন দ্যা ব্যপ্টিস্ট(John the Baptist)।তাহলে বাইবেল ও কোরানে কী এখানে বড় ধরনের কোন পার্থক্য হলো?চলুন বাকী সময়টা আমরা একটু বাইবেলের (New Testament) সাথে কাটাই।
বাইবেল মতে জন(John) নামটাও ঈশ্বর প্রদত্ত,এর আগে এই নামের কোন মানুষ ছিলো ছিলো না, ‘His name was divinely given. It was to be ‘John’’ (LK.1:13) Which derives from a Hebrew term signifies ‘Jehovah is gracious’.

এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে জন(John) নামটা এসেছে হিব্রু ‘জেহোভাহ’ থেকে, খেয়াল করে দেখবেন ভারতীয় যোগ ব্যায়ামকে পশ্চিমে বলা হয় ইয়োগা(Yoga),যশ চোপড়াকে ইয়াশ চোপড়া(Yash) চোপড়া,ঠিক তেমনি বাইবেলে ইয়াকুব (আ;)কে বলা হয় জ্যাকব(Jacob),ইউসুফ (আঃ) কে জোসেফ(Joseph),ঈসা (আঃ)কে(Jessus)। হিব্রু ও আরবী দুটোই সেমেটিক ভাষা হলেও দীর্ঘদিন গ্রীক শাসনাধীন থাকা হিব্রু ভাষার সাথে তার উচ্চারনগত পার্থক্য রয়েছে তাই হিব্রুতে যা ‘জেহোভাহ’ বলে আরবীতে তাই ইয়াহিয়া(আঃ)।

তবে তাওরাতে (Old Testament) তাকে সরাসরি ইয়াহিয়া নাম পাওয়া যায় YaHuWah (Malakiy 3:1-6,Old Tesatment Hebrew Lexicon)
এছাড়া বাইওবেলে তার আরও নাম পাওয়া যায়,যেমন Jediah, Yohanan, সুতরাং জনই বাইবেলের একমাত্র নাম নয়।তাই কোরান আর বাইবেলে অন্তত তাঁর নাম নিয়ে কোন সমস্যা নেই।
এখন আসি তাঁর নামের ‘দ্যা ব্যপ্টিস্ট’ অংশ নিয়ে। ক্যাথলিক চার্চ অনুসারে ব্যপ্টিস্ট মানে এমন ব্যক্তি যে কোন ব্যক্তিকে পবিত্র পানি দিয়ে ব্যপ্টিজম করায়,বলা হয়ে থাকে জন যীশুর ব্যপটিজম করিয়েছিলেন তাই তাঁর নাম জন দ্যা ব্যপ্টিস্ট। কিন্তু Luke.1:26 মতে জন জেসাসের মাত্র ৬ মাসের বড়,তাছাড়া জন বেড়ে উঠেছেন তাঁর জন্মস্থান জুডিয়া,বর্তমান হেবরন (Hebron) শহরের বাহিরে। ‘In those days came John the Baptist, preaching in the wilderness of Judeah…’(Mathew 3:1) । এখানে wilderness বলতে মরুভূমি বা জঙ্গল দুই বুঝাতে পারে।

একজন সম্ভ্রান্ত নবী পরিবারের সদস্য যারা বংশানুক্রমে উপাসনলয়ের প্রধান (ইমরান ও যাকারিয়া (আঃ) দুইজনই প্রধান পুরোহিত ছিলেন) হয়ে থাকে তাহলে তিনি শহর ছেড়ে জঙ্গলে কেন গেলেন?
এর কারন ছিলো তৎকালীন সম্রাট হেরোড দ্যা গ্রেটের (ক্রীষ্টপূর্ব ৪০ থেকে ৪ সাল)ক্ষমতালিপ্সা ও অত্যাচার।জুডিয়া তখন পরিচালিত হতো জেরুসালেমের এক রাজকীয় পরিবারের মাধ্যমে যারা ছিল সরাসরি নবী দাউদের বংশধর।কিন্তু রোমানরা জুডিয়া দখল করে নেয় তবে এত দূর থেকে শাসন করার বদলে তারা তাদের পছন্দমত একজনকে রাজা হিসেবে বসিয়ে যায়,সেই রাজাই হল হেরোড।কিন্তু জুডিয়া বাসী এই অইহুদী রাজাকে মেনে নেয়নি।ইয়াহিয়া(আ)র পিতা যাকারিয়া (আঃ)কে কেন্দ্র করে বিরোধিতা বাড়তে থাকে তাই হেরোড তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
ঈসা (আ)র জন্মের আগেই তিনি জ্যোতিষীদের থেকে তার আগমন আর তার সাম্রাজ্যের প্রতি তার হুমকি হয়ে ওঠার ব্যপারে আগাম জানতে পারে।জেনেই সে বেথেলহেমের সমস্ত সদ্য প্রসূত থেকে দুই বছর বয়সী সমস্ত ছেলে শিশু হত্যা করার নির্দেশ জারি করে,মারা যায় হাজার হাজার শিশু।যদিও এই ভবিষ্যৎ বানী জানার আগেই ঈসা(আঃ)র জন্ম হয়ে যায় এবং উনি সেই সময় বেথেলহেম শহরেও ছিলেন না,কোরান মতে ঈসা (আঃ)র জন্ম হয় এক নির্জন নদীর পাড়ে।ছেলেকে বাঁচাতে যাকারিয়া (আ;)র স্ত্রী এলিজাবেথ (মরিয়ম (আঃ)র খালা) শিশুপুত্র ইয়াহিয়াকে নিয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যান এবং ইয়াহিয়া (আঃ) সেখানেই বেড়ে উঠেন।বাইবেলে (Gospel,Matthew) এই হত্যাযজ্ঞ Mass Killing of the Innocents হিসেবে বিধৃত আছে।
হেরোডের শাসনামলে তার রাজত্ব জর্ডান থেকে ফিলিস্তিন পর্যন্ত বিস্মৃত হয়, পরিনত হয় ব্যবসায় বানিজ্যে অন্যতম সেরা নগরীতে কিন্তু অন্য সব শক্তিশালী সম্রাটের মত সেও ছিলো প্রচন্ড ক্ষমতা পাগল ও অত্যাচারী। এখন কথা হলো এত অত্যাচারী আর নবীর খুনী হেরডকে ইতিহাসে দ্যা গ্রেট বা মহান বলে অভিহিত করা হয় কেন দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে কম বেশী উন্নয়নতো সবাই কর্রে? এর কারনটা একই সাথে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক। হেরোড ইহুদীদের পবিত্র স্থান সুলাইমান (আঃ) নির্মিত পবিত্র টেম্পেল মাউন্টের (the Holy Mount Temple) আদি রুপ ফিরিয়ে আনেন,যা কিনা ব্যবিলনীয়রা সম্রাট নেব্যুচ্যান্ডারের অধীনে থেকে জেরুজালেম জয় করার সময় সম্পুর্ণ ধ্বংস করে ৫৮৬ খ্রীষ্টপূর্বে।যদিও ৫১৬ খ্রীষ্টপূর্বে সেকেন্ড টেম্পেল একদল ইহুদী অতি সাধারন ভাবে পুনঃনির্মান করে কিন্তু যেহেতু হেরোডের বিশাল সব স্থাপনা নির্মানের খ্যাতি ছিলো সে সংস্কার করে সুলাইমান (আঃ)র নির্মিত টেম্পেলের সেই আদিরুপ ফিরিয়ে আনে,ফিরিয়ে আনে তার হারানো জৌলুস ও বিশালত্ব। বর্তমানে এটি দ্বিতীয় টেম্পেল নামে পরিচিত,যদিও এখন এই মন্দিরের পশ্চিম দিকের এক দেয়াল ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই কারন রোমানরা ৭০ খ্রীষ্টাব্দে এই মন্দির সম্পূর্ন ধ্বংস করে পশ্চিমের এই দেয়াল ছাড়া।ইহুদীরা বর্তমানে এই ভগ্ন দেয়ালের পাশেই প্রার্থনায় সমবেত হয়,নতুন করে আর সংস্কারও করেনা কারন তারা স্বপ্ন দেখে এক তৃতীয় টেম্পেলের যা কিনা আল আকসা মসজিদের জায়গায় নির্মিত হবে,সেই পর্যন্ত তারা অপেক্ষায় থাকবে।
এই দেয়াল মুসলমানদের কাছেও বিশেষ মর্যাদার এবং হে’ইত আল বোরাক নামে পরিচিত কারন মেরাজের সময় রাসূল (সঃ)র বাহন বোরাককে এই দেয়ালের সাথেই বেঁধে রাখা হয়েছিলো। হেরোড ইজরাইলী না হলেও শাসনের প্রয়োজনে তিনি ইহুদী ধর্ম গ্রহন করেন।তার নির্মিত প্রাসাদগুলো বিশেষ করে মাসাদায়(Masada) নির্মিত প্রাসাদটির ধ্বংসাবশেষ এখনো ইজরায়েলের অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

ছবিঃ পশ্চিম দেয়াল! alamy.com
আবার বিখ্যাত ইতিহাসবিদ জোসেফাস (Josephus) যেভাবে হেরোড দ্যা গ্রেটকে তাঁর বই The Life of Josephus এ তুলে ধরেছেন তার সাথে বাইবেলের (Matthew) তথ্যগত অমিল আছে।বইটিতে হেরোডের দ্বারা ছেলে শিশু হত্যার কোন কথাই নেই,কিন্তু আছে জন দ্যা ব্যপ্টিস্টের কিংবা নিজ সন্তানকে হত্যার কথা।এমনকি কোরান ও হাদীসের কোথাও এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র কোন কথা নেই,আছে ফেরাউনের হাতে শিশু হত্যার ঘটনা। বর্তমানে অনেক ইতিহাসবিদই প্রশ্ন তুলেন Matthewর এই গণ শিশু হত্যার বিষয়ে।
আবার ফিরে আসি ব্যাপ্টিজম প্রসংগে, The Gospel according to Mark 1-8 অনুসারে বন জঙ্গলে থেকেই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেই জন ধর্ম প্রচার করতেন,তাঁর শিষ্য বা অনুসারী যারা জুডিয়া শহর থেকে তাঁর সাথে দেখা করতে যেতো তাদের তিনি পাপ স্বীকার করার পর জর্ডান নদীর পানি দিয়ে ব্যাপ্টাইজ করাতেন।উনি পশমের তৈরী পোশাক পরতেন এবং জঙ্গলের অদ্ভুত সব খাবার খেতে বাধ্য হতেন যেমন বুনো মধু দিয়ে পদ্ম।আর তিনি বার বার ঈসা (আঃ)র আগমনের কথা বলতেন,সবাইওকে তাঁর জন্য প্রস্তুত থাকতে বলতেন।আমি গসপেল থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা লাইন তুলে দিলাম,

3.‘The voice of one crying in the wilderness:Prepare the way of the Lord;Make His paths straight’

4.John came baptizing in the wilderness and preaching a baptism of repentance for the remission of sins

5.Then all the land of Judea,and those from Jerusalem,went out to him and were all baptized by him in the Jordan river, confessing their sins.

8. I indded baptized you with water,but he will baptize with the Holy Spirit.

বাইবেল মতে জনের সাথে পরিনত যীশুর দেখা হয় এবং তাঁকেও তিনি জর্দান নদীতে ব্যাপ্টাইজ করান। তবে আধুনিক অনেক খ্রীষ্টীয় পন্ডিতেরা এই ব্যপারে দ্বিমত পোষণ করছেন এবং এই ব্যাপ্টিজম নিয়ে বইও লেখা হয়েছে যেখানে তাকে যীশুর প্রচলিত অর্থে ব্যাপ্টাইজার হিসেবে দেখানো হয় না।তাদের মতে Baptizo একটি গ্রীক শব্দ,বাইবেলের লেখকরা এই শব্দের আক্ষরিক পরিবর্তন (transliterate) করে বাইবেলে নিয়েছেন। Baptize র ইংরেজী হলো immerse বা কোন কিছু পানিতে চুবানো, এজন্যই বাইবেলের আধুনিক সংস্করনে যেমন Timothy 4:15, English Standard Version (ESV) তে উনাকে ‘জন দ্যা ইমমারসার’(John the Immerser) বলা হয়েছে।
তাদের মতে এই ব্যাপ্টিজম বাইবেলের মত অনুযায়ী সাধারন ক্যাথলিক চার্চের ব্যপ্টিজম না বরং এটির অন্তর্নিহিত বিষয় অন্য।তাদের মতে যেহেতু পানি দিয়ে তাওরাত অনুযায়ী ইবাদতের আগে পবিত্রতা অর্জন করা হতো ঠিক তেমনি ধর্ম্প্রচারক (নবী) হিসেবে তিনি আকন্ঠ পাপে নিমজ্জিত ইহুদীদেরকে (বনী ইসরাঈলীদেরকে) নিজেদের পাপ স্মরন করিয়ে অনুতপ্ত করে (confession) দ্বীনের পথে,পবিত্রতার পথে আনতে চেয়েছেন এবং যীশু (ঈসা(আঃ))র ধর্ম প্রচারের পথ সুগম করেছেন। এই মতটা ইসলামের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ন কারন ব্যাপ্টিজমের ধারনাটা কিছুতেই ইবরাহিম ও মুসা (আঃ)র সাথে যায়না বরং এটা প্রাচীন গ্রীক ও রোমান মুর্তিপূজকদের রীতি(Pagan practice) ।
হেরোডের মৃত্যর পর জুডিয়ার ক্ষমতায় আসেন তার ছেলে হেরোড এন্টিপাস,এন্টিপাস ছিলো বাবার মতই দুষ্ট ও অত্যাচারী।একবার বেড়াতে গিয়ে নিজের সৎ ভাই ফিলিপের স্ত্রী হেরডাইসের সাথে দেখা,দেখার পর তাদের দুজন দুজনকে ভালো লেগে যায় এবং তারা রাজধানীতে ফিরে একে অপরের সাথে থাকতে শুরু করে।ইয়াহিয়া (আঃ) অনেক আগে থেকেই সম্রাটের অত্যাচারের প্রতিবাদ করে আসছিলেন ,এবারতো দ্বন্দ চরমে পৌছলো। উপায়ন্তর না দেখে তাঁকে বন্দী করা হয় এবং দীর্ঘকাল বন্দীই থাকেন।কিন্তু তাঁকে বন্দী করেও বিয়ের পথ সুগম হলোনা,তাঁর অনুসারীদের সাথে হেরোড আর হেরোডাইসের দ্বন্দ বেড়েই চললো, ইয়াহিয়া (আ)র মৃত্যুই হলেই তাদের মিলনের পথে আর কোন বাঁধা থাকে না।অবশেষে হেরোড আর হেরোডাইস মিলে এক বুদ্ধি আটে যেখানে কাজ লাগানো হয় হেরোডাইসের আগের ঘরের মেয়ে সালোমিকে (Salome)।এন্টিপাসের এক জন্মদিনে আয়োজন করা হয় এক বিশাল ভোজসভার,নগরীর সমস্ত গন্যমান্য ব্যক্তিত্বদের সেখানে আমন্ত্রন জানানো হয়।সেই মজলিসে সালোমি আবেদনময়ী এক নাচ পরিবেশন করে,তবে নাচের আগে সে এক শর্ত জুড়ে দেয় যে তার নাচে যদি এন্টিপাস মুগ্ধ হয় তবে সে যা চাইবে তাকে তাই দিতে হবে।যথারীতি লম্পট এন্টিপাস মুগ্ধ হয়ে তার কাছে কিছু চাইতে বলে,হেরোডাইসের মেয়ে তখন তার কাছে ইয়াহিয়া (আঃ)র কাটা মাথা চায়। আহা সত্যবাদী এন্টিপাসকে যে কথা রাখতেই হবে তাই সে তৎক্ষণাৎ ইয়য়য়াহিয়া (আঃ)র শিরচ্ছেদের আদেশ জারি করে এবং শিরোঃচ্ছেদ করা হয় এই মহান নবীর যার নাম রেখেছিলেন,যার জ্ঞ্যান ও অন্তরের সৌন্দর্যের কথা কোরানে সাক্ষী দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামীন।(১৯সূরা মরিয়মঃ১২)।এখানে আমরা ইয়াহিয়া (আঃ;) চারিত্রিক দৃঢ়তা ও তাকওয়া দেখতে পাই,বন্দী জীবনের কষ্ট ও মৃত্যু মেনে নিয়েছেন তবু অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি। নিষ্ঠুরতার শেষ এখানেই নয়,সেই কাটা মাথা সম্রাটের ভোজসভায় খাবারের থালায় করে সবার সামনে পরিবেশন করা হয়,এবং সবাই এই কাটা মাথা সামনে রেখেই যার যার ভোজ শেষ করে।
এত বড় অন্যায়ের পরও ইহুদী আলেম সমাজ থেকে বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ আসেনি,ইহুদীরা সেসময় এক মসীহের(Messiah) জন্য অপেক্ষা করেছিলো তাই অন্য কোন নবীকে তারা বিশেষ পাত্তা দিতো না।তবে মেসীয়াহ/ঈসা(আঃ) যখন তাদের কাছে নবুওত নিয়ে আসলো তখন তাকে যে খুব সম্মান দিয়েছিলো তাও না,ইহুদীরা নবীর অপেক্ষায় থাকে বটে তবে নবী দেখলেই তাদের চরম বিরোধিতা করা,হত্যা করা তাদের অন্যতম স্বভাব।একই আচরন তারা করেছিলো রাসুল (সাঃ)র সাথেও,মক্কায় যখনই কোন ঝগড়া বিবাদ হতো তারা শেষ নবীর নামে বিচার দিতো,কিন্তু রাসূল(সাঃ) যখন নবুওত পেলেন তখন তারাই তাঁকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়,দফায় দফায় তাঁর সাথে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে।
পরবর্তীতে তাঁর কয়েক জন অনুসারী এসে এই মহান নবীর কাটা মাথা ও দেহ প্রাসাদ থেকে বের করে তাকে কবর দেয়,বর্তমানে তার কবর সিরিয়ার দামেস্কের উমাইদ মসজিদের পাশে অবস্থিত,বর্তমানে প্রতিদিন বহু মানুষ তাঁর কবর জিয়ারত করে।

Shrine-of-Yahya-as-740x456

শহীদ নবীজি ইয়াহিয়া (আঃ)র কবর

 

তথ্যসূত্র:
১।www.christiancouriar.co.
২।তাফহিমুল কোরান,৭ম খন্ড,পৃঃ১২২-১২৩
৩।www.womeninthebible.net
৪।The Real Herod/Biblical Tyrant/youtube

The Journey Begins

আমার খুব প্রিয় একখানা হাদিস…

‘দুনিয়া তো অভিশপ্ত, অভিশপ্ত এতে যা কিছু আছে,শুধু আল্লাহর স্মরন  ও অনুরুপ (নামাজ ও যিকির) ব্যতীত, জ্ঞানী ও ছাত্র ছাড়া!’ (তিরমিজি)

post