ছোট্ট এক বালিকার পিরিয়ড ও রাসূল (সাঃ)

ফেসবুকে কোরিয়ান এক মহিলার পিরিওডের কাহিনী খুব ছড়িয়েছে,ভাবলাম রাসূল (সাঃ)রও একটা কাহিনী আছে,সেটা বলা দরকার।

খাইবারের যুদ্ধের সময়ের ঘটনা।
দলের এক বাচ্চা মেয়েকে আল্লাহর রাসূল(সাঃ) তাঁর উটের পেছনে তুলে নিলেন।উটের পিঠে অনেক মাল সামাল টাল করে রাখা।বাচ্চা মেয়েটাকে বসানো হলো সেই মালের স্তুপের ওপর।
সকাল বেলা হলে যাত্রাবিরতির সময় হলো।আল্লাহর রাসূল(সাঃ)উট থেকে নেমে পড়লেন।কিন্তু বাচ্চা মেয়েটি নামতে গিয়ে দেখলো তার বসার জায়গায় রক্ত লেগে আছে।
মেয়েটি লজ্জায় কুঁকড়ে গেল,এ কী হয়ে গেল!এমন কান্ড ঘটবে সেতো কল্পনাই করেনি।সে চুপটি করে উটের পাশে বসে রইলো।নবীজি (সাঃ)র ছিলো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।মা যেভাবে করে তার সদ্যজাত শিশুর জন্য প্রতিমুহূর্তে খেয়াল রাখে ,সাহাবীদের সবার জন্য তাঁর তার চেয়েও বেশী খেয়াল থাকতো।তিনি তাকিয়ে দেখতে পেলেন বাচ্চা মেয়েটা কেমন এক অস্বস্তিতে গুটিসুটি মেরে আছে।
তিনি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,’কী হয়েছে তোমার?মাসিক হয়েছে?’ মেয়েটি বলল,’হু’!কিছুই হয়নি,এমন ভঙ্গিতে নবীজি তাকে বললেন, ‘আচ্ছা,ঠিক আছে।তুমি পরিষ্কার হয়ে নাও।এরপর একটা জগে পানি আর কিছু লবন নিয়ে মালামাল থেকে রক্তগুলো পরিষ্কার করে ফেলো। এরপর আবার উটের পিঠে বসে পড়ো’।
সেই বাচ্চা মেয়ে নবীজির কথামতো সবকিছু করলো।
যুদ্ধ শেষে গনিমত ভাগাভাগি করার সময় এল।যুদ্ধে অংশ নিলেও নারী ও শিশুরা গনিমত পায় না,তবে আমীর চাইলে দিতে পারেন।রাসূল (সাঃ)যুদ্ধের পর এত এত সৈনিকের মাঝেও আলাদা করে সেই ছোট্ট উমাইয়ার নাম মনে করেছিলেন আর গনিমতের সম্পদ থেকে একটা গলার হার নিয়ে নিজ হাতে তার গলায় পরিয়ে দিয়েছিলেন।
ছোট্ট উমাইয়া (রাঃ) নবীজির সেই স্নেহ আর উপকার সারাজীবন ধরে মনে রেখেছিলেন। তিনি যখন বৃদ্ধ হয়ে গেলেন তখন হাদীস সংগ্রহকারীর কাছে বলেন,’আল্লাহর শপথ!যে হার আমার ছোটবেলায় আল্লাহর রাসূল(সাঃ) আমাকে দিয়েছিলেন,সেই হার আমি কখনো খুলিনি!’
মৃত্যু এসে তাকে এই দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে ,তখনো তার গলায় সেই হার ঝুলছে,যেন আখিরাতের সেই সুদীর্ঘ একাকী সফরে পা বাড়ানোর সময়েও আল্লাহর রাসূলের স্নেহটুকু তিনি বুকে করে যাত্রা শুরু করলেন।

*আল বিদায়া আল নিহায়া,৪র্থ খন্ড,পৃ-৩৬৬
সীরাহ রেইনড্রপ্স,২য় খন্ড,পৃ-২৩৯-২৪০

seerah

বেহেশতের বালকেরা (The Heavenly Lads)

পাকিস্তানি এক পিচ্চির দুয়েকটা ভাইরাল ভিডিও আছে, ছোট মুখে পাকা পাকা কথা, ‘পিছে দেখো’ ডায়ালগ আর গাল্লুগুল্লু শারিরীক গড়ন দিয়ে মুহূর্তেই ইন্টারনেট দখল করে ফেলেছিলো! নিজস্ব পেইজ,ফেসবুক,ইন্সটাগ্রামে বিশ্বজুড়ে তার লাখো ফলোয়ার!

কিন্তু খেয়াল করে দেখবেন তার কোন ভিডিওই এখন আর ভাইরাল হয় না! ছেলেটা দ্রুত বড় হয়ে গেছে,ছোট মুখে আধো বোল আর নেই, আর ওত মায়াও লাগে না! দুনিয়া এমনই, এখানে সব কিছু দ্রুত বদলে যায়, নিঃশেষ হয়ে যায়!

দুনিয়ার এই স্বল্পস্থায়ীত্ব নিয়ে কীটসের একটি বিখ্যাত কবিতা আছে, ওড অন এ গ্রেসিয়ান আর্ন, যেখানে বলা হয় মাটির পাত্রে খোদাই করা শিল্পের তাও স্থায়ীত্ব আছে কিন্তু দুনিয়ার সবই ক্ষণিকের!

অবশ্য, ইন্টারনেটের এই পিচ্চিই প্রথম না,আমার নিজেরই সবসময় কিছু পিচ্চি বন্ধু থাকে! আমি জানি বাবা-মা ছাড়া বাকীদের জন্য এই ক্ষুদ্র হ্রদয়গুলো জয় করা কতটা কঠিন, কতটা সময়সাপেক্ষ, তবু এদের পাশে থাকা,আধো বোলের তাদের কথা শোনা স্মর্ণময়ী! কিন্তু, এই দিন দীর্ঘস্থায়ী হয়না,পিচ্চিগুলো দ্রুত বড় হয়ে যায়,নিষ্পাপ স্বচ্ছ গালের বেবী ফ্যাটগুলো গলে নাই হয়ে যায়, গলা ভারী হয়ে যায়, বহুদিন পরের হঠাৎ দেখায় অবাক হতে হয়!
রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা যেমন মিনিকে বিয়ের চোলি পরিহিত দেখে ভেঙ্গে পরে!

ফিরে যাই ওই পাকিস্তানি পিচ্চিটার কাছে! ওর একটা ভিডিও দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে পরে কোরআনের দুটা আয়াতের কথা,মূল বক্তব্য একই, ঘুরে ফিরে এসেছে!

‘তাদের সেবার জন্য ঘুরতে থাকবে তাদের জন্য নিযুক্ত সেবক বালক। তারা যেন লুকানো মুক্তা’ (সূরা তুর:২৪)।

‘তাদের সেবায় নিয়োজিত বালকেরা সুরক্ষিত মুক্তোর মত তাদের চারপাশে ঘুরোঘুরি করবে ‘(ভিন্ন অনুবাদ)

‘তাদের সেবার জন্য ঘুরতে থাকবে এমন সব ছেলে যারা সব সময় বালকই থাকবে। তোমরা তাদেরকে দেখলে বিক্ষিপ্ত মণি-মুক্তা বলেই মনে করবে’ (সূরা দাহর: ১৯)।

জীবনে কতবার পড়েছি আয়াতগুলো কিন্তু এভাবেতো কখনো ভাবিনি!

মুক্তোর মত দেখতে বিষয়টিও খুবই আগ্রহোদ্দীপক, আমি সত্যিই এমন অনেক পিচ্চি দেখেছি যেন তারা জ্বলজ্বল করে,রক্তের বিশুদ্ধতা,ক্যামিকেল বিহীন চামড়া ও দুঃশ্চিন্তাহীন ছেলেবেলার জন্য এদের ত্বক এমন দেখায়, বয়সের সাথে সাথে তা আবার চলেও যায় যেমন মুক্তো ব্যবহারে সময়ের সাথে ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে মলিন হয়ে ক্ষয়ে যায়!

বেহেশতের পিচ্চিগুলোর মুখের আধো বোল,গালের বেবী ফ্যাট কখনোই ক্ষয়ে যাবে না, শরাব দিতে আসলে এগুলোকে পাশে বসিয়ে বিরতীহীন কথা বলা যাবে,চিরকালই একই রকম গালটা টেনে দেয়া যাবে,গলার স্বর বদলাবে না! (কোরানের ‘সুরক্ষিত মুক্তো’, যা ক্ষয়ে যাবে না)!

দুনিয়ার পিচ্চিগুলো এটা ওটা এনে দিলে কতই না ভালো লাগে! মাঝে মাঝে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের আমাদেরকে নিয়ে তাঁর ভালোবাসাময় চিন্তা,পরিকল্পনা অবাক করে দেয় (মাঝে মাঝে না,সবসময়ই হওয়া উচিত কিন্তু ঈমান দূর্বল বলে মাঝে মাঝে হয়) তবে সুবাহানাল্লাহ!

*এই শরাব আবার দুনিয়ার মাতাল নিকৃষ্ট মদ নয় কিন্ত,অনেকেই গুলিয়ে ফেলেন!এই শরাবের ঘ্রান,স্বাদ,শীতলতা,মিষ্টতা,এর উপাদান সমূহ দুনিয়ার কিছুর সাথে তুলনীয় না,এই শরাব হুশও কেরে নিবে না!

উমর (রাঃ) কী নারীদের মসজিদে নামায আদায় নিষিদ্ধ করেছিলেন?

উমরনামা-৮

1000x-1.jpg

বাংলাদেশে বা হয়তো এই উপমহাদেশ জুড়েই  আমিরুল মু’মেনীন দ্বিতীয় উমর (রাঃ)র নামে একটা কথা অধিক প্রচলিত যে, উমর (রাঃ) ইজতিহাদের মাধ্যমে মেয়েদের মসজিদে নামাযা রহিত করে দেন! ইজতিহাদ একটি ইসলামি পরিভাষা যা গবেষণার মাধ্যমে শরীয়তে নতুন কোন আইন প্রনয়ন করাকে বোঝায়।

উমর (রাঃ)র সাথে এই ইজতিহাদে আরো যেসব সাহাবীর নাম পাই তারা হলেন আম্মাজান আয়েশা (রাঃ),ইবনে মাসউদ (রাঃ),ইবনুল যুবায়ের (রাঃ)। তবে এ ব্যাপারে যারাই কথা বলেন তারা কোনরকম তথ্যসূত্র বা রেফারেন্সের ধার না ধেরেই বলেন।

এখন কথা হলো,কথাটি কতটুকু সত্য?

রাসূল (সাঃ)র সময়ে যেহেতু নারীরা সম্পূর্ণ বাঁধাহীনভাবে মসজিদে আসা যাওয়া করতেন, এবং তাঁর আদেশ ছিলো,

“তোমরা আল্লাহর বান্দীদেরকে আল্লাহর ঘরে আসতে মানা করোনা’

( বুখারী,জুম্মা অধ্যায়,হাদিস নং ১৩, মুসলিম, নামায অধ্যায়,হাদিস নং ১৩৬)

ইবনে উমর থেকে আরো বর্নিত, রাসূল (সাঃ) বলেন, ‘ মহিলাদেরকে রাতের বেলায় মসজিদে যেতে দাও’। (বুখারী, ভলিউম ২, হাদিস নং ২২) 

এমন প্রতিষ্ঠিত সুন্নাহর উপর আদৌ ইজতেহাদ করা যায় কিনা এবং ইজতেহাদের মাধ্যমে রাসূল (সাঃ)র নির্দেশিত কোন আদেশ কোন সাহাবী রদ করার ক্ষমতা আদৌ রাখেন কিনা?

উমর (রাঃ) খেলাফতের দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে সাম্রাজ্যের কাজ পরিচালনায় অনেক কিছুই নতুন প্রবর্তন করেন,তবে দ্বীনের বেলায় শুধুমাত্র একটি বিষয়ই ছিলো নতুন, আর তা হলো জামাতে তারাবীর নামাযের রাকাত ২০ হিসেবে নির্ধারণ করা। তারাবীর নামায শিয়া অধ্যুষিত অঞ্চল বাদে পৃথিবীর সর্বত্র ব্যাপকভাবে প্রচলিত। কিন্তু খেয়াল করে দেখবেন ,উমর (রাঃ) এই মেয়েদের মসজিদে জামাত নিষিদ্ধের ‘ইজতিহাদ’ পৃথিবীর অনেক দেশেই মানা হয়না, কিন্তু সুন্নী তরিকায় কোন সাহাবীর ইজতিহাদ এভাবে অস্বীকার করা বেয়াদবী।

উমর মসজিদে নববীতে বসে সাম্রাজ্য পরিচালনা ও আইন প্রণয়ন করতেন, সেই খোদ মসজিদে নববীতে মেয়েরা এখনো নামায পড়ে এবং তা কখনোই বন্ধ হয়েছিলো বলে ইতিহাসে উল্লেখ নেই। আবার, উমরের জয় করা জেরুসালেমের আল-আক্বসা মসজিদেও মেয়েরা নিয়মিত সালাত আদায় করে। নিজের অধীনের দুই মসজিদে উমর নিজের এই ‘ইজতিহাদ’ প্রয়োগ করতে পারলেন না, তাহলে এই ইজতিহাদ কোন কোন মসজিদগুলোর জন্য প্রযোজ্য তারও কোন সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা পাওয়া হয়না। অথচ এমন ইজতিহাদ বা শরীয়তের কোন নতুন আইন দুনিয়ার সকল মসজিদের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা! 

মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও ক্রমহ্রাসমান তাকওয়ার কারনে উমর (রাঃ)র সময় অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতই মেয়েদের মসজিদে আসা সংক্রান্ত কিছু সমস্যারও উদ্ভব হয়।

খাওলা বিনতে কায়েস থেকে বর্নিত, ” আমরা মহিলারা , মসজিদের ( মদীনা আল মনোয়ারা) ভেতরে থাকা অবস্থায়, কখনো কখনো পুরুষদের সাথে মেলামেশা করতাম এবং এমনকি হয়তো ঠাট্টা-তামাশা করতাম এবং এভাবে নারী-পুরুষ মেলামেশায় নিজেদের ক্ষতি করতাম। তাই, উমর বলেন, “কসম, মহিলারা আমি তোমাদের আবার মুক্ত করবো (এই ধরনের ঘটনা ঘটার থেকে) ‘  এরপর তিনি আমাদের মসজিদ থেকে বের করে আনেন। (তথ্যসূত্রঃ ২৩১৩১,কানয আল উম্মাল, তাবাক্বাত, ইবনে সাদ)।

আরেক হাদিস থেকে আমরা এই বিষয়ে আয়েশা (রাঃ)র উদ্বেগের কথাও জানতে পারি। পড়ুন, মহিলাদের মসজিদে নামায ও আয়েশা (রাঃ)র হাদীস উমর এই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগও গ্রহন করেন।

প্রথমত, উমর (রাঃ) ইতিহাসে প্রথমবারের মত মসজিদে আলাদা অজুখানা ও দুটো দরজা করে দিয়েছিলেন যাতে মহিলারা স্বতন্ত্র দরজা দিয়ে মসজিদে ঢুকতে ও বের হতে পারে। তবে মহিলারা চাইলে দু দরজা দিয়েই মসজিদে ঢুকতে পারতেন কিন্তু পুরুষদের জন্য শুধু এক দরজাই বরাদ্দ ছিলো। যদি ‘ইজতিহাদ’ করে নিষিদ্ধই করে দিতেন তবে আলাদা ওজুখানা ও দরজা কেন করেছিলেন?

দ্বিতীয়ত, উমর আল্লাহর রাসুলের কাতারের নিয়ম (প্রথমে ছেলেরা, তারপর বালকেরা এবং তারপরের সারিতে নারীরা) মেয়েদের তারাবীর নামায পড়ার ক্ষেত্রে বদলে দিয়েছিলেন। তিনি ছেলেদের থেকে দূরে মসজিদে নববীর দূরতম প্রান্তে সুলাইমান ইবনে আবি হাতমাকে ইমাম নিযুক্ত করে নারীদের জন্য আলাদা কিয়ামের ব্যবস্থা করেছিলেন। (তথ্যসূত্রঃ আল মুহাল্লা ৩ঃ ১৩৯)

তবে এটা তারাবীর জন্য স্বতন্ত্র একটা নিয়ম ছিলো, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য নয়।

আরেকটি সূত্র মতে, উমরের মহিলাদের নামাজের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আরেকটি ঘটনা জানা যায় যে মসজিদে নববী সম্প্রসারনের সময় উমর কিছুদিন মেয়েদের মসজিদে আসতে মানা করেন। তবে এই নিষেধাজ্ঞা ছিলো সাময়িক, শুধুমাত্র নির্মানকালীন সময়ের জন্য প্রযোজ্য।

এই ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)র (উমর (রাঃ)র পুত্র)একটি বিখ্যাত হাদীস রয়েছে!

তিনি বলেন, ‘আমি রাসূল (সাঃ)কে বলতে শুনেছি,-‘তোমরা নারীদেরকে মসজিদে আসতে বাঁধা দিয়ো না! আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)র পুত্র বেলাল এর প্রতিউত্তরে বললেন, ‘আমি অবশ্যই আমার ঘরের নারীদেরকে বাহিরে মসজিদে নামায পড়তে বাধা দিবো!’

জবাবে আবদুল্লাহ বলে উঠলেন, ‘আল্লাহ তোমার অমঙ্গল করুক!আল্লাহ তোমার অমঙ্গল করুক!আল্লাহ তোমার অমঙ্গল করুক!(মোট তিনবার)  ‘আমি তোমাকে আল্লাহর রাসূলের কথা বলার পরও তুমি বিরোধিতা করছো’,বলে উমর পুত্র আবদুল্লাহ কাঁদতে লাগলেন!’ (বুখারী-৮২৭,মুসলিম ৪৪২)

বুখারী শরীফের এই হাদীসেও আমরা দেখি স্বয়ং উমর (রাঃ)র ছেলেই উমর (রাঃ)র এই ‘ইজতিহাদের’ ব্যাপারে অবগত নন, কিন্তু আমাদের কিছু সংখ্যক লোকেরা অতি অবগত।

তবে উমর (রাঃ) নিজের স্ত্রীর মসজিদে নামাজ পড়া অপছন্দ করতেন। কিন্তু, অপছন্দ পর্যন্তই, উনি তাঁর স্ত্রীকে বাঁধা দিতেন না।

উমর একবার তাঁকে (তাঁর স্ত্রী) বলেন, ‘কসম, তুমি খুব ভালো করে জানো যে আমি এটা অপছন্দ করি। তাঁর স্ত্রী প্রতিউত্তরে বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি থামবো না যতক্ষণ না আপনি মানা করেন।’ উমর জবাবে বলেন, ‘আমি সত্যিই তোমাকে মানা করবো না।”

উমরের এই অপছন্দ অন্যরাও জানতেন। এই ব্যাপারে বুখারী শরীফের একটি হাদিস আছে;

حَدَّثَنَا يُوسُفُ بْنُ مُوسَى، حَدَّثَنَا أَبُو أُسَامَةَ، حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ، عَنْ نَافِعٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ: كَانَتِ امْرَأَةٌ لِعُمَرَ تَشْهَدُ صَلاَةَ الصُّبْحِ وَالعِشَاءِ فِي الجَمَاعَةِ فِي المَسْجِدِ، فَقِيلَ لَهَا: لِمَ تَخْرُجِينَ وَقَدْ تَعْلَمِينَ أَنَّ عُمَرَ يَكْرَهُ ذَلِكَ وَيَغَارُ؟ قَالَتْ: وَمَا يَمْنَعُهُ أَنْ يَنْهَانِي؟ قَالَ: يَمْنَعُهُ قَوْلُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لاَ تَمْنَعُوا إِمَاءَ

اللَّهِ مَسَاجِدَ اللَّهِ

ইবনে উমর থেকে বর্নিত, উমর (রাঃ)র স্ত্রী আতিকা মসজিদে, জামাতে ফজর ও ইশা সালাত আদায় করতেন । একবার এক মুসল্লি তাকে উদ্দ্যেশ্য করে বললেন,আপনি উমর (রাঃ) অপছন্দ করেন এবং স্ত্রীর ব্যাপারে তাঁর আত্নমর্যাদাবোধ বেশী জেনেও মসজিদে আসেন কেন? তখন আতিকা (রাঃ) জবাবে বলেন, তাহলে উমর (রাঃ) আমাকে নিষেধ করেন না কেন? তখন আরেক মুসল্লি জবাব দিলো,  ” আল্লাহর রাসুলের (সাঃ) “আল্লাহর বান্দীদের আল্লাহর ঘরে যেতে বাঁধা দিয়ো না” বক্তব্ উমরকে আটকে রাখে।  ।(বুখারীব, ভলিউম২, হাদিস নং ২৩)

এই হাদীসেও প্রচলিত ‘ইজতিহাদের’ ছিটেফোটাও আমরা দেখতে পাইনা বরং দেখতে পাই যে রাসূল (সাঃ)র উপর কথা বলার অধিকার উমর (রাঃ) নিজের স্ত্রীর উপরও প্রয়োগের বেলাতেও নেই,সমস্ত উম্মাহর উপর চাপিয়ে দেয়াতো দূরের বিষয়!

আগ্রহোদ্দীপক বিষয় হলো ,উমর (রাঃ) যেদিন শাহাদাত বরন করেন (আল্লাহ রব্বুল আলামীন জান্নাতে সর্বচ্চো মোকামে রাসূল (সাঃ)র পাশেই জায়গা দিন), আতিকা বিনতে যায়েদ (রাঃ),তার স্ত্রী, সে জামাতে উপস্থিত ছিলেন (ফাতহুল বারী) ! মেয়েদের মসজিদে নামায যদি নিষিদ্ধই হবে তবে তিনি ওখানে কীভাবে?

বস্তুত, এই উপমহাদেশে, মেয়েদের মসজিদে নামাজ নিয়ে আমেরুল মু’মেনীন দ্বিতীয়র উপরে যে আরোপ আনা হয় তা পুরোটাই মিথ্যাচার।

তথ্যসূত্রঃ

https://www.ummid.com/news/2018/December/06.12.2018/misleading-to-claim-islam-forbids-women-from-entering-mosques. https://www.livingislam.org/fiqhi/fiqha_e48.htm
https://islam.stackexchange.com/questions/31272/why-did-caliph-umar-ban-women-from-attending-mosques

আল আক্কসা মসজিদে এক বাবা আর মেয়ে

আবু বকর-আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-উমর; তিন বন্ধুর উপাখ্যান/উমরনামা-৭

কানিজ ফাতেমা

friends1

ইসলাম গ্রহনের পর থেকে উমর (রাঃ) সারাক্ষণ রাসূল (সাঃ) ও আবু বকর (রাঃ)র পাশেই সেটে থাকতেন,অবশ্য সব সাহাবীদের মধ্যেই রাসূল (সাঃ)র পাশে বেশীক্ষণ থাকা নিয়ে নীরব প্রতিযোগীতা চলতো।ইসলাম গ্রহন পূর্বে উমর (রাঃ) ছিলেন বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে উদ্ভূত বিভিন্ন সমস্যার মীমাংসাকারী।তাঁর বাবা খাত্তাব ইবন নওফেলও তাই ছিলেন এবং প্রখর ব্যক্তিত্ব,বিচার-বুদ্ধির জোরে বাবার মৃত্যুর পর তিনিও একই সম্মান লাভ করেন,পিতা-পুত্রের কারনে বনি আদির গোত্রের সম্মানও কুরাইশদের কাছে বেশী ছিলো।

ইসলামে সকল মীমাংসাকারী ছিলেন স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কিন্তু উমর (রাঃ) নিজের মতামত দিতে কখনো কসুর করতেন না আর এসব বিষয়ে আবু বকর ও রাসূল (সাঃ) ছাড়া আর কেউ তাঁকে মানাতেও পারতো না।

হুদাইবার সন্ধির সময় সন্ধির শর্তাবলী কিছুতেই উমর (রাঃ)র পছন্দ হচ্ছিলো না।তিনি আল্লাহর রাসূলকে বলতে লাগলেন কেন তিনি আল্লাহর রাসূল হয়ে এমন সন্ধি করছেন যা দ্বীনকে ছোট করবে, রাসুল (সাঃ) বললেন, ‘শোনো,আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল,আমি তাঁর অবাধ্য হবো না,আর তিনিও আমাকে ছেড়ে দিবেন না।’

উমর (রাঃ) গেলেন আবু বকর (রাঃ)র কাছে রাসূল (সা;)কে বোঝাতে কিন্তু আবু বকর সাফ বললেন আল্লাহর রাসূল যা বলে তা অনুসরন করতে। পরবর্তীতে হুদাইবার সন্ধি যখন মুসলমানদের জন্য বিজয়ে রুপান্তরিত হলো উমর (রা) নিজের ভুল বুঝতে পারলেন আর সেদিনের সেই কথার জন্য বেশী দান,সদাকাহ,অতিরিক্ত নফল নামায,রোজা করতে লাগলেন যাতে আল্লাহ তাঁকে মাফ করে দেন যদিও উমর যা করেছিলেন ইসলাম যাতে ছোট না হয়ে যায় তার জন্যই ছিলো। ইসলাম নিয়ে তাঁর এত খুতখুতে স্বভাবের জন্যই তাঁর উপাধি ছিলো ‘ফারুক’ বা সত্য ও মিথ্যার প্রভেদকারী।

খিলাফাত পূর্ব সময়ে আবু বকর ছাড়া অন্যান্য সাহাবীদের সাথে কথার বলার চেয়ে তিনি ক্ষেপাতেনই বেশী,সাহাবীরাও রাসূল (সাঃ)কে নালিশ জানাতেন,এমন দুটি ঘটনার কথা  উমরনামা ১এ আছে।তবে সবসময় এসব পাল্টাপাল্টি অভিযোগ-অনুযোগ যে গুরুগম্ভীর ছিলো তা না,প্রায়ই রাসূল (সাঃ) এসবে হেসে দিতেন,আল্লাহ উমর (রাঃ)কে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

হুনাইন যুদ্ধের সময় রাসূল (সাঃ)শত্রু পক্ষের খবর সংগ্রহ করতে সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আবি হাদরাদকে (রাঃ)পাঠালেন।আবি হাদরাদ তথ্য সংগ্রহ করে সব রাসূল (সাঃ)কে জানাচ্ছিলেন কিন্তু কোন এক কারনে উমর (রাঃ) তাঁর সব তথ্যই নাকচ করে দিলেন। আবি হাদরাদ পালটা জবাব দিয়ে বললেন উমর বিশ্বাস না করলে কিছু আসে যায় না কারন সেতো একসময় সত্য দ্বীনকেই অস্বীকার করেছিলো। উমর (রাঃ) এত বড় কথা মানলেতো,ভাগ্যিস রাসূল (সাঃ) সামনে ছিলেন,তিনি রাসূল (সাঃ)কেই বিচার দিলেন,’ইয়া রাসূলাল্লাহ,আপনি শুনেছেন সে কী বলেছে!’ রাসূল (সাঃ) হেসে দিলেন, বললেন, ‘তুমি যে পথহারা ছিলে তা নিয়েতো কোন সন্দেহ নেই উমর।এরপর আল্লাহ তোমাকে সত্য পথে পরিচালিত করেছেন।’

আরো একবার মহিলারা রাসূল (সাঃ)র সামনে গোল করে বসে কথা শুনছিলেন এমন সময় উমর (রাঃ) উপস্থিত হলেন।উমর (রাঃ)র গলা শুনতেই মহিলারা সব পড়িমরি করে ঘরের ভিতর লুকিয়ে গেলো।অবস্থা দেখে রাসূল (সাঃ) হাসছিলেন। উমর (রাঃ) রাসূল (সাঃ)র হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দেখে খুশী হয়ে বললেন,ইয়া রাসূলাল্লাহ আল্লাহ আপনার মুখকে এভাবেই হাস্যোজ্জ্বল রাখুক। মুচকি হেসে তিনি বললেন উমর এরা আমার সামনে নিশ্চিন্তে বসেছিলো কিন্তু যেই তোমার গলা শুনলো সব পালিয়ে গেলো।যারপরনাই বিরক্ত উমর (রাঃ)বলে উঠলেন, ‘এই মহিলারা,আল্লাহর রাসূলকে ভয় পাওয়ার কথা কিন্তু তাঁকে পাওনা, আমাকে পাও!’ মহিলারা জবাব দিলো কারন আল্লাহর রাসূল আপনার মত রুক্ষ না। উমর (রাঃ) তৎক্ষণাৎ রাসূল (সাঃ)কে বিচার দিলেন,ইয়া রাসূলাল্লাহ দেখেন ওরা কী বলে! রাসূল (সাঃ) এসব দেখে হেসে বললেন যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ!উমর শয়তান যখন তোমাকে কোন পথ দিয়ে চলতে দেখে সে সেই পথ ছেড়ে অন্য পথ ধরে চলে।‘ (মুসলিম-৫৯৮৫)

এ হাদীস দিয়ে এটা বোঝায় না যে উনি শুধু মেয়েদের সাথে কঠোর ছিলেন বা তিনি তাদেরকে অসম্মান করতেন বরং উনার ব্যবহার মোটামুটি সবার সাথে এমনই ছিলো।বস্তুত উনার বাহ্যিক কঠোর ব্যবহারের পিছনে যে একটি সুন্দর মন ছিলো তা রাসূল (সাঃ) ও আবু বকর (রাঃ)ছাড়া খুব কম মানুষই টের পেত।

রাসূল (সাঃ)র মৃত্যু সংবাদ উমর (রাঃ) শোনা মাত্রই প্রত্যাখ্যান করেন।আবু বকর (রাঃ)এক কাজে মদীনার বাইরে ছিলেন আর উমর (রাঃ) খাপ ছাড়া তলোয়ার উঁচিয়ে বললেন যে তাঁর সামনে বলবে যে রাসূল মারা গেছে তাঁর গর্দান নিয়ে নিবো।একেতো সবাই শোকাগ্রস্থ তার উপর উমরের জন্য মৃত্যু পরবর্তী সব কাজ বন্ধ। অবশেষে আবু বকর ফিরে উমর (রাঃ)কে তাঁর সেই বিখ্যাত বানী যারা ‘আল্লাহর পূজো করে…’ শুনিয়ে উমরকে বসালেন।

খিলাফত লাভের আগ পর্যন্ত উমর (রাঃ)এমনই ছিলেন এমনকি নিজের মৃত্যুর আগে আবু বকর (রাঃ) যখন উমর (রাঃ)কে খলীফা মনোনীত করে যেতে চাইছিলেন অনেকে তাঁকে বলেছিলেন আপনি কী এমন কাউকে খলীফা হিসেবে নির্বাচিত করে যেতে চান যে কিনা রুক্ষ ও কঠোর,আল্লাহর কাছে আপনি কী জবাব দিবেন?

আবু বকর (রাঃ) দৃঢ়তার সাথে উত্তর দিলেন, ‘আমি শপথ করে বলছি আমি আল্লাহর কাছে খুশী হয়ে বলতে পারবো যে আমি শাসক হিসেবে এমন এক জনকে মনোনীত করেছি যে কিনা মানবজাতির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।‘

আবু বকর মানুষ চিনতে ভুল করেননি,উমর (রাঃ)র খিলাফতকাল এ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শাসনকাল হিসেবে কেয়ামত পর্যন্ত লেখা থাকবে। এই অসামান্য হৃদয়ের মানুষটি পৃথিবীতে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় দুজন অভিভাবকের সাথেই চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন মদীনায়।

উমরনামা-৬, মুসলমানদের পারস্য জয়,শিয়া উত্থান আর তিন রাজকন্যার কাহিনী

কানিজ ফাতেমা

জেরুসালেম,মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক),আফ্রিকার কিছু অংশের মত বিশাল পারস্য সম্রাজ্যও প্রথম মুসলমানদের পদানত হয় বরকতময় উমর (রাঃ)র খেলাফত কালে। তবে শুরুটা হয়েছিলো আবু বকর (রাঃ)র খিলাফতকালে ৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে মেসোপটেমিয়ান অঞ্চল ইরাককে আক্রমণ করে যা কিনা একি সাথে পারস্য সম্রাজ্যেরও অংশ ছিলো।কিন্তু সে দফা খালিদ বিন ওয়ালিদকে সিরিয়া যুদ্বে ৯০০০ সৈন্য নিয়ে যোগদান করতে বাধ্য হওয়ায় মুসলমানদের দখলকৃত অঞ্চল হাতছাড়া হয়ে যায়,সাথে চলতে থাকে পারস্যের দফায় দফায় আক্রমন, মুসলমানরা সে দফা পিছু হটে।

কিন্তু এবার সাল ৬৩৬,উমর (রাঃ)র খিলাফতের মাত্র দ্বিতীয় বছর। আবু বকর (রাঃ)র সাম্রাজ্য জয়ের সিলসিলা নিয়ে দিকে দিকে মুসলিম সেনাপতিরা রাজ্য জয়ে ব্যস্ত। কিন্তু এবারের পারস্য জয়ে উমর (রাঃ) নিজেই নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন,কিন্তু মজলিস-এ-শুরা রাজী হলো না,সাম্রাজ্য পরিচালনায় উমরকে মদীনায় থাকতে পরামর্শ দিলেন। উমর (রাঃ) শুনলেন,মদীনায় গড়ে তুললেন ত্রিশ হাজারেরও বেশী বিশাল এক সেনাবাহিনী,রণ-পরিকল্পনা পালটে ফেললেন, এবার আর ইরাক থেকে না বরং সাসানিয়ান সম্রাজ্যকে আক্রমণ করা হবে পারস্যের কাদিসিয়া বা কুদসি রাজ্য দিয়ে, সেনাপতি হবে সাহাবী সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাসের (রাঃ)।সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস অসুস্থ তবু খলিফার আদেশ,উমর (রাঃ) সব বুঝিয়ে দিলেন,সেনাবাহিনীকে দুই ভাগে ভাগ করে দিলেন,কিন্তু কেন?

কাদেসিয়া রাজ্যের রাজা তখন রাজা ইয়াযদেগেরেদ তৃতীয় (Yazdegerd III)। মুসলমানদের আক্রমণ মোকাবেলায় সে রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট হেরাক্লিয়াসের সাথে সন্ধি করায় রোমানদেরও এই যুদ্ধে অংশগ্রহন করার কথা। কিন্তু মুসলমানদের আসার সংবাদ ঠিক সময়ে সংগ্রহ না করতে পারায় তার রোমানদের খবর দিতে দেরী হয়ে যায়,এদিকে উমর আগে থেকেই এই সন্ধির ব্যপারে অবগত থাকায় আরেকদল মুসলিম সেনাবাহিনীকে ইয়ারমুকে (বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা বর্তমান জর্দান-সিরিয়া-ইজরায়েলের সীমান্তবর্তী অঞ্চল) একই সময়ে ইয়ারমুকে মোতায়েন রাখে এবং রোমানদের ব্যস্ত রাখে।হেরাক্লিয়াস প্রথমেই মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পরতে চায়নি কিন্তু তার সেনাপতি আক্রমন করে বসে এবং মুসলমানদের কাছে হেরে যায়।এটা ছিলো খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রথম বড় জয়। রোমানদের থেকে আক্রমণের আর কোন ভয়ই রইলো না,তবে পারস্য এখনো জয় করার জন্য বিশালই রয়ে গেলো। উমর ইয়াযদেগেরদের কাছে আত্নসমর্পণ ও ইসলাম গ্রহনের আহবান জানালো।মুসলমানরা কোনরকম আক্রমণ করবে না,তার সম্রাজ্য তারই থাকবে কিন্তু আনুগত্য স্বীকার করতে হবে।

ইয়াযদেগেরদ মানলো না, শুরু হলো যুদ্ধ,আমাদের অনেক পরিচিত সোহরাব-রুস্তম কাহিনীর সেই রুস্তম ফারুখজাদ ছিলো এই যুদ্ধের এক সেনাপতি।কিন্তু উমর (রাঃ) নির্দেশনার বাহিনী বীর বিক্রমে জিতে গেলো,একে একে পদানত হলো ব্যবিলন সহ পারস্যের সমস্ত বড় শহরের,পতন হলো সাসানিয়ান সাম্রাজ্যের।ইয়াজদেগেদ পালিয়ে গেলো,মুসলমানরা প্রচুর গনীমতের মাল লাভ করলো,এর মধ্যে ছিলো ইয়াজদেগেদের তিন কন্যা।উমর (রাঃ) এই তিন রাজকন্যাকে নিজ পুত্র আবদুল্লাহ,আবু বকর (রাঃ) পুত্র মুহাম্মদ আর আলী (রাঃ) পুত্র হুসাইন (রাঃ)র মধ্যে ভাগ করে দিলেন। পরে হুসাইন (রাঃ) ওই রাজকন্যাকে বিয়ে করে নেন,তার নাম ছিলো শাহযানা।

একটু অন্য প্রসংগে কথা বলি।ছোট বেলা থেকেই ভাবতাম,রাসূল (সাঃ)র তিন অন্য কন্যাদের নিয়ে শিয়াদের কোন আগ্রহই নেই,সমস্ত আগ্রহ ফাতেমা (রাঃ) ও তাঁর স্বামী আলী (রাঃ)কে নিয়ে।অথচ উসমান (রাঃ)ছিলেন রাসূল (সাঃ)র দুই কন্যার স্বামী,তাঁর আধা পয়সা দামও নেই শিয়াদের কাছে।আচ্ছা,আলী (রাঃ) রাসূল (সাঃ)র চাচাতো ভাই ছিলেন,তো এমন চাচা হামযা (রাঃ)ও ছিলেন,আছে তাদের কোন পাঠ্যে তাঁকে নিয়ে কোন বন্দনা,না নেই। আবার হাসান,হুসাইন (রাঃ) দুই ভাই হলেও সমস্ত ভালোবাসা যেন হোসাইন (রাঃ)র জন্য বরাদ্দ,কারবালার দিন ‘হায় হোসাইন,হায় হোসাইন’ মাতম। অথচ পুরো ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছেই সাহাবীদের রক্তের উপর,কারো রক্তের জন্য মাতম নেই,শুধু সব শোক হোসাইন (রাঃ)র জন্য।হাসান (রাঃ)কেও বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয় কিন্তু কোনদিনও বলে না,’হায় হাসান,হায় হাসান’।

হোসাইন (রাঃ)র প্রতি এই সমস্ত ভালোবাসার মূল এই রাজকন্যা শাহযানার সাথে বিয়ে।শিয়া ধর্মের ১২ ইমামের বেছে বেছে সকল ইমামই এই দম্পতির ঔরসজাত।পারসিক শিয়া মতবাদ যতটা না আল্লাহর রসূলের ইসলাম তার চেয়েও বেশী ইয়াযদেগেরদের কন্যার ইসলাম। পারস্যের শিয়ারা না হয় ইসলামের চেয়ে তাদের প্রবল পারস্য জাতীয়তাবোধের জন্য গোমরাহী করে কিন্তু বাংলাদেশ বা অন্যান্য মুসলিম দেশের শিয়ারা কেন করে?

আবার যুদ্ধের ময়দানে ফিরে যাই।হেরে গেলেও পারসিকরা দীর্ঘসময় জুড়ে দফায় দফায় আক্রমণ চালিয়ে যেতেই থাকে। ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে মদীনায় দেখা দিলো প্লেগের মহামারী, সেই প্লেগ ছড়িয়ে পরলো আরব জুড়ে।জায়গায় জায়গায় পারসিকরা নিজেদের ভূমি পুনঃরুদ্ধার করছে। ঘর-বাহির সামলাতে উমর (রাঃ) ক্লান্ত হয়ে গেলেন,এক সময় বলে উঠেন,

’যদি এক বিশাল আগুনের পাহাড় আমাদের আর পারসিকদের মধ্যে থাকতো যাতে তারা আমাদেরকে আর আমরা তাদের আর ধরতে না পারি’।

কিন্তু সাসানিয়ানরাতো থেমে ছিলো না,অবশেষে সব গুছিয়ে উঠে উমর আবার ৬৪১ সালে পূর্ণাংগ রণ পরিকল্পনা সাজালেন,আরেকদফা আক্রমণ করলেন নাহাভান্দ রাজ্যে,এবারের আক্রমণে সাসানিয়ান সাম্রাজ্যের মেরুদন্ড ভেঙ্গে গেলো কিন্তু একই সাথে বাজলো উমর (রাঃ)র মৃত্যু ঘন্টা।

নাহাভান্দের এক সেনাপতি পাইরুজ নাহাভান্দী যুদ্ধে ধরা পরে মদীনায় আসে।ইসলাম গ্রহণ না করায় সে দাস হিসেবেই থেকে যায়,সবাই তাকে ডাকতো আবু লুলু বলে,হয়তো সে লুলু নামে কারো বাবা ছিলো। ৬৪৪ সালের ৬ই রবিউল আউয়াল, ফজরের জামাতে লুলু তার দশদিন বিষে চুবিয়ে রাখা বিষাক্ত ছুরি উমরের পিঠে ও পেটে তিন থেকে পাঁচবার বসিয়ে দেয়।যারা খলীফাকে বাঁচাতে গেছে তারাও আঘাতপ্রাপ্ত হয়,পরে লুলু মসজিদে নববীর এক কোনে একই ছুরি দিয়ে নিজেকেও হত্যা করে। আঘাতের তিনদিন পর ৯ই রবিউল আউয়াল পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ শাসক এই পৃথিবী ত্যাগ করেন।

উমর (রাঃ) আবু লুলুকে ছুরি নিয়ে আসতে দেখেন,কিন্তু কারো হাতে ছোরা থাকলেই কোন রকম বিচার ছাড়া খলিফা হিসেবে তাকে হত্যা করা ঠিক হবে না এই চিন্তা থেকেই তাঁর সিদ্ধান্ত নিতে দেরী হয়ে তিনি নিজের মৃত্যু ডেকে আনেন কিন্তু মৃত্যুর সময়ও এই মহান শাসক তাঁর ন্যাপরায়নতার অনুপম সাক্ষর রেখে যান।

উমরের মৃত্যু দিবসকে (৯ই রবিউল আউয়াল) এখনো ইরানের গ্রামগুলোতে জশনে এ ওমর কোসি হিসেবে উদযাপন করা হয়,আবু লুলুকে ‘বাবা সুজাউদ্দীন’উপাধি দিয়ে তাঁর কল্পিত মাজার বানিয়ে তাকে সম্মান জানানো হয় (কল্পিত কারন আবু লুলুর মৃত্যু হয় মদীনায়,কিন্তু পারসিক শিয়ারা বিশ্বাস করে আলী (রাঃ) উমরের মৃত্যুতে খুশী হয়ে মৃতদেহকে তাঁর কারামত দিয়ে পারস্যে পাঠিয়ে দেয়) । পরবর্তীতে সুন্নিদের থেকে প্রচন্ড চাপে,মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ফোতায়ায় ইরানের সাথে সমস্ত সম্পর্কচ্ছেদের প্রতিক্রিয়ায় ইরান ২০১০ সালে এই মাজার বন্ধ ঘোষনা করে এটিকে পুলিশ ফাঁড়ি হিসেবে ঘোষনা করে। মাজার ধ্বংস না করে পুলিশ ফাঁড়ি বানানো এক ধরনের চালাকি,এতে করে এই মাজার চিরদিনের জন্য সুরক্ষিত হয়ে থাকলো।

উমরনামা -৪, মুসলমানদের জেরুজালেম জয়!!

IMG-20180817-WA0000কিছুদিন আগে মসজিদুল আল আকসা কম্পাউন্ডে আগুন লাগলো। তখন মনে পড়লো,নবী দাউদ (আঃ)ও সুলাইমান (আঃ) প্রতিষ্ঠিত জেরুযালেম নগরী বহুশত বছর পর ,বহু হাত ঘুরে রাসূল (সাঃ)উম্মতের হাতে প্রথম ফিরে আসে আমিরুল মুমেনিন হযরত উমর (রাঃ)র খিলাফতকালে।

রাসূল (সাঃ)র মদীনায় হিজরতের পর থেকেই সাহাবিদের একটি কয়েকটি দল বিভিন্ন রণাঙ্গণে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকতেন,খলীফাদের আদেশক্রমে অভিযানের নেতা,দায়িত্ব,পদ-পদবী সতত পরিবর্তিত হতো। তেমনই এক অভিযানে সাহাবী আবু উবাইদা ইবনে আল জারাহর নেতৃত্বে মুসলিম সেনাবাহিনী সিরিয়া থেকে সামনে অগ্রসর হতে চায়, তাঁদের সামনে ছিলো জেরুজালেম ও বর্তমান ইজরায়েলেরই আরেকটি শহর। দুটোই গুরুত্বপূর্ণ শহর,আবু উবাইদা বুঝতে পারলেন না কোনটিতে আগে অভিযান পরিচালনা করবেন। পরামর্শ চেয়ে পত্র পাঠালেন উমর (রাঃ)কে, উমর জেরুজালেমকে বেছে নিলেন। পত্রপাঠ মাত্রই আবু উবাইদা সদা প্রস্তুত বাহিনী,যাতে ছিলেন সাহাবী খালিদ বিন-আল ওয়ালিদ (রাঃ),ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (কারবালার ইয়াজিদ কিন্তু),আমর ইবনে আল আস(রাঃ),কে নিয়ে সামনে অগ্রসর হলেন,সময় ৬৩৬ সালের নভেম্বর মাস।

জেরুজালেম তখন ৭০খ্রিস্টাব্দের দ্বিতীয় দফা ভয়ংকর আক্রমনের পর পুরোপুরি ইহুদী শুণ্য ,বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অধীন এক খ্রিস্টান ধর্ম নগরী (প্রথমবার আক্রমণ ছিলো ব্যবিলন সাম্রাজ্যের)। এক ধর্মযাজক, নাম সোপ্রিনিয়াস তখন শহরের অধিকর্তা,তার কাছে পৌছে দেয়া হলো আমিরুল মুমেনিন উমরের পত্র,হয় আত্নসমর্পন নয়তো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হোন। সোপ্রিনিয়াস রাজী হলেন না,শহরের মজুদ যথেষ্ঠ ভালো,অনেকদিন কাটানো যাবে,সাহায্যও আসতে পারে, তাই আত্নসমর্পন নয়।
জেরুজালেম ছিলো দূর্গাকৃতির শহর,এখনো ইজরায়েলের অল্ড সিটি তাই আছে। আবু উবাইদা (রাঃ) তাঁর বাহিনী নিয়ে শহরের প্রধান পথ আটকে দিলেন।আটকেই রাখলেন,৬ মাস হয়ে গেলো,সাল ৬৩৬ শেষ হয়ে এলো ৬৩৭।দফায় দফায় পত্র চালাচালি হলো কিন্তু দুই পক্ষই অনড়।সোপ্রিনিয়াস ও অন্যান্য খ্রিস্টানরা অবাক হয়ে গেলেন মুসলমানদের ধৈর্য্য ও দৃঢ়তা দেখে,সাম্রাজ্যের আর কেউ এগিয়েও আসলো না শহর বাঁচাতে এইদিকে মজুদ যা ছিলো তাও শেষ। অবশেষে সোপ্রিনিয়াস রাজী হলো আত্নসমর্পণে তবে শর্ত আছে। সে আবু উবাইদার কাছে আত্নসমর্পন করবে না,স্বয়ং খলীফা আসলে পরে তবে।

উমর (রাঃ) আলী (রাঃ)কে ডেপুটি খলীফার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে মদীনা থেকে যাত্রা শুরু করলেন জেরুসালেমের পথে;সাথে একটিমাত্র উট, এক ভৃত্য আর পথচলার সামান্য শুকনো খাবার। উমর (রাঃ) বলে কথা,রক্তপাতহীন জেরুজালেম জয়ের ইতিহাসের সাক্ষী হবার যাত্রা পথের প্রতি পদক্ষেপে রচিত হতে থাকলো অমর সব ঘটনা।
আমাদের সময়ে মাধ্যমিকের বাংলা বইয়ে অমর কবি নজরুলের উমর (রাঃ)র যাত্রা পথের সেই কাহিনী দেয়া ছিলো।কাহিনীটা অনেকটা এরকম,যাত্রা পথের শুরুতেই উমর ভৃত্যের সাথে একটা বোঝাপড়ায় যান যে উট যেহেতু একটা উনারা ভাগাভাগি করে যাবেন। যতটা পথ উমর (রাঃ) উটের পিঠে চড়বেন ঠিক ততটা সময় ভৃত্যও উটে চড়বেন আর খলীফা রশি ধরে টানবেন,সময় করায় গন্ডায় হিসেব করা হবে। ভৃত্যতো মহা মুশকিলে পরলেন,অর্ধেক দুনিয়ার অধিপতি তাকে উটে চড়িয়ে রশি ধরে টানবেন,কী একটা অবস্থা; কিন্তু উমর কথা শুনলেতো। শুরু হলো উট ভাগাভাগি,একই ঝোলা থেকে খাবার ভাগাভাগি; আবার পালা করে উটকেও বিশ্রাম দেয়া হয়, এই অবলা প্রানীকে কষ্ট দিলে আবার তার জবাবওতো উমরকে আল্লাহকেই দিতে হবে,অতএব সাবধানতা!
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে উমরের জামা যায় জায়গায় জায়গায় ছিড়ে,সমস্যা নেই উনি উটের বিশ্রামের সময় সেলাই করে তালি দিয়ে দেন। এইসব করতে যেয়ে সময় লাগছে বেশী,ওইদিকে দুই পক্ষই যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে তাঁর আগমনের। অবশেষে দূর থেকে দেখা গেলো খলীফা আসছেন। একেতো জেরুজালেম ঢোকার পথটা কর্দমাক্ত ছিলো তারউপর উটে চরার পালা চলছিলো ভৃত্যের।ভৃত্য করজোড়ে বললেন,আমিরুল মুমেনীন আমার পালা আপনি নিন,আপনি বসুন উটের পিঠে,উমর বললেন, ‘না,আমাদের সম্মানের জন্য ইসলামই যথেষ্ট’!
শহরের দ্বারের বাইরে শুধু মুসলিম সৈণ্যরাই না অনেক খ্রিস্টান শহরবাসীও অপেক্ষায় ছিলো। দূর থেকে দেখে তারা ভৃত্যকেই খলীফা ভেবে অপেক্ষায় ছিলেন কিন্তু আবু উবাইদাতো খলীফাকে চিনতেন, তিনি রশি ধরা ব্যক্তিটিকেই অভিবাদন দিয়ে স্বাগত জানালেন।শহরবাসীতো অবাক,এ কেমন রাজা,সৈণ্য-সামন্ত,মন্ত্রী,রক্ষী বিহীন! নিচের জন নাকি খলীফা,তো উপরের জন কে,তাঁরই ভৃত্য!

খলীফার কর্দমাক্ত,তালি দেয়া বস্ত্র দেখে আবু উবাইদা নিজেও সংকুচিত হলেন,বললেন রোমান সম্রাজ্যের শাসকদের শান শওকতের কথা। উমর (রাঃ) জোরে তাঁর বুকে আঘাত করে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তারা ছিলেন সম্মানহীন এক অধঃপতিত জাতি,যা কিছু আজকে তাদেরকে সম্মানিত,উপরে তুলে ধরেছে করেছে তা হলো ইসলাম।ইসলাম ছাড়া যদি অন্য কিছুতে মুসলমান সম্মান খুঁজতে যায় তবে তারা আবার অপমানিত হবে, সাফল্যের একমাত্র পথ রাসূল (সাঃ)’।
সত্যিই তাই,জেরুজেলামবাসী ও মুগ্ধ সোপ্রিনিয়াস খলীফাকে সম্মানের সাথে স্বাগত জানালেন,অনেক শহরবাসী সেদিন তাঁর সারল্য দেখে কেঁদেছিলেন!
উমর (রাঃ) দশদিন জেরুজালেমে ছিলেন,এই কদিনে সোপ্রিনিয়াস খলীফাকে পুরো শহর ঘুরিয়ে দেখালেন। উমর (রাঃ) দেখতে গেলেন নবী সুলাইমান (আঃ) নির্মিত আল আকসা দেখতে,তাঁর প্রিয় নবীজীকে আল্লাহ রব্বুল আলামীন মেরাজের রাতে এখানেই ভ্রমণ করিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দুঃখের সাথে দেখলেন খ্রিস্টানদের হাতে আল আকসার দুরবস্থা, মসজিদতো নয়,নোংরা ঘোড়া রাখার জায়গা। উমর তাৎক্ষনিকভাবে এটি পরিষ্কার করে সেখানে এক কাঠের মসজিদ নির্মানের নির্দেশ দিলেন। মনে রাখতে হবে এখন ইজরায়েলের ইহুদীরা যে দৃষ্টিতে মুসলমানদের দেখে ঠিক একই দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো ইহুদীদের প্রতি খ্রিস্টানদের,আর যাই হোক এরাই ছিলো জেসাসের হত্যাকারী,একসাথে থাকা অসম্ভব।
শহর ঘুরতে ঘুরতে জোহরের নামাযের ওয়াক্ত হয়ে গেলো।উমর তখন এক চার্চের ভিতরে,সোপ্রিনিয়াস উমরকে চার্চের ভেতরেই নামায পড়তে অনুরোধ জানালেন। উমর বিনয়ের সাথে তাকে ফিরিয়ে দিলেন,বললেন আমি ভয় পাচ্ছি আমি এখানে নামায পড়লে মুসলিমরাও এখানে নামায পড়তে চাইবে তাতে আপনাদের চার্চ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। তিনি চার্চের বাহিরে এক কোনায় সিঁড়ির ধাপে নামায আদায় করলেন,বলা হয়ে থাকে ঠিক এই জায়গাতেই দাউদ (আঃ) প্রার্থনা করতেন।পরবর্তীতে এখানে ‘উমরের মসজিদ’ নামে একটি মসজিদ নির্মিত হয়। হোলি সিটি বর্তমানে ইহুদী,খ্রিস্টান ও মুসলিম এই তিন অংশে বিভক্ত কিন্তু ওমরের মসজিদ সব প্রথা ভেংগে খ্রিস্টান অংশেই সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে!

সিরিয়া থেকে মুয়াবিয়া(রাঃ)ও এসে পৌছুলেন,দ্রুত কাজ চলছিলো একটি চুক্তিনামা তৈরীর যা ইতিহাসে ‘উমরের চুক্তি’ নামে পরিচিত।

চুক্তির সারসংক্ষেপটা বলি, ‘এটি এক নিরাপত্তা চুক্তি যা আল্লাহর নামে,বিশ্বাসীদের নেতার (আমির উল মুমিনিন)পক্ষ থেকে খ্রিস্টানদের জান-মাল,চার্চ ও তাদের ক্রুশের প্রতি,সমস্ত রুগ্ন এবং সুস্থের প্রতি,তাদের সমস্ত ধর্মীয় রীতি নীতির প্রতি।তাদের কোন চার্চ মুসলমানরা দখল করবে না এবং ধ্বংসও করবে না,তাদের ফসলের ক্ষতি করবে না,জোর করে কাউকেই ধর্মান্তরিত করা হবে না।তবে খাঁটি রোমানদের জেরুজালেম ছাড়তে হবে,যারা রোমানদের ভালোবাসে তারা রোমানদের সাথে চলে যেতে পারবে,ইচ্ছা।তবে খ্রিস্টানদের নিয়মিত জিজিয়া কর দিতে হবে’।(তারিখ আত তাবারি ২/৪৪৯)

সাথে সাথে পাঁচশ বছর পর ইহুদীদের জন্য খুলে দিলেন জেরুসালেমের দরজা,খ্রিস্টানরা গাঁইগুই করলো কিন্তু উমর বললেন তাদেরও অধিকার আছে এই শহরের উপরে। আফসোস,উমরের সেই মহানুভবতার কী প্রতিদান আজ ইহুদীরা দিচ্ছে!
নতুন করে যোদ্ধাদের দায়িত্ব বন্টন করলেন ,ইয়াজিদকে পাঠানো হয় বর্তমান ইজরায়েলেয় আরেক শহরে অভিযানে, বাদ বাকীদের সিরিয়া আর বাকী ফিলিস্তিন অভিযানে যাতে সমগ্র ফিলিস্তিন,সিরিয়া,মিশর সহ দূরবর্তী আফ্রিকার কিছু অংশ উমরের খেলাফতের অধীনে চলে আসে ৬৪০র মধ্যেই।
অবশেষে যাবার সময় হলো,আমার ভৃত্য,মালিক আর এক উট মিলে মদীনার পথে যাত্রা শুরু হলো,পিছনে রেখে গেলেন বিস্ময়াবিভূত এক শহরকে যারা তাঁকে কখনো ভুলেনি।

দেবী

কানিজ ফাতেমা

লেখাটি ভিডিও-ছবি সহ চাইলে এখানে ক্লিক করুন

বেশ কিছুদিন আগে বিবিসি বাংলায় সিরিয়ার এক প্রাচীন প্রাসাদের বেশ গভীরের দেয়ালে তিন সারিবদ্ধ নারী মূর্তির প্রতিকৃতি নিয়ে এক ভিডিও প্রকাশিত হয়। ভিডিও লিংক, https://www.facebook.com/BBCBengaliService/videos/1026714647527680/

ভিডিওটিতে প্রাচীন যুগের ধর্মে নারীর ভূমিকা ও পূজো নিয়ে বেশ বিস্ময় প্রকাশ করা হলেও বিভিন্ন রুপে ও নামে তিন নারীর পূজো কিন্তু মানব সভ্যতার ইতিহাসের মতই পুরনো।

তিন দেবীর মূর্তি নির্মান ও তাদের আরাধনা ইসলাম আগমন পূর্ব সমগ্র আরব উপদ্বীপ,ইরাক,সিরিয়া,জর্দান, ইয়েমেনের সাবা শহর থেকে পারস্য পর্যন্ত,বিভিন্ন সাম্রাজ্য জুড়ে এক বিশাল সময় ধরে একচেটিয়া ভাবে প্রচলিত ছিলো ;আর এরা হলো আল লাত (Allat) ,আল উযযা (Al Uzza) ও আল মানত (al Manat), এমনকি কোরানেও আছে এই তিন দেবীর নাম। এদের মধ্যে সর্ব বামের জন আল লাত/আল্লাত (Allat) কে আল্লাহর মহিলা প্রতিরূপ (female version of Allah swt) হিসেবে মনে করা হতো ,নামের বানানটা খেয়াল করবেন। আল লাতের গ্রীক প্রতিরূপ হলো এথেনা (Athena) আর রোমান রূপ মিনেরভা (Minerva)। নাবাটিয়ান মাদায়েন সালেহ ও পেট্রাতেও লাত ও তার ছেলে হুবালই ছিলো প্রধান দেব ও দেবী।

তিন নারীর সাথে এক দেবতার নামও আসবে কারন ইতিহাসে এই তিন নারীর জন্ম ও অস্তিত্বের সাথে সেই দেবতার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য আর সে হলো লাত পূত্র হুবাল(Hubal) যাকে স্বয়ং আল্লাহ হিসেবেই ধরা হত,আমি এর পরের পর্বে হুবালকে নিয়ে লিখবো!

তিন দেবীর উৎপত্তিঃ আরবের হেযাযে যাকে আল লাত বলা হত আক্কাদীয় সাম্রাজ্যে তাই ছিলো এল লাত (El lat) নামে পরিচিত। এল লাত (El lat) ছিলো দেবতা এই (EI) র স্ত্রী্‌ ,এই ‘এই’ (EI) কিনা ঘুরে ফিরে সেই নমরুদের সাথেই জড়িত,আল লাত ছিলো মূলত চন্দ্রদেবী আর প্রথম চন্দ্রদেবী ছিলো নমরুদের স্ত্রী,সুতরাং আল লাত কোনভাবে সেই চন্দ্রদেবীরই পরম্পরা।

এদের তিনজনের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে অঞ্চল ও সময়ভেদে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাবেন যার মোটামুটি সবগুলিই সঠিক যেমন কোথাও হুবাল তাদের পিতা আবার হুবাল লাতেরই পুত্র,কোথাও তারা তিন বোন আবার কোথাও আত্নীয়তার সম্পর্কহীন পৃথক দেবী তবে রাসূল (সাঃ)র জন্মের সময়ের আরবে যে বিশ্বাস প্রচলিত ছিলো তা হলো এরা আল্লাহরই তিন মেয়ে। কোরান তাদের সম্পর্কে বলছে;

‘তোমরা কী ভেবে দেখেছ লাত ও উযযা সম্বন্ধে।এবং তৃতীয় আরেকটি মানত সম্বন্ধে? তোমাদের জন্য কি পুত্র সন্তান আর আল্লাহর জন্য কন্যা সন্তান?এমন অবস্থায় এটা তো বড় অসম বন্টন হল। এগুলোতো নিছক নাম মাত্র,যা তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষরা রেখেছ,এর সমর্থনে আল্লাহ কোন প্রমান নাযিল করেননি…’ (সূরা আন নাজমঃ১৯-২৩)

প্রাচীন আইরিশ ধর্মেও আছে তিন দেবী, শেক্সপীয়রের ‘ম্যাকবেথের’ তিন ডাইনী (three witches)তো বিখ্যাত।

আচ্ছা অনেকতো আরব,গ্রীক আর রোমান সম্রাজ্য ঘুরে বেরালাম এবার একটু আমাদের এখানে চোখ ফেলি। লাত-উযযা-মানত, এথেনা-ভেনাস-আফ্রেদিতির মত আমাদের এখানেও পূজিত তিন নারী দেবীর সাদৃশ্য পাবেন।তারা হলো সরস্বতী,পার্বতী (দূর্গা)ও লক্ষী।

সবচেয়ে আশ্চর্য মিল লাতের বাহন আর দূর্গার বাহনে,সিংহ! লাতের আরেক নামই ছিলো সিংহী দেবী; the lioness goddess. তাদের মোটামুটি সবারই কোঁকড়ানো চুল।এথেনার আছে পেঁচা আবার লক্ষীর বাহনও পেঁচা।

সরস্বতীর রোমান রুপ হলো ভেনাস (Venus) ,গ্রীক আফ্রোদিতি (Afrodite) আরআক্কাদিয়ান (akkadian) রুপ ইস্টার (Ishtar)। নাম ভিন্ন হলেও সব সময়ই এই দেবী প্রেম-ভালোবাসা,কামনা,সংগীত ও ক্ষমতার দেবী। বাংলাদেশের হিন্দুরা বেশ রক্ষণশীল বলে আমদের দেশে সরস্বতী বিদ্যার দেবী হিসেবে বহুল প্রচলিত হলেও এটি একইসাথে প্রেম-ভালোবাসারও দেবী। বসন্তের শুরুতেই এই দেবীর পুজো তাই জীবনে বসন্ত আনার সাথে সম্পর্কযুক্ত।

লাতের পুত্র যেমন হুবাল তেমনি দূর্গার ছেলে কার্তিক। তবে দুর্গা পুত্র কার্তিকের চেয়ে আল লাত পূত্র হুবালের অবস্থান ছিলো অনেক উপরে। কাবা শরীফের তিনশ ষাটটি মূর্তির মধ্যে সবচেয়ে বড় মূর্তিটি ছিলো হুবালের এমনকি কাবাকে তার জন্য উতসর্গকৃত মনে করা হত। তবে এখানেও মজার ব্যপার হলো কার্তিকের অস্ত্র যেমন তীর ধনুক দেবতা হুবালের সামনেও ঠিক এমনি তীর ধনুক রাখা হতো; আরবের লোকেরা বিভিন্ন সিদ্বান্ত নিতে তাকে পূজা দিয়ে এই তীর ধনুক ছুড়েই সিদ্বান্ত নিতো।

আবার যেমন কোথাও হুবাল কন্যা লাত, কোথাও লাত পূত্র হুবাল ঠিক তেমনি হিন্দু ত্রিদেবীর সম্পর্কও গোলমেলে। শাস্ত্রমতে দেবতা ব্রক্ষ্মা যেমন সরস্বতীর পিতা আবার একই সাথে তার স্বামীও। তাহলে ব্রক্ষ্মা যদি সরস্বতীর পিতা হয় তবে বাংলাদেশে যেমনটা বলা হয় যে দূর্গা লক্ষী ও সরস্বতীর মা তা ধোপে টিকে না কারন দূর্গার স্বামী আবার দেবতা শিব। বাংলার এই দিকটা ছাড়া অবশ্য ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে তাদের আত্নীয়তার সম্পর্ক নেই বরং আলাদা আলাদাভাবে পূজিত হয়। এইসব সম্পর্ক বেশ গোলমেলে,অত ঘাঁটাঘাটির দরকারও নেই আমি আগেই বলেছি একটা বিশাল অঞ্চল ও সময় জুড়ে এইসব পূজার প্রচলিত হওয়ায় পূজার ধরন মূল সুর ঠিক রেখে সময় ও স্থানভেদে কিছু কিছু বদলে যায়।

তো লাত-উযযা-মানতের কী এমন হয়েছিলো যে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়না। আপনারা যারা হূমায়ুন আহমেদের ‘দেবী’ উপন্যাস পড়েছেন তারা জানবেন উপন্যাসের নায়িকা রানুর উপরে এক ভাঙ্গা মন্দিরের দেবী ভর করে থাকতো, এখন কথা হলো এটা কী শুধুই লেখকের কল্পনা নাকি বাস্তব। নারী মূর্তির ভেতরে খালিদ বিন ওয়ালিদের (রাঃ)র হাতে আল উযযার মূর্তি ধ্বংস হয়,মূর্তি ভাঙ্গার খবর নিয়ে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)রাসূল (সাঃ)র কাছে ফিরে আসেন। রাসূল (সাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি আর কিছু দেখনি? তিনি উত্তর দিলেন ‘না’। রাসূল (সাঃ)তাঁকে বললেন, ‘তুমিতো আসল কাজটাই করোনি।‘

এই কথা শুনে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ আবার ফিরে গেলেন।দেখতে পেলেন এলোমেলো চুলের এক নগ্ন নারীকে।সে চিৎকার করছে আর নিজের গায়ে ময়লা ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারছে। ভয়ংকর এক দৃশ্য।কিন্তু খালিদ ইবনে ওয়ালিদ তো আর ভীত হবার পাত্র নন,তলোয়ারের এক কোপে তাকে হত্যা করলেন।

রাসূলাল্লাহ সব শুনে বললেন,হ্যা, ‘এটাই ছিলো আল উযযা।তুমি তাকে হত্যা করেছো,আজকের পর উযযযা বলে আর কিছু নেই।’ (সীরাহ শেষ খন্ড,পৃঃ৩২২)

একই ভাবে ধ্বংস করা হয় মানাতকেও। এই অভিযানে পাথানো হয় আল-আশহালীকে (রাঃ)।মোট বিশজন সৈন্য নিয়ে তিনি মানাত ধ্বংস করতে গেলেন,মানাতের রক্ষক তাদের বললো,

-কেন এসেছ?

-মানাত ধ্বংস করতে

-করো দেখি কী করতে পারো।

সাদ মুর্তির দিকে এগিয়ে গেলেন।বেরিয়ে এলো এক কালো নারী,সে মুখ দিয়ে আজেবাজে বকছিলো। সাদ প্রথমে সেই মহিলাকে হত্যা করলেন,এরপর মুর্তি ধ্বংস করে ফিরে এলেন।(সীরাহ শেষ খন্ড,পৃঃ৩২২)

রাসূল (সাঃ)র কথা মোতাবেক আল উযযা আর মানতের পূজো কী আসলেই শেষ হয়েছিলো, হ্যাঁ, ইতিহাস ঘেটে আল উযযা আর মানতের পুজোর কোন চল আর কখনোই দেখতে পাওয়া যায় না বটে কিন্তু ভিন্ন নামে ও রুপে তিন দেবীর পূজোর চল আছেই।

দেবী কালী দেবী দূর্গারই কৃষ্ণ রুপ আর তার গৌড় (ফর্সা) রুপের নাম পার্বতী। যা দূর্গা তাই কালী; নামের অর্থ যে বা যিনি কালো/শ্যাম বর্ণের।সে সময়,মহাকাল ও মৃত্যুর দেবী।আদি রূপে কালী নগ্ন ও একমাথা খোলা চুলের অধিকারী।

খেয়াল করে দেখবেন হিন্দু ধর্মের আরেক নাম সনাতন ধর্ম, এমন ধর্ম যা সেই আদিকাল,বহুকাল ধরে চলে আসছে। কিন্তু প্রাচীন সভ্যতাগুলো খুঁজে দেখলে দূর্গা,সরস্বতীর কোন নামই পাওয়া যায় না কিন্তু এই ধর্মের নাম অনুসারেই তাদের দেবীরা বহুকালের পূজিত দেবী।

আবার ফিরে যাই বিবিসির সেই ভিডিওতে, তিন নারীর পাশাপাশি সেখানে আছে পাখির ডানা সমৃদ্ধ এক অর্ধ মানব,অর্ধ ঘোড়া বা হাতীর প্রতিকৃতি যার নাম লামাসসু (Lamassu)।দেখতে পুরুষ মনে হলেও লামাসসুকে দেবী হিসেবেই ধরা হয়।লামাসসু একাধারে ব্যবিলনিয়,সুমেরিয় ও আক্কাদিও দেবী তবে তার ধ্বংসাবশেষ এখন সবেচেয়ে বেশী পাওয়া যায় বর্তমান ইরাকের নিমরুদ শহরে।

তথ্যসূত্রঃ১।http://yavuztellioglu.blogspot.com/2015/07/the-three-daughters-of-semitic-god-hubal.html

২।রেইন্ড্রপস সীরাহ

উমরের তারাবীহর নামায প্রচলন; সুন্নত না বিদাত! (উমরনামা (রাঃ)-৫)

উমরনামা(রাঃ)-৫

রমযান মাসে তারাবীর নামায মসজিদে জামাতবদ্ধভাবে পড়ার চল শুরু করেন উমর (রাঃ) তাঁর খিলাফতের দ্বিতীয় বছর, ৬৩৬/৬৩৭ সালে।

বুখারী শরীফ থেকে পাওয়া,আব্দ আর রহমান ইবনে আব্দ আল কারির ভাষ্যমতে, উমর (রাঃ)রমযানের এক রাতে মসজিদে গিয়ে দেখেন মসজিদে মুসল্লিরা সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে নামায পড়ছে,কেউ একাকী,কেউ দলবদ্ধভাবে। এমন এলোমেলো অবস্থা দেখে উমর (রাঃ) ভাবলেন যদি এই বিচ্ছিন্ন মুসল্লিদেরকে একজন ক্বারীর পিছনে এক করে দেয়া যেতো! এরপরই তিনি মসজিদের সব মুসল্লিকে এক ক্বারী,সেই মসজিদে উপস্থিত হযরত উমর ইবনে ক্বাব (রাঃ)র পিছনে জামাতবদ্ধভাবে তারাবী আদায় করতে আদেশ দিলেন আর রাকাত সংখ্যা নির্ধারন করে দিলেন বিশ যদিও তিনি সেদিন নিজে ওই নামাযে শরীক হোন নি।সাধারনত খলীফা বা আমিরুল মু’মেনীন হিসেবে নামাযের ইমামতি তাঁর স্বাভাবিক দায়িত্বের অন্তর্ভূক্ত ছিলো,কিন্তু সেদিন তিনি তারাবীর নামাযের ইমামতি নিজে করেননি এমনকি কখনো এই নামায পড়িয়েছেন এই বর্ননাও আমি খুঁজে পাইনি। তবে তিনি নিজে সরেজমিনে এই নামাযের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন,যেমন একদিন মসজিদে হজরত উবাই (রা.)এর ইমামতিতে তারাবির নামাজ চলছে, মসজিদের পরিবেশ দেখে ওমর (রা) মুগ্ধ হলেন এবং বললেন, চমৎকার আবিষ্কার এটি।

এখন প্রশ্ন আসে মোট তিনটি;

১।রাকাত সংখ্যা বিশই কেন?

তারাবীর নামায হাদীস দিয়ে নির্দিষ্ট না,সর্বনিম্ন আট রাকাত থেকে সর্বোচ্চ,ছত্রিশ,চল্লিশ রাকাতের দলীল পাওয়া যায়,কিন্তু জামাতবদ্ধ নামায এত অনির্দিষ্টভাবে দীর্ঘদিন চালানো অসম্ভব তাই উমর (রাঃ) রাকাত সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দিলেন,তবে যার যত রাকাত খুশী সে বাড়ীতে তার মত করে পড়ে নিতে পারবে,বিশ রাকাত শুধুমাত্র জামাতে পড়ার ক্ষেত্রে!

২।রাসূল (সাঃ) যে কাজ করতে আদেশ দেননি তা উমর (রাঃ)চালু করলে মুসলমানরা মানতে বাধ্য কিনা,কারন দিনশেষে এটিতো একটি বিদাত (ইসলামে নতুন সংযোজন), স্বয়ং উমর (রাঃ)র মতে ‘কত চমৎকার আবিষ্কার এটি’

বিদাত অর্থ ইসলামে এমন নতুন কোন কিছু ঢোকানো যা রাসূল (সাঃ) জীবনে কখনো করেননি বা আদেশ করেননি। রাসূল (সাঃ)যে রমযানের কিয়ামুল লাইল কখনোই মসজিদে জামাতবদ্ধ অবস্থায় পরেননি তা নয়, তিনি এরকম এক রমযানে পরপর দুইদিন মসজিদে কিয়ামুল লাইল পড়ালেন,তৃতীয় ও চতূর্থদিন তিনি দেখলেন রাসূল (সাঃ) নামায পরাবেন বলে মসজিদ কানায় কানায় পরিপূর্ন হয়ে গিয়েছে। উনি ভয় পেলেন যে তাঁর উম্মত মসজিদেই কিয়ামুল লাইল পড়া ফরয না করে ফেলে। উম্মতের জন্য কষ্টকর হয়ে যাবে তাই তিনি ঘর ছেড়ে মসজিদে গেলেন না।একই ঘটনা উনার জীবনে কয়েকবার ঘটেছে, লোক সমাগম বেড়ে গেলেই রাসূল (সাঃ) ছেড়ে দিতেন,কমলেই মসজিদে ফিরে আসতেন।

তবে কখনো মসজিদে সাহাবীদের নফল নামায ছন্নছাড়া ভাবে পড়তে দেখলে তিনি সবসময় উমর (রাঃ)র মতই এক ইমামের পিছনে একত্রিত করে দিতেন,সুতরাং তারাবীহর জন্য মুসল্লিদের এক করে উমর কিছুতেই বিদাত করেননি বরং রাসূল (সাঃ)র সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয়ের উত্তম অনুসরন ও সম্মিলন করেছেন,সুবাহানাল্লাহ!

জামাতবদ্ধ অবস্থায় রাসূল (সাঃ) এত দীর্ঘ সময় ধরে কিয়ামুল লাইল করাতেন যে সাহাবীরা ভাবতেন যে সেহেরী খাওয়ার সময়ই না শেষ হয়ে যায়!

তাঁর মৃত্যুর পর যেহেতু এই নামযের ফরয হবার সম্ভাবনা চিরতরে রহিত হয়ে গেছে তাই এখন জামাতবদ্ধ হয়ে মসজিদে পড়ায় কোনই দোষ নেই, উনি নিয়মিত মসজিদে জামাতবদ্ধ হয়ে পড়েননি তবে সাহাবিদের পড়তে কখনো নিষেধও করেননি।

একই রকম অন্য একটি হাদীসে রাসূল (সাঃ)সাহাবীদের নফল নামায ঘরে পড়া উত্তম বলে উপদেশ দেন তবে আমি খেয়াল করে দেখলাম হাদীসটি রমযান মাসের কিয়াম না বরং অন্যান্য মাসের কিয়ামুল লাইল নিয়ে বর্নিত। আবার উমর (রাঃ) চালু করলেও এটি ফরজ হয়ে যায় নি,চিরকাল রসূলের সুন্নতে মুয়াক্কাদাই থাকবে।

৩। তাহাজ্জুদ ও তারাবীহ কী একই, উমর কী রাতের শেষ ভাগের তাহাজ্জুদ নামাজের সময় সন্ধ্যায় এনে দিয়ে বিদাত করলেন?

তাহাজ্জুদ ও তারাবীহ দুটো নামই পরবর্তী নামকরণ,নবীজির যুগে দুটো নামাযকেই সাধারণত শুধু কিয়ামুল লাইল নামেই ডাকা হতো,তবে রাসূল (সাঃ) রমযানে নফল নামায সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু করতেন,সন্ধ্যার পরের নামাযকে আরবীতে বলা হয় ‘আতামাহ’ আর বছরের বাকী সময় মধ্য রাতের পর থেকে নামায শুরু করতেন। তাই স্পষ্টতই তাহাজ্জুদ আর তারাবীহ এক নামায না আর তাই উমর (রাঃ)ও নতুন কিছু চালু করেননি।

আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে ইসলাম মানেই রাসূল ও তাঁর সাহাবীরা যা করে ও বলে গেছেন। উমর (রাঃ) যখনই উমর ইবনে ক্বাবের নেতৃত্বে জামাতে কিয়ামুল লাইল বিশ রাকাত করে আদায় করতে বলেছেন সেই মুহুর্তেই সবাই বিনা বাক্যব্যয়ে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন,তাদের অনেকেই স্বয়ং রাসূল (সাঃ)কে এই নামাজ পড়তে দেখেছেন বা তাঁর পিছনে নামায আদায় করেছেন। তারা সবাই উমরের আদেশ কোন প্রশ্ন না তুলেই মেনে নিয়েছেন,হোক জামাতবদ্ধ তারাবীহ কিংবা রাকাত সংখ্যা। সাহাবীরা যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেননি সেখানে আমাদের তোলা বেয়াদবি!

কিয়ামুল লাইল কখন ‘তারাবীহ’ হলো?

গবেষকদের মতে সম্ভবত উমাইয়া খেলাফতকালে যখন সাহাবীদের সক্ষমতার তুলনায় মুসলমানদের দীর্ঘ কুরআন শোনা ও পড়া দুইই কমে আসতে লাগলো (সাহাবী ও তাদের পরবর্তী কয়েক প্রজন্ম এত দীর্ঘ সময় কিয়াম করতেন যে দাঁড়িয়ে থাকতে তাদের লাঠির প্রয়োজন হতো) তখন এই নামাজের মাঝখানে বিরতির প্রয়োজনও দেখা দিলো,সাধারনত প্রতি চার রাকাত পর একটু বসা হতো,সেই থেকেই এর নাম হয়েছে তারাবীহ যার অর্থ বিশ্রাম।

উমর (রাঃ) নিজে কখনো এই নামাযের ইমামতি না করলেও তাঁর পরবর্তী দুই খলিফা উসমান ও আলী (রাঃ) তারাবীর নামাজের ইমামতি করেছেন,মহিলাদের জন্য আলাদা ক্বারীর ব্যবস্থাসহ। সমগ্র উম্মাইয়া ও আব্বাসীয় খেলাফতকালেই বিশ রাকাত তারাবীহর সিলসিলা জারি ছিলো।

বছরের অন্য সময়ের কিয়ামুল লাইল নফল হলেও রমযানের কিয়ামুল লাইল সুন্নতে মুয়াক্কাদা অর্থাৎ বিনা কারনে এই নামায ছাড়া যায়না,ছাড়লে কঠিন গুনাহ হবে,কিন্তু সাম্রাজ্যের যত বৃদ্ধি হতে থাকলো তত বেশী মুসলমানও বাড়তে থাকলো আবার সবার কুরানের দক্ষতা সাহাবীদের মতও না আর ভবিষ্যতেও তাদের সমতুল্য কোরান বোঝা,শোনা ও প্রয়োগ করা মুসলমানদের জন্য অসম্ভব তাই উমর (রা) সবাইকে এক ইমামের কাতারে কোরানের সংস্পর্শে এই রমযানের এই নামায আদায় করার ব্যবস্থা করে দিলেন।

শেষ করবো,উমর (রাঃ)র জন্য আলী (রাঃ) এক সুন্দর দোয়া দিয়ে,আলী (রাঃ) ততদিনে মদীনা ছেড়ে কুফায় নিজের প্রশাসনিক রাজধানী স্থাপন করেছেন।একদিন কুফা শহরে বের হয়ে মসজিদে মসজিদে তারাবীহর নামায আদায় হতে দেখে তিনি উমর(রা)-এর জন্য দুয়া করেছিলেন।

আবু ইসহাক হামাদানী হতে বর্নিত, একদিন আলী বিন আবি তালিব(রা) রমযানের প্রথম রাতে বের হলেন, যখন বাতিগুলো জ্বলছিল এবং মসজিদে কিতাবুল্লাহ(কুরআন) তিলাওয়াত হচ্ছিল। তখন আলী(রা) দুয়া করলেন- আল্লাহ্‌ আপনার কবরকে নূর দ্বারা পূর্ণ করুন হে উমর বিন খাত্তাব! যেভাবে আপনি আল্লাহ্‌র ঘরকে কুরআন দ্বারা আলোকিত করেছেন।

taraweehরমযানের এই দিনে আল্লাহ রব্বুল আলামীন উমর (রাঃ)র জন্য আলী (রাঃ)র দোয়া কবুল করুন,কত উত্তম সাহাবীই না তাঁরা ছিলেন।

উমরনামা (রাঃ)-৩, নববর্ষ, হিজরী পঞ্জিকা

উমরনামা-৩

উমর বিন আবদুল খাত্তাব (রাঃ) প্রথম ইসলামি সন বা দিনপঞ্জিকা প্রবর্তন করেন।বাংলা নববর্ষের প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে হিজরি নববর্ষের কথা বলছি;বিষয়টা যতটা বেমানান শোনাচ্ছে তা কিন্তু মোটেও নয়; কেন নয় তা পরে বলছি!

প্রাচীন আরবে বছর গণনা করে হিসেব রাখা হতনা কিন্তু তাদেরও রজব,শাবান,রমযান এইসব নামে নিজস্ব বারোটি মাস ছিলো ঠিক যেমনটি আছে আজকের দিনে।কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলে সেই বছরকে সেই ঘটনা দিয়ে চিহ্নিত করা হত যেমন রাসূল (সাঃ)র জন্মের বছরকে বলা হয় ‘হস্তীর বছর’ (The year of Elephant) উমর (রাঃ)র সময়ে ইসলামী সাম্রাজ্য ছড়িয়ে পড়ে গোত্র ভিত্তিক আরব ছাড়িয়ে বহুদূরে।হাজারো প্রশাসনিক কাজ ও কাগজপত্রের ছড়াছড়ি। এমন সময় সাহাবী আবু মূসা আল-আশ’হারী থেকে একটি চিঠি পান খলীফা; যে আমিরুল মুমেনিন থেকে তিনি অনেক চিঠি পান কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন না কোন চিঠির আদেশ মান্য করতে হবে।চিঠিতে তারিখ দেয়া থাকে শাবান মাস,কিন্তু এই শাবান মাস কোন শাবান মাস,যে শাবান মাস শেষ হয়ে গিয়েছে না যে শাবান মাস আসবে।

এরপরই উমর সাহাবীদের নিয়ে সভা ডাকেন,তিনি বলেন রাষ্ট্রের প্রয়োজনে প্রচূর অর্থ চারদিকে খরচ হচ্ছে কিন্তু কোন সুনির্দিষ্ট তারিখ রাখা যাচ্ছেনা,এই বিষয়ের কী সমাধান করা যায়?
তখন পারস্য থেকে আসা উমরের হাতে ধর্মান্তরিত আল হরমুযান নামে এক ব্যক্তি বললেন যে তার দেশ পারস্যের নিজস্ব বছর রয়েছে,নাম মাহরুজ।মাহরুজ তাদের বিজয়ী সম্রাটদের নামে প্রবর্তিত হয়,যখনই কোন নতুন রাজা কোন কিছু জয় করেন তখন আবার নতুন করে মাহরুজ বছর শুরু হয় অর্থাৎ বছর শুরুর কোন নির্দিষ্ট দিন নেই।

ইহুদী থেকে ধর্মান্তরিত কয়েকজন বললেন আমাদের ইহুদীদের নিজস্ব সন রয়েছে গ্রীক বীর আলেকজেন্ডারের উপর ভিত্তি করে। কিন্তু বহু দূরদেশের কোন পঞ্জিকা মেনে নিতে কারোই সায় ছিলো না।
উমর (রাঃ) আরবের প্রচলিত চন্দ্র পঞ্জিকাই নিতে সিদ্ধান্ত নিলেন কিন্তু শুরু করবেন কবে থেকে? সভার সবাই একমত হল যে যদি কোন ইসলামি পঞ্জিকা শুরু করতে হয় তবে তা শুরু করতে হবে রাসূল (সাঃ)র উপর ভিত্তি করেই। তাঁর জন্মসালকে নেয়া যায় কিংবা প্রথম নবুওত প্রাপ্তির দিনকে। উমর (রাঃ)রাসূল (সাঃ)র সুন্নত, রাসূলর জন্মসাল নিয়ে তাঁর নিজের মনোভাব জানতেন। রাসূল (সাঃ) কখনোই নিজের জন্মসাল,জন্মদিন নিয়ে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন না আর আমি আগেও বলেছি আরবে এভাবে বছরের কোন হিসাব রাখা হতনা, রাসূল (সাঃ)নিজেও এ নিয়ে তাঁর জীবদ্দশায় কোন গবেষণা চালাননি। তাই উমর (রাঃ) প্রথমেই এই প্রস্তাব খারিজ করে দেন,নবুওত প্রাপ্তির বেলায়ও একই দশা,বছরের হিসেব কেউ রাখেনি,এটাও বাদ। উনার মৃত্যু দিবস উম্মাহর জন্য কষ্টদায়ক সুতরাং এটাতো প্রথমেই বাদ।(খেয়াল করে দেখবেন রাসূল (সাঃ)র মৃত্যু দিবস সাহাবীদের জন্য কষ্টদায়ক হলেও আমাদের দেশে অনেকেই এইদিন ধুমধামের সাথে জন্মদিন হিসেবে পালন করে,মিছিল করে,তবারক বিতরন করে,আফসোস!)

এমন সময় আলী (রাঃ) বলেন হিজরতের বছরকে দিয়ে হিজরি সন শুরু করতে,উমর (রাঃ)রও খুব পছন্দ হল এই কথা। তো আলী (রাঃ)র পরামর্শ অনুসারে হিজরতের বছর থেকেই শুরু হবে নতুন ইসলামি পঞ্জিকা বা হিজরি সন।

গ্রেগরীয়ান পঞ্জিকা অনুসারে তখন ছিলো উমর (রা) খিলাফতের চতূর্থ বছর,৬৩৯ খ্রিস্টাব্দ। হিজরত হয়েছে তারও ১৭ বছর আগে ৬২২ খ্রিস্টাব্দের রবিউল আউয়াল মাসে সুতরাং ৬২২ থেকেই শুরু হল হিজরি সন। এবার লাগবে মাস,আরবী চন্দ্র পঞ্জিকা মহররম মাস দিয়ে শুরু হত,উনিও তাই রেখে দিলেন,আরবের দীর্ঘ দিনের মাসের হিসেব গোলমাল করে রবিউল আউয়াল মাস দিয়ে শুরু করলেন না।

সুদীর্ঘ বিভিন্ন খেলাফতের শাসনের অধীনে থেকে এই উপমহাদেশের মানুষ চিরকাল হিজরী সালকেই অনুসরন করেছে। ঠিক কবে কখন হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে প্রথম বাংলা সন প্রবর্তিত হয়ে আজকের অবস্থায় এসেছে তা জানা যায়না,তবে ‘সাল’ ও ‘সন’ নামকরন দেখে গবেষকরা বলেন এটি অবশ্যই কোন মুসলমান শাসকের দ্বারাই প্রবর্তিত হয়েছিলো। পন্ডিত ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে এটি মোঘল সম্রাট আকবরের ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ থেকে প্রবর্তিত। সম্রাট আকবর তার সিংহাসনে বসার সাল ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দকে স্মরনীয় করে রেখে হিন্দু পঞ্জিকার সাথে হিজরী সাল মিশিয়ে বঙ্গাব্দ শুরু করেন ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে এসে। কিন্তু মজার ব্যপার হল বাংলা সন কিন্তু পহেলা সন হিসেবে শুরু হয়নি বরং সেই বছরের হিজরী সাল অক্ষুণ্ণ রেখেই অর্থাৎ ৯৬৩ হিজরি সন থেকেই শুরু হয় প্রথম বাংলা সন বা ৯৬৩ বংগাব্দ। বৈশাখ মাস দিয়ে বছর গণনা শুরু করেন কারন যে বছর থেকে বাংলা সন শুরু হয় সে বছরের মহররম মাস বৈশাখ মাস দিয়ে শুরু হয়।
কিন্তু বছরের কয়েকটা দিন খাজনা আদায়য়ের জন্য আকবরের নতুন পঞ্জিকা শুরু করার কী দরকার ছিলো,‘পুন্যাহ’ বলে বৈশাখে আগেও খাজনা আদায়ের চলতো ইতিহাসে পাওয়াই যায়।হতে পারে আকবরের সব কিছুতে নিজের প্রবর্তিত দীন-ই-ইলাহী ধর্মের চল করতে চেয়েই হিন্দু পঞ্জিকা আর হিজরী সনের সংমিশ্রণে এই নতুন পঞ্জিকা চালু করেন,পঞ্জিকার নামটা খেয়াল করবেন তারিখ ই ইলাহী!

কিন্তু আজ ১৪২৬ বঙ্গাব্দের অর্ধেকেরও বেশী সময় জুড়ে আছে যে হিজরী সন, বাংলার নববর্ষ উদযাপনে একবারোর জন্যও আসে না রাসূল (সাঃ) ও উমর (রাঃ)র নাম।

১.http://www.alsadiqin.org/en/index.php/Caliph_%27Umar,_Started_the_Muslim_Calendar,_639_CE

উমরনামা (রাঃ)-২,সূরা মুজাদিলাহ

কানিজ ফাতেমা

যতবার কোরানের সূরা মুজদালাহ/মুজাদিলাহর প্রথম চার আয়াত পড়ি, আমার ঠোঁটে হাসি লেগেই থাকে,আশে-পাশে কেউ থাকলে জিজ্ঞেস করে ‘আরে, হাসো কেন’, হাসির কারন এই আয়াতের সাথে জড়িত প্রিয় তিনজন মানুষ;রাসূল (সাঃ),উমর (রাঃ) ও এক কুরআনি নারী! সে এক লম্বা কাহিনী!

এই সূরা এক নারীর নামে নাযিল হয়েছে,খাওলা বিনতে সা’লাবা,আউস ইবনে আল-সামিত (রাঃ)র স্ত্রী,একমাত্র মহিলা সাহাবী যার নাম কোন নবী পরিবারের সাথে সংশ্লিষ্ট না হয়েও কোরানে এসেছে;তাও আবার এমন কোন তথাকথিত নারীসুলভ মহৎ কর্মের বা উৎসর্গের জন্য নয় বরং রাসুল (সাঃ)র ফয়সালা পছন্দ না হয়ে তাঁর সাথে তর্কাতর্কি করে আল্লাহর কাছে বিচার দেবার জন্য। জিবরাঈল (আঃ) ওহী নিয়ে না আসা পর্যন্ত উনি বলেই যাচ্ছিলেন অবশেষে সরাসরি আল্লাহর ফয়াসালা পেয়েই উনি ক্ষান্ত ও সন্তুষ্ট দুইই হলেন।

আরবী শব্দ ‘মুজাদালাহর’ অর্থ সেই নারী যে কাতর ভাবে অনুনয়-বিননয় করে (the pleading woman ) অথবা যে নারী বাদানুবাদ,তর্কাতর্কি করে (the woman who argues)। একদিন স্ত্রীর সাথে দুইকথা নিয়ে সামিত খাওলাকে বলে বসলেন যে তাঁর পেছন দেখতে তাঁর মায়ের মত।অজ্ঞতার যুগে আরবে স্ত্রীকে তালাক দিতে হলে এই কথা বললেই তালাক হয়ে যেতো,তবে তালাক বলা হতো না ,বলতো ‘যিহার’।

সাহাবী আউস ইবনে আল-সামিত (রাঃ) একদিন স্ত্রীর সাথে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে রাগের মাথায় খাওলা (রাঃ)র পেছনকে থেকে মায়ের মত লাগে বলে বেরিয়ে গেলেন (এককালে বাংলাদেশের পুরূষরাও এই করতো,এখনও চায় কিন্তু কঠোর আইনের কারনে করতে পারে না)।
এরপর বন্ধুস্থানীয় লোকদের সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে,ঘুরে ফিরে এসে উনার মাথাও ঠান্ডাও হলো, উনি বুঝতেও পারলেন যে কী কান্ড ঘটিয়েছেন।তিনি অনুতপ্ত হয়ে আবার খাওলার সাথে একসাথে থাকতে চাইলেন কিন্তু খাওলা সাফ মানা করে দিলেন এই বলে যে কথা শোনার পর তার আর কোন অধিকার নেই তাঁর সাথে থাকার।সোজা কথায় কাজ না হওয়ায় হুমকি দিলেন,জোর করলেন কিন্তু খাওলার উপর জোর খাটানো যেতো না। উপায় না দেখে অবশেষে সামিত (রাঃ) দাওয়ায় বসেই কান্নাকাটি শুরু করলেন। অবস্থা এই দেখে খাওলা রাসূল (সাঃ)র কাছে ফয়সালা চাইতে চলে গেলেন ,তাঁর সামনে বসে বিস্তারিত সব খুলে বললেন। সব শুনে রাসূল (সাঃ) বললেন,আমার মনে হয় আরবের প্রথা অনুযায়ী তোমাদের তালাক হয়ে গিয়েছে।

কিন্তু খাওলা (রাঃ) মানলে তো,তিনি বলতেই থাকলেন,না কেন তালাক হবে,উনি বদমেজাজি মানুষ,এখনতো ভুল বুঝতে পেরেছেন,আমি আমার যৌবন তাকে দিয়েছি,তার সন্তান ধারন করেছি,এখন আমি কোথায় যাবো,উনি বৃদ্ধ মানুষ,আমি চলে গেলে তাঁকে কে দেখবে আর বলতেই থাকলেন।
রাসূল (সাঃ)ও নিরুপায়,তিনি আর কীইবা বলতে পারতেন তবে উনি তাঁকে তাড়িয়েওতো দেননি,সারাজীবন তিনি সাহাবীদের অভাব-অভিযোগ,পরামর্শ শুনেছেন,চেয়েছেন এইবারও তাই। শুধু বললেন খাওলা,তোমার বৃদ্ধ কাজিন (উনারা আত্নীয় সম্পর্কের ছিলেন)সামিতের ব্যপারে আল্লাহকে ভয় করো,তাকে ছেড়ে দাও। কিন্তু খাওলা (রাঃ) কিছুতেই মানছিলেন না আর এর কিছুক্ষণ মধ্যেই তাঁর জিদের জয় হয়েই নাযিল হলো সূরা মুজাদালাহর প্রথম চার আয়াত!

১) আল্লাহ অবশ্যই সে মহিলার কথা শুনছেন যে তার স্বামীর ব্যাপারে তোমার কাছে কাকুতি মিনতি করেছে, এবং আল্লাহর কাছে অভিযোগ করছে৷ আল্লাহ তোমাদের দু’জনের কথা শুনছেন তিনি সবকিছু শুনেন ও দেখেন।

২) তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে “যিহার” করে তাদের স্ত্রীরা তাদের মা নয়৷ তাদের মা কেবল তারাই যারা তাদেরকে প্রসব করেছে ৷ এসব লোক একটা অতি অপছন্দনীয় ও মিথ্যা কথাই বলে থাকে ৷ প্রকৃত ব্যাপার হলো, আল্লাহ মাফ করেন, তিনি অতীব ক্ষমাশীল৷

৩) যারা নিজের স্ত্রীর সাথে “যিহার” করে বসে এবং তারপর নিজের বলা সে কথা প্রত্যাহার করে এমতাবস্থায় তারা পরস্পরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি ক্রীতদাসকে মুক্ত করতে হবে৷ এর দ্বারা তোমাদের উপদেশ দেয়া হচ্ছে৷ তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত৷

৪) যে মুক্ত করার জন্য কোন ক্রীতদাস পাবে না সে বিরতিহীনভাবে দুই মাস রোযা রাখবে- উভয়ে পরস্পরকে স্পর্শ করার পূর্বেই৷ যে তাও পারবে না সে ষাট জন মিসকীনকে খাবার দেবে৷ তোমাদেরকে এ নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এ জন্য যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ওপর ঈমান আনো৷ এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত ‘হদ’৷ কাফেরদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি৷

ঘটনা এখানেই শেষ হলে তাও কথা ছিলো,স্বামীকে ‘উদ্বার’ করার খাওলার কাজ যে এখনো বাকি!
রাসূল (সাঃ)তাঁকে বললেন, ‘যাও তোমার কাজিনকে বলো একজন দাস মুক্ত করে দিতে, খাওলা বললেন,তাঁর মুক্ত করার মত দাস নেই,তাহলে তাঁকে একাধারে ষাটটা রোজা রাখতে বলো,খাওলা বললেন,উনি বৃদ্ধ মানুষ তার পক্ষে সম্ভব না,তাহলে তাকে ষাট জন মিসকীনকে পেট ভরে খাইয়ে দিতে বলো,খাওলা বললেন,উনার ওতো সামর্থ্য নেই।তাহলে তাকে বলো এক ফারাক খেঁজুর দান করে দিতে, খাওলা বললেন তাহলে আমিও আরেক ফারক খেঁজুর দিবো। রাসূল (সাঃ) বললেন, যাও, ওর হয়ে দিয়ে দাও আর তোমার কাজিনের প্রতি সদয় আচরন করো (সদয় হতে এইজন্য বলেন যাতে স্বামীর সাথে একটু কম তর্ক করেন)।

খাওলা (রাঃ) খুশী মনে বাড়ি ফিরে আসলেন। বাড়ি ফিরে বোধহয় ক্রন্দনরত স্বামীকে বলেছিলেন,এই উঠো,তোমাকে আর কাঁদতে হবে না আমি আল্লাহর রাসূল,জীবরাঈল (আঃ)কে স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামিন থেকে ফয়সালা করিয়ে এনেছি,আমরা একসাথে থাকতে পারবো,যাও এখন শুধু কাফফারা দাও। (আচ্ছা,এখানে সুযোগে একটা কথা বলে নিই,যেসব মেয়েরা খুব চিন্তিত থাকেন,আল্লাহকে নিষ্ঠুর ভেবে ফেলেন, যে আখিরাতে স্বামীকে অনেক হুরী দেয়া হবে তারা ভাবেন,জান্নাতে বা দুনিয়ায়ও আল্লাহর কাছে এভাবে সাফ বলে দিবেন,আল্লাহ রব্বুল আলামীন কখনো নিজের বান্দীর সম্মান,যুক্তিপূর্ণ কথার উপরে কাউকে প্রাধান্য দেন না,সো চিয়ার্স!)

এখন বলি এই পুরো ঘটনায় উমর (রাঃ) কোথা থেকে আসলো। কুরানের তাফসীরতো বড় হয়ে পড়েছি কিন্তু এই মহাসম্মান্নিত নারী সম্পর্কে জানতে পারি উমর (রাঃ)র জীবনী থেকেই। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে খাওলা (রাঃ)সম্পর্কে জানতে গেলে উমর (রাঃ)আসবেই আর উমর (রাঃ)কে জানতে গেলে খাওলা।

মোট দুটো ঘটনা আছে ।

উমর (রাঃ) তখন আমিরুল মু’মেনীন, একদিন মসজিদের বাইরে খাওলা (রাঃ)র সাথে তাঁর দেখা, সেদিনের কথা বলছি যখন মহিলা সাহাবীরা মসজিদেই নামায পড়তেন। উমর (রাঃ) তাঁকে সম্মানের সাথে সালাম জানালেন,কুশল জিজ্ঞেসা করলেন। খাওলা (রাঃ)র ততদিনে বয়স হয়েছে কিন্তু উনার প্রগলভতা কমেনি এতটুকু। তিনি উমর (রাঃ)কে বললেন, ‘হে উমর তোমাকে আমি তখন থেকে চিনি যখন তুমি উকাজের মেলার বাইরে হাতে ছড়ি নিয়ে ভেড়া চড়াতে,তাই খলীফা হিসেবে আল্লাহকে ভয় করো যখন তুমি মানুষের দেখভালের দায়িত্ব এখন তোমার উপর এবং জেনে রেখো যে আখিরাতের শাস্তিকে ভয় করে সে যেন বুঝতে পারে সেইদিন বেশী দূরে না;আর যে মৃত্যুকে ভয় করে সে এই দুনিয়ার অনেক সুযোগ সুবিধা ছেড়ে দেয়’ । সাহাবী আল জারদ আল আবদি উমর (রাঃ)র পাশেই ছিলেন,উমর (রাঃ) তখন রাষ্ট্রপ্রধান, একেতো বড় পদ তারউপর উমর (রাঃ)র আপাত কঠোর সুলভ ব্যক্তিত্ব,লোকে তাঁকে খুব ভয় পেত,সেখানে এক বৃদ্ধা এভাবে কথা বলছে দেখে তিনি অবাক হয়ে বলেই ফেললেন, ‘এই যে মহিলা, আপনি কিন্তু ভীষন রুক্ষভাবে আমিরুল মু’মেনীনের সাথে কথা বলছেন!’
জবাবে উমর (রাঃ), ‘তাঁকে বলতে দাও,যাননা উনি খাওলা,যার কথা স্বয়ং আল্লাহ সাত আসমানের উপর থেকে শুনে? সেই মোতাবেক উমর বাধ্য তাঁর কথা শুনতে’!

অন্য ঘটনাটা হলো, একবার খাওলা দেখা করতে গেলেন উমরের সাথে আর উনি উনার যা স্বভাব কথা চালিয়ে যেতেই থাকলেন,এখনতো বৃদ্ধ হয়েছেন কথা বরং আরো বেড়েছে আর উমর (রাঃ)র কত দায়িত্ব তখন কত বেশী কিন্তু তিনি শুনতেই থাকলেন। ইতোমধ্যে কুরাইশের এক শীর্ষস্থানীয় গণ্যমান্য লোক ফিরে গেলন,এক লোক জিজ্ঞেস করলেন,ইয়া আমিরুল মুমেনীন আপনি কুরাইশের লোক ফিরিয়ে দিলেন এক মহিলার কথা শুনতে গিয়ে! উমর জবাব দিলেন, ‘তোমার উপর দূর্গতি!তুমি জানো এই মহিলা কে?’ লোকটি উত্তর দিলো, ‘না’।

উনি বললেন, ‘উনি হলেন খাওলা বিনতে সা’লাবা,যার কথা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা সাত আসমানের উপর থেকে শুনেন,খোদার কসম যদি না সে আমাকে রাত নেমে আসার আগ পর্যন্ত না ছাড়ে, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁকে যেতে বলব না,যদি না নামাযের সময় হয়ে যায় এবং আমাকে নামায পড়তে যেতে হয় তবে আমি নামায পড়ে আবার তাঁর কাছেই ফিরে আসবো যতক্ষণ না যে কাজে সে আমার কাছে এসেছে তা পূরণ হয়!’

মাঝে মাঝে মনে হয় এত উত্তম কথা,এত উত্তম ব্যবহার শুধু উমর (রাঃ)র পক্ষেই সম্ভব।

তথ্যসূত্র ঃ

১।সূরা মুজাদালাহ,তাফসীরে ইবনে কাসীর

২। http://www.siddique.org/